জগৎশেঠজি বললেন–আপনি একলা যাবেন?
কেন? একলা গেলে দোষ কী?
না, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে যদি সঙ্গে নিয়ে যেতে পারতেন ভাল হত। আর তা ছাড়া এখন ক্লাইভসাহেবকে পাবেনই বা কোথায়? সাহেব তো শুনছি সেপাই-লশকর নিয়ে কলকাতা থেকে রওনা দিয়েছে।
ছোটমশাই বললে–তা আমি কী করব বলুন জগৎশেঠজি! আমি আর কিছু ভেবে উঠতে পারছি না। আপনি আমায় একটা কিছু পরামর্শ দিন।
তা হলে আপনি আজ সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকানেই না হয় যান একবার। তারপর না হয় ক্লাইভসাহেবের কাছে যাবেন!
ছোটমশাই উঠল। বললে–তা হলে যাই এখন?
এক্ষুনি যাবেন কী? এখন রাস্তায় রাস্তায় চর ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখন আপনি এখানে এসেছেন একথা চরেরা জেনে ফেলতে পারে। আর একটু রাত হোক তখন যাবেন।
তারপর একটু থেমে বললেন–আর একটা কথা, আপনাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে আপনি কে, কোত্থেকে আসছেন, আপনি যেন বলবেন না! এখন এই ডামাডোলের সময় কখন কাকে ধরে কোতোয়ালিতে পুরে রাখে, কিছু বলা যায় না। ধরলে আপনিও বিপদে পড়বেন, আমিও বিপদে পড়ব
ছোটমশাই হতাশ হয়ে আবার বসে পড়ল। আর যেন তার দেরি সইছে না।
জগৎশেঠজি বললেন–হ্যাঁ, আপনি এখানে থাকুন, একটু রাত হলে তারপর একজন লোক দেব আপনার সঙ্গে, সে আপনাকে সরাফত আলির দোকানটা দেখিয়ে দেবে। এখন আপনি একটু বিশ্রাম করুন। আমি আপনার খাওয়ার ব্যবস্থা করতে বলে দিচ্ছি
বলে জগৎশেঠজি খিদমদগারকে ডাকলেন।
*
মুর্শিদাবাদের ইতিহাসে সত্যিই তখন ডামাডোেল চলেছে। এ মুর্শিদাবাদে নতুন কিছু নয়। যখনই একটা যুদ্ধ হয়েছে তখনই রাজধানীতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। মুর্শিদকুলি খাঁ থেকে শুরু করে সরফরাজ খাঁ, আলিবর্দি পর্যন্ত কখনও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা যখন ছোট ছিল তখন সারা মুর্শিদাবাদ তোলপাড় করে তুলেছে। কিন্তু সে আর এক রকম। সে ভাইতে-ভাইতে লড়াই, সে বর্গিদের সঙ্গে হামলা, সে হিন্দুস্থানের লোকের সঙ্গে মোকাবিলা, কিন্তু এবার তা নয়। এবার গোরা পল্টনদের সঙ্গে, এবার ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে। এবার রাজধানীর টনক নড়ে-ওঠা ডামাডোেল। এবার রাস্তায়ঘাটে চুপিচুপি কথা, কানাঘুষো আলোচনা। এবার সন্ধে হলেই লোকের বাজারহাট থেকে বাড়ি চলে যাওয়া। যে গনকারটা চকবাজারের রাস্তায় বসে থাকত অনেক বেলা পর্যন্ত, সেও বেলাবেলি পাততাড়ি গুটিয়ে চলে যায়। বলে রাহু রন্ধ্রে ঢুকেছে, এবার আকাল আসবেই
বুড়ো সারাফত আলির কোনও পরিবর্তন নেই। সে রোজ সন্ধেবেলা নিয়ম করে আগরবাতি জ্বেলে দিয়ে গড়গড়ার নলে অম্বুরি তামাকের ধোঁয়া টানে আর আফিমের নেশায় মশগুল হয়ে মনে মনে গজরায়। আর অভিশাপ দেয় হাজি আহম্মদের বংশধরদের।
অনেকদিন পরে সেদিন নজর মহম্মদ এল। সারাফত আলির সামনে দিয়ে এল না। পেছনের দরজা দিয়ে এসে চুপি চুপি কান্তকে ডাকলে।
কী রে নজর মহম্মদ?
