সে তো শুনেছি, কিন্তু পালালে কী হয়েছে? পালানো ভালই তো
দেওয়ান মশাই বললে–কিন্তু না বলেকয়ে পালানো মানেই তো নবাবকে অগ্রাহ্য করা। তা ছাড়া ইংরেজদের সঙ্গে এত ষড়যন্ত্র, এত মাখামাখি সব যে জানাজানি হয়ে গেছে!
কিন্তু জানাজানি হলটা কী করে?
দেওয়ান মশাই বললে–মরিয়ম বেগমসাহেবা সেদিন রাত্রে এখানে এসেছিল, সে তো সব শুনে গেছে
সেকী?
দেওয়ান মশাই বললে–শেঠজি এলেই সব টের পাবেন। মোট কথা, নিজামতের অবস্থা এখন খুব টলোমলো। নবাবের খুব ভয় লেগে গেছে। ক্লাইভসাহেব নবাবকে যে-চিঠি লিখেছে তারপর ভয় হবারই কথা
কী রকম? কী চিঠি লিখেছে?
লিখেছে সেপাই নিয়ে কাশিমবাজারের দিকে আসছে
কেন? আসছে কেন ক্লাইভসাহেব? যুদ্ধ হবে নাকি?
লিখেছে, ফরাসিদের তাড়াবার জন্যে আসছে। লিখেছে–আমরা শিগগির কাশিমবাজারে যাচ্ছি। সেখানে গিয়ে নবাবকে এক দস্তক দিতে হবে যে, ফরাসিদের পাটনা থেকে ধরে আনবার জন্যে দু’হাজার সৈন্যকে আজিমাবাদের দিকে যেতে দিতে হবে।
ছোটমশাই বড় ভাবনায় পড়ল। ঠিক এই সময়েই কিনা গণ্ডগোল শুরু হল। আগে যুদ্ধ হয়েছিল কলকাতার জঙ্গলে। কিন্তু এবার একেবারে রাজধানীতে! রাজধানীর বুকের ওপর! ছোটমশাইয়ের বুকটা দুরদুর করে উঠল।
বললে–জগৎশেঠজি কী বলছেন?
দেওয়ানজি জগৎশেঠজির দফতরের বহু দিনের পুরনো লোক। যা কিছু সলাপরামর্শ করবার সমস্তই দেওয়ানজির সঙ্গে করে তবে কাজে হাত দেন। দেওয়ানজি সব খবর জানে। নবাবের নাকি এখন। একেবারে চরম অবস্থা। ফরাসিদের তাড়িয়ে দিলেও ভেতরে ভেতরে তাদের মাইনে ঠিক দিয়ে যাচ্ছে। কেউ বলছে, বুশিকে আবার গোপনে ডেকে পাঠানো হয়েছে। একদিন একটা হুকুমত বার করে তার পরদিন আবার সেটা ছিঁড়ে ফেলে দেয়। এখন মতিস্থির করতে পারছে না নবাব! ওদিক থেকে নবাবের গুপ্তচর খবর পাঠিয়েছে ইংরেজদের অর্ধেক সেপাই নাকি কাশিমবাজারের দিকে আগেই রওনা দিয়েছে।
এত খবর হাতিয়াগড় বসে ছোটমশাই পায়নি। যুদ্ধ যদি বাধে তো শেষপর্যন্ত হাতিয়াগড়ও বাদ পড়বে না। সেখানে ডিহিদার রেজা আলি আছে। সে এসে টাকা চাইবে, লোক চাইবে। আগাম আবওয়াব চাইবে। ভাবতে ভাবতে ছোটমশাইয়ের মাথাটা সেখানে বসেই গোলমাল হয়ে গিয়েছিল।
মনে আছে, সেদিন যখন রাত অনেক হয়েছে তখন জগৎশেঠজি মতিঝিলের দরবার থেকে ফিরেছিলেন। এমন উদ্বিগ্ন দেখা যায়নি কখনও জগৎশেঠজিকে।
বলেছিলেন–অবস্থা খুব খারাপ ছোটমশাই
সে তো সব বুঝতে পারছি।
আপনাকে যখন চিঠি লিখেছিলাম তখন বিশেষ জানাজানি হয়ে যায়নি। এখন এই দু’দিনের মধ্যে একেবারে সমস্ত গরম হয়ে উঠেছে। নবাব নিজে গিয়েছিল মিরজাফরসাহেবের জাফরগঞ্জের বাড়িতে। এখন অবস্থা বুঝে অন্যরকম ব্যবহার করছে। এখন আর কাউকে চটাতে চাইছে না। সেবারে আমার গালে চড় মেরেছিল সকলের সামনে। এবার আবার খুব ভদ্র ব্যবহার করলে।
ছোটমশাই বললে–এই সুযোগে আমার স্ত্রীকে বের করে নিয়ে আসা যায় না?
