মিরজাফর সাহেব বললে–অমন করে তুমি বোলো না। সোজা করে বলল কী চাও!
দোষ আমার কি আপনার, আপনি ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করছেন কি না করছেন সে তর্ক না হয় এখন থাক, সে না হয় পরেও কোনওদিন ফয়সালা হতে পারে। কিন্তু আমি চাই আপনি আমার সঙ্গে থাকুন।
কী হিসেবে থাকব?
আপনার যা ইচ্ছে। আমি কিছু বলব না। ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে এখন আমার যে ফয়সালা চলছে তাতে–আপনি আমার দলে থাকুন এই আমার ইচ্ছে। আপনিও বাংলা মুলুকের একজন মানুষ। বাংলা মুলুকের যাতে ভাল হয়, আপনি তাই করুন। আমি আর কিছু চাই না। যাদের সঙ্গে আমার শত্রুতা তারা আমারও কেউ নয়, আপনারও কেউ নয়। তারা বিদেশ থেকে এসেছে। এসে এখানে আমাদের ঝগড়ার সুযোগ নিয়ে আমাকে চোখ রাঙাবে এ অপমান কি আমার একলার? আপনার অপমান নয়? আমার কোনও ক্ষতি হলে কি আপনার ক্ষতি হবে না?
এত কথা বলছ কেন আমাকে? আমি কি কিছু বুঝি না?
সবই বোঝেন আপনি, মানছি। কিন্তু মানুষের মনে একবার যখন অভিমান হয় তখন কি আর কিছু তার মনে থাকে? আপনি আমার ওপর অভিমান করে ওদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন আমার সর্বনাশ করবার জন্যে। কিন্তু আমার সর্বনাশ তো আপনারও সর্বনাশ। আমার সর্বনাশ হলে আপনি কি ভেবেছেন আপনিই বাঁচবেন? বলুন, বাঁচবেন?
মিরজাফর সাহেব বললে–আমার কথা এখন কিছু বলব না, বললে–তোমার যা মনের অবস্থা তুমি তা বিশ্বাসও করবে না।
আলিসাহেব, এখন আর কথা বলবার সময়ও নেই। কথা যা বলবার তা পরে হবে। তখন আপনি যত কথা বলবেন আমি শুনব। আমার দিককার কথাও আপনি তখন শুনবেন। এখন আমি আপনাকে শুধু একটা অনুরোধ করব, বলুন আপনি রাখবেন?
বলো!
আপনি আমার সামনে কোরান ছুঁয়ে বলুন যে, এই লড়াইতে আপনি ফিরিঙ্গিদের সাহায্য করবেন না। এই লড়াইতে আপনি মুর্শিদাবাদের স্বার্থ দেখবেন, বাংলা মুলুকের স্বার্থ দেখবেন, বাংলার মসনদের স্বার্থ দেখবেন, আর আমার স্বার্থ দেখবেন?
মিরজাফর সাহেব চুপ করে কিছুক্ষণ ভাবল।
আপনি চুপ করে থাকবেন না আলিসাহেব। কোরান নিয়ে আসুন। কোরান ছুঁয়ে আপনি দিব্যি করুন। কোরান ছুঁয়ে দিব্যি করলে আমি সব ভুলে যাব আলিসাহেব। আপনার বিরুদ্ধে আমি যা কিছু শুনেছি সব ভুলে যাব। একবার ফিরিঙ্গিদের কলকাতা থেকে তাড়িয়ে দিলে তখন আপনি যা চাইবেন আলিসাহেব, সব দেব। আপনি যদি মুর্শিদাবাদ ছেড়ে নিজের পরিবার নিয়ে দিল্লি গিয়ে বাস করতে চান তাও দেব। আমি সমস্ত বন্দোবস্ত করে দেব আপনার। আপনার যাতে সারাজীবন ভরণপোষণের কোনও কষ্ট না হয় তার ব্যবস্থাও আমি করব কথা দিচ্ছি-আনুন, আপনি কোরান আনুন
মিরজাফর সাহেব বললে–আমার মুখের কথা তুমি বিশ্বাস করবে না?
