মরালী বললে–কী দেখছ অমন করে? বসো।
কান্ত বসল। বললে–আমি তোমার সম্বন্ধে অনেক কথা শুনছি। সবাই বলছে, তোমাকে নাকি ক্লাইভসাহেব গ্রেফতার করেছে, তাই নবাব রেগে গিয়ে ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যাচ্ছে–
মরালী বললে–সবাই তাই-ই জানে—
কিন্তু নবাব? নবাবও কি তাই জানে?
হ্যাঁ।
কিন্তু হঠাৎ এ-গুজব রটল কেন? আর তুমিই বা সকলকে লুকিয়ে এখানে এমন করে আছ কেন?
মরালী বললে–নবাবের বিপদের জন্যেই আমি এই পথ নিয়েছি। সবাই আমার জন্যে নবাবের সঙ্গে শত্রুতা করছিল। সবাই ভাবছিল নবাব বুঝি আমার কথায় উঠছে বসছে। সবাই ভাবছিল আমিই বুঝি নবাবের চর। তাই নবাবের ভালর জন্যেই আমি এখানে লুকিয়ে আছি। এখানকার কোনও বেগমরাও জানে না। নানিবেগমসাহেবাও না। কেবল একজন জানে।
কে? কে সে?
তুমি চিনতে পারবে। যে তোমার সঙ্গে আমার বিয়ের সম্বন্ধ করেছিল, সেই ঘটক। সেই সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ। সে এখন ইব্রাহিম খাঁ হয়ে গেছে মুসলমান হয়ে। মতিঝিলে মদের খেদমদ করে। সে একলাই কেবল আমার খবর জানে। আর জানে ওই নজর মহম্মদ
কান্ত কিছু উত্তর দেবার আগেই মরালী বললে–যাক গে, যে জন্যে তোমায় ডেকেছি সেই কথাটা বলি–
কান্ত বললে–বলো
ওদিকে সর্বনাশ হয়েছে কলকাতায়।
বলে নিজের ওড়নির ভেতর থেকে হাত গলিয়ে একটা চিঠি বার করলে।
তারপর বললে–এই চিঠিটা আমাকে লিখেছে ছোট বউরানি।
ছোট বউরানি?
মরালী বললো, সেই হাতিয়াগড়ের ছোটমশাইয়ের দ্বিতীয় পক্ষের বউ। যার জন্যে আমি এত কাণ্ড করেছি, সে। তার জন্যেই আমি নাম ভাড়িয়ে এই চেহেল্-সুতুনে এসেছিলাম, তাকে বাঁচাবার জন্যেই আমি কলমা পড়ে মুসলমান হয়েছি, তাকে রক্ষে করবার জন্যেই আমি মরিয়ম বেগম হয়েছি। অথচ তাকেই শেষপর্যন্ত বাঁচাতে পারলুম না।
কিন্তু এ-চিঠি তোমার কাছে তিনি কী করে পাঠালেন?
ওইইব্রাহিম খাঁ’র হাত দিয়ে। ও হাতিদের রোজ নিয়ে যায় গঙ্গার ঘাটে। নৌকো থেকে মদের পিপে নামিয়ে হাতির পিঠে করে ও মতিঝিলে নিয়ে আসে। তার হাতেই একজন দিয়ে গেছে আমাকে দেবার জন্যে
কান্ত বললে–লোকটা সত্যিই ভাল
মরালী বললে–ও তো জানে যে, ওর গণ্ডগোলের জন্যেই অন্য একজন বুড়োর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল, তাই মনে মনে খুব দুঃখ করে। বলে–আমার দোষেই তোমার এমন কপাল হল মা। তা সে যা হোক, এখন হোট বউরানিকে যেমন করে তোক বাঁচাতেই হবে
ছোট বউরানির কী হয়েছে?
মরালী বললে–আগে শুনেছিলাম যে, ছোট বউরানি ফিরিঙ্গিদের বাগানবাড়িতে আছে। তখন বিশ্বাস হয়নি। সেই দেখবার জন্যেই একবার ক্লাইভসাহেবের পেরিন সাহেবের বাগানেও গিয়েছিলাম। কিন্তু সেবার তো সেই উমিচাঁদের হাতের লেখা চিঠিটা পেয়ে কেলেঙ্কারি কাও হয়ে গিয়েছিল–এবার আর এক কাণ্ড!