জগৎশেঠজি বললেন–কিন্তু শুনছি আপনার স্ত্রী নাকি এখন আর চেহেল্-সুতুনে নেই। আমার সঙ্গে কথা ছিল আমি ডেকে পাঠাব। চকবাজারে সারাফত আলির দোকানে কে নাকি কান্ত বলে একজন আছে, তাকে খবর দিলেই আপনার স্ত্রী আমার এখানে চলে আসতে পারবেন।
কান্ত! সে আবার কে?
জগৎশেঠজি বললেন–কী জানি সে কে!
ছোটমশাই বললে–তার কাছে কেন যেতে বলেছে?
তা জানি না। বলেছেন, তার কাছে গেলে আপনার স্ত্রীর কাছে সে খবর পাঠিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু এখন তো আর তার কাছে গিয়ে কোনও লাভ হবে না। শুনছি নাকি আপনার স্ত্রী আমার কাছ থেকে কোনও খবর না পেয়ে কলকাতায় চলে গিয়েছিলেন।
কলকাতায়? কলকাতায় কেন?
বোধহয় ক্লাইভসাহেবের কাছে কোনও সাহায্য পাবার আশায়।
ছোটমশাই সোজা হয়ে উঠে বসল এবার। বললে–কিন্তু আমি তো ক্লাইভসাহেবের কাছে গিয়েছিলুম। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গে আমার স্ত্রীর কথাও বলেছিলুম। ক্লাইভসাহেব তো জানে, মরিয়ম বেগম আসলে কে!
জগৎশেঠজি বললেন–যখন ক্লাইভসাহেব সব জানে তখন আপনার কাছে নিশ্চয়ই আপনার স্ত্রীকে পাঠিয়ে দেবে! কিন্তু এখন কি তার অত ভাববার সময় আছে? এখন এখানে নবাবের যেমন মনের অবস্থা, ক্লাইভসাহেবেরও তেমনি। সবই তো নির্ভর করছে মিরজাফরসাহেবের ওপর।
কেন? মিরজাফরসাহেব কী করবে?
জগৎশেঠজি বললেন–মিরজাফরসাহেব এখন যার দিকে ঢলবে, আসলে তারাই জিতবে। মিরজাফরের সঙ্গে তো লেখাপড়া-দস্তক সব চুকে গেছে ফিরিঙ্গিদের! কিন্তু বিশ্বাস তো কিছু করতে পারছেনা। এদিকে নবাব মিরজাফরসাহেবকে দিয়ে কোরান চুঁইয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিলে। তাতে কথাটা যখন ক্লাইভসাহেবের কানে যাবে তখন কি পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারবে মিরজাফরসাহেবকে?
তা হলে আমি কী করব? আমাকে কী করতে বলেন আপনি?
জগৎশেঠজি বললেন–আমিও তো সেই কথাই ভাবছি! ভেবে কিছু ঠিক করতে পারছি না।
চকবাজারে সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকানে একবার যাব? কান্ত না কী নাম বললেন, তাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করব? সে যদি কিছু হদিশ দিতে পারে!
জগৎশেঠজি বললেন–তা যেতে পারেন, কিন্তু সেখানে তার কাছে কোনও হদিশ পাবেন কিনা সন্দেহ–কারণ, মরিয়ম বেগম তো আর চেহেল্-সুতুনে নেই, কলকাতায় ক্লাইভসাহেবের তাঁবে।
তা হলে সেখানেই যাই! ক্লাইভসাহেবকে গিয়ে সব বলি গে—