আপনার মুখের কথাই আমি বিশ্বাস করছি আলিসাহেব। সেই মুখের কথাটাই না হয় কোরানের সামনে হোক। আমি যে আজকাল কোরান পড়ি আলিসাহেব।
কিন্তু কোরান ছুঁয়ে তো আগেও দিব্যি করেছি কতবার, তবু তো তুমি আমাকে অবিশ্বাস করেছ! এ তো প্রথম নয়!
তবু আপনি কোরান আনুন আলিসাহেব। অন্যবারের সঙ্গে এবারের তুলনা করবেন না, এবার আরও খারাপ অবস্থা মুর্শিদাবাদের। এবার হয় হিন্দুস্থান বাঁচবে, নয়তো যাবে। আমি বাঁচলেই তবে হিন্দুস্থান বাঁচবে আলিসাহেব, হিন্দুস্থান বাঁচলে আপনি আমি উমিচাঁদ জগৎশেঠ সবাই বাঁচবে। ভাববেন না আমি মারা গেলে আপনারা বেঁচে যাবেন। এ-বিপদ আমার আপনার সকলের আনুন আপনি, কোরান আনুন।
মিরজাফর কোরান আনতে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে গেল।
আর জাফরগঞ্জের দেবতা, মতিঝিলের দেবতা, মহিমাপুরের দেবতা, হাতিয়াগড়, কলকাতা, হিন্দুস্থান, ইংলন্ড–সকলের দেবতা সবার অলক্ষে মিটিমিটি হাসলেন।
*
হাতিয়াগড় থেকে এসে ছোটমশাই হাঁফিয়ে উঠেছিল। হাতিয়াগড় থেকে মহিমাপুর কম দূর নয়। মহিমাপুরের এই হাবেলিতেই এই নিয়ে কতবার আসতে হল। তবু এবার যেন অনেকটা আশা হচ্ছে। ছোট বউরানির মুখখানা মনে করতে বড় ভাল লাগল। এই ঘরেই, এই এখানেই পালিয়ে এসে আশ্রয় চেয়েছিল। আর কার কাছেই বা যাবে! চেহেল্-সুতুনের ভেতর থেকে পালিয়ে আসা কি অত সহজ। সেখানে খোজাদের চোখ এড়িয়ে বাইরে আসা সহজ নয়। মুর্শিদকুলি খাঁর আমল থেকে সেখানে পাহারাদারি চলছে। আকাশের চন্দ্র সূর্য যারা দেখতে পায় না, তাদের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে ছোট বউরানি। বিয়ের পর থেকে যে-বউ বরাবর ছোটমশাইয়ের পাশে না শুলে ঘুমোতে পারেনি, তাকে আজ মুসলমান হারেমের মধ্যে বন্দি হয়ে রাত কাটাতে হচ্ছে। ওগো, তুমি তো জানো, তোমাকে ছাড়া আমিও থাকতে পারি না। আজ কতদিন হল আমি কাছারির কাজকর্ম কিছুই দেখতে পারিনি। জগা খাজাঞ্চিবাবু। জমা-খরচের খাতা নিয়ে এসে আবার ফিরে গেছে। সমস্ত হাতিয়াগড়ই অন্ধকার মরুভূমি হয়ে গেছে। আমার কাছে। তোমার কষ্টটাও কি আমি বুঝি না ভেবেছ? মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র কেবল ধৈর্য ধরতে বলেন। মহারাজ কী করে বুঝবেন! মহারাজের বয়েস হয়েছে। ছেলে-মেয়ে হয়েছে। কিন্তু আমি তোমাকে কী দিতে পেরেছি?
দেওয়ান মশাইকে আবার ডাকলে ছোটমশাই।
কই, এখনও তো আসছেন না শেঠজি! এত দেরি হচ্ছে কেন?
দেওয়ান মশাই বললে–মিরজাফরসাহেবের সঙ্গে আজ একটা ফয়সালা হচ্ছে কিনা, তাই দেরি হচ্ছে
কীসের ফয়সালা?
দেওয়ান মশাই বললে–আপনি শোনেননি কিছু? কাশিমবাজার কুঠি থেকে ফিরিঙ্গিরা সবাই পালিয়েছে যে