কী?
এবার ভুল করে ফিরিঙ্গিরা ওকে ভেবেছে মরিয়ম বেগম। নৌকো করে দুগ্যা আর ছোট বউরানি কেষ্টনগরের দিকে যাচ্ছিল মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে। পথে ফিরিঙ্গি সাহেবরা ওকে মরিয়ম বেগম মনে করে গ্রেফতার করে রেখেছে। কোনও উপায় না পেয়ে আমার কাছে দরবার করেছে। আমি যেমন করে হোক ওদের যেন নবাবকে বলে বাঁচাই
নবাবকে বলেছ?
নবাবকে এই অবস্থায় কী করে বলব? এখন তো ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে নবাবের যুদ্ধ লাগে লাগে!
তা হলে কী করবে?
মরালী বললে–সেই কথা বলতেই তো তোমাকে ডেকেছি। ঠিক করেছি আমিই ফিরিঙ্গি কোম্পানির সাহেবদের কাছে যাব। গিয়ে বলব, ওদের ছেড়ে দাও, ও মরিয়ম বেগম নয়, আমিই মরিয়ম বেগম–
কিন্তু তখন যদি তোমাকে আবার ধরে রাখে?
মরালী বললে–তা তো ধরে রাখবেই–এমন সুযোগ পেয়ে কি আর ছাড়বে! আমি ওদের কত ফন্দি ফাস করে দিয়েছি। আমাকে পেলে তো টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলবে!
কান্ত কী বলবে বুঝতে পারলে না। মরালীর মুখখানার দিকে চেয়ে দেখতে লাগল। মুখখানা অনেকদিন পরে দেখছে কান্ত। শুকিয়ে গেছে চেহারাটা একেবারে। তাই প্রতিবাদ করবার কথাও তার মনে এল না। আর যখন কখনও মরালীর কথার প্রতিবাদ করেনি তখন এই কথাতেই বা প্রতিবাদ করবে কেন এখন?
মরালী বললে–তোমাকেও আমার সঙ্গে যেতে হবে। এই জন্যেই তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছি। চলো—
*
ওদিকে তখন সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকানের সামনে একজন ভদ্রলোক এসে জিজ্ঞেস করলে এটা সারাফত আলি সাহেবের খুশবু তেলের দোকান?
সারাফত আলি নিজে তখন নেশায় মশগুল। কিছু উত্তর দিলে না।
বাদশা পাশ থেকে উত্তর দিলে হ্যাঁ-কী চাই আপনার?
এখানে কান্ত নামে কোনও বাবু থাকে?
সারাফত আলির নেশা এতক্ষণে বুঝি হঠাৎ ভেঙে গেল। জিজ্ঞেস করলে কৌন? হাজি আহম্মদ?
কোথাকার কোন হাজি আহম্মদ, তারই বুঝি ধ্যান হচ্ছে তখন মনে মনে। হাজি আহম্মদ কবে মরে গিয়ে জাহান্নমে চলে গিয়েছে, হাজি আহম্মদের ভাই আলিবর্দি খাঁ-ও কবে মরে গিয়েছে। তবু মরে গিয়েও তারা যেন সারাফত আলিকে যন্ত্রণা দিচ্ছে দিনরাত। এখনও বুঝি সারাফত আলি সেকথা ভুলতে পারেনি। সারা দোকানঘর আগরবাতি আর তামাকের ধোঁয়ায় ঢেকে আফিমের মৌতাতে সেই দুশমনদের কবর থেকে তুলে এনে যেন নতুন করে খুন না করলে বুড়োর তৃপ্তি হবে না। কান্তকে একদিন যে সারাফত আলি নিজের কাছে আশ্রয় দিয়েছে, সেও তো সেই মতলবেই। নিজে বুড়ো হয়ে গিয়েছে। চোখের তেজ নেই, হাতের পেশিতে সে জোর নেই। শুধু আছে বদলা নেবার অন্ধ জিদ। কান্তকে বুড়ো বলত আর কত দেরি রে? ঔর কিতনা দের হ্যায় তেরা?