হুজুর, আপনাকে তলব দিয়েছে মরিয়ম বেগমসাহেবা।
এতদিন পরে মরালী তাকে ডেকে পাঠাবে তা ভাবতে পারেনি কান্ত।
বললে–মরিয়ম বেগমসাহেবা কি চেহেল্-সুতুনে আছে?
জি হুজুর। ছুপিয়ে ছুপিয়ে আছে, কেউ পাত্তা জানে না।
কান্তর সমস্ত শরীরে আবার রোমাঞ্চ জেগে উঠল। এতদিন লোকের কানাঘুষো থেকে শুনে আসছিল, মরিয়ম বেগম চেহেল্-সুতুনে নেই। কত কী বাজে কথা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কেউ বলত-মরিয়ম বেগমসাহেবা একদিন নাকি শেষরাত্রে মুর্শিদাবাদের গঙ্গার ঘাট থেকে বজরায় করে একলা চলে গিয়েছে। একজন নাকি আবার নিজের চোখে তা দেখেছে। আবার একটা গুজব উঠেছিল, কলকাতায় ক্লাইভ সাহেব নাকি মরিয়ম বেগমসাহেবাকে গ্রেফতার করে রেখেছে। কতরকম গুজব শুনতে শুনতে কান্তর মনটা খারাপ হয়ে যেত। কতদিন ভেবেছে কাউকে জিজ্ঞেস করবে। সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ মশাইকে জিজ্ঞেস করলে হত। কিন্তু মতিঝিলেও আর যখন-তখন যাকে-তাকে আগের মতন ঢুকতে দেওয়া হয় না। বশির মিঞাকেও জিজ্ঞেস করতে ভয় হয়েছে। বিশ্বাস নেই কাউকেই। শুধু মনসুর আলি মেহের মোহরার সাহেবের দফতরে গিয়ে হাজরেটা দিয়ে এসেছে, আর ঠিক দিনে মাইনে নিয়ে এসেছে।
একটা ফরসা ধুতি পরে নিয়ে কান্ত বেরোল। নজর মহম্মদ বাইরেই অপেক্ষা করছিল। বাদশাকে ডেকে বললে–দেখো বাদশা, আমি একটু বেরোচ্ছি
বাদশা বললে–কোথায়? কত দেরি হবে?
কান্ত বললে–তা বলতে পারি না। নিজামতের জরুরি তলব এসেছে। কোথায় যেতে হবে, কী কাজ তা তো আগে থেকে বলার নিয়ম নেই ওদের!
যেতে গিয়েও থামল কান্ত। বললে–দেখো, আর একটা কথা। কেউ যদি আমার খোঁজ করে এখানে আসে তো তাকে যেন কিছু বোলো না। বোলো না যেন আমি কোথায় গেছি, কী কাজ করি, কোনও বৃত্তান্ত বলবার দরকার নেই। আমি এখানে থাকি কিনা তাও বলবার দরকার নেই। নিজামতের কাছারিতে আজকাল বড্ড কড়াকড়ি করে দিয়েছে
বাদশা বললে–ঠিক আছে–
মুর্শিদাবাদ চকবাজারে তখন অন্ধকার বেশ জমে উঠেছে। নজর মহম্মদ এবার কোথা দিয়ে যে কোথায় নিয়ে চলল কিছু বোঝা গেল না।
এদিকে কেন নজর মহম্মদ? সেই সোজা ফটক দিয়ে যাবে না?
নজর মহম্মদ বললে–মরিয়ম বেগমসাহেবা অন্য মহলে আছে
শেষপর্যন্ত যেখানে নিয়ে গিয়ে তুলল, সে এক আজব জায়গা, ঠান্ডা, নিরিবিলি। চেহেল্-সুতুনের কোনও শব্দ সেখানে পৌঁছোয় না। ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে নজর মহম্মদ বাইরে চলে গেল। মরালী সামনে দাঁড়িয়ে। চেহারাটা যেন বদলে গিয়েছে তার। সেই জৌলুস নেই।
