শোভারাম দৌড়াতে দৌড়োতে ঘরে এসে ঢুকেছে।
বললে–নয়ান
ঘরে একলা মরালী বসে ছিল। আর কেউ নেই। মেয়ের দিকে চেয়ে যেন সান্ত্বনা দিয়ে বললে–কিছু ভাবিসনে মা, আর ভাবনা নেই, এবার সব ঠিক হয়ে গেছে।
বলেই আবার বাইরে চলে গেল।
*
বশির মিঞার সঙ্গে আবার সেদিন দেখা। সারাদিন সোরার গদিতে বসে কাজ করে করে যখন আর মাথা। তোলবার সময় থাকত না, ঠিক তখনই এক-একদিন বশির মিঞা এসে হাজির হত। বেভারিজ সাহেব থাকলে আর বশির মিঞা ঢুকত না। কিন্তু একলা দেখলেই ঢুকে পড়ত। চেনা নেই শোনা নেই মানুষটার সঙ্গে। কিন্তু বশির মিঞা একদিনেই বেশ ভাব করে নিয়েছিল। আর কান্তও ছিল সেইরকম। একটু মিষ্টি কথা শুনলে গলে যেত একেবারে।
কী খবর ভাইয়া?
কান্ত বলত–এসো ভাই, এসো, বোসো
তক্তপোশের ওপর কাটি-মাদুর পাতা থাকত। সেই জায়গাটা পরিষ্কার করে দিয়ে বসতে বলতকান্ত। পান দিত, জর্দা আনিয়ে দিত। বন্ধু মানুষ, খাতিরের কোনও কমতি রাখতনা কান্ত। ভারী মজাদার মানুষ ছিল বশির মিঞা। তেজি জোয়ান ছেলে। মুসলমান জাতে। তা হোক। কিন্তু খবর রাখত অনেক, নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াত, আবার নানান লোকের সঙ্গে মেলামেশা ছিল।
কী কাজ তোমার এত? সারা বাংলা মুলুক ঘুরে বেড়াতে হয়?
বশির মিঞা বলত–নবাব সরকারের কাজের তো এই মজা ইয়ার। মাঝে মাঝে দিল্লি যাই, মাঝে মাঝে ঢাকা যাই, আবার তারপর হয়তো আগ্রা, ফতেপুর সিক্রি চলে যাই–আমার ফুপা মনসুর আলি সাহেবের নাম শুনেছিস তো?
কান্ত বলেছিল-না; কে সে?
আরে আমার ফুপা। মির্জা মহম্মদ সাহেবের ইয়ার।
মির্জা মহম্মদ কে?
মির্জা মহম্মদের নামই শোনেনি কান্ত। অথচ এই দুনিয়ায় বেঁচে আছে। তাজ্জব বাত আর কাকে বলে। আরে মির্জা মহম্মদের নামই তো সিরাজ-উ-দ্দৌলা। কিছুই জানিস না তুই। এত বড় নবাব আর হয়নি যে হিন্দুস্তানে। তুই কাজ করছিস ফিরিঙ্গি কোম্পানির কাছে। তোর সাহেব নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলার পা চাটে, তা জানিস। এই যে দেখছিস সুতোনুটি, এই যে দেখছিস তোর সোরার গদি, নবাব ইচ্ছে করলে একটা কামান দেগে সব উড়িয়ে দিতে পারে। তোর সায়েবের মুন্ডু উড়ে যাবে এককথায় তা জানিস। তখন তুই তো তুই, তোর বাপজানের বাপজান ড্রেক সায়েব পর্যন্ত কোথায় উড়ে যাবে তার ঠিক নেই। তুই রহিম খাঁর নাম শুনেছিস? জবরদস্ত খাঁর নাম শুনেছিস?
না।
নবাব জাফর মুর্শিদকুলি খাঁর নাম শুনেছিস?
না।
আরে তোর মতন বেওকুফ তো আমি দেখিনি।
দিনের পর দিন বশির মিঞার কাছে মোগল বাদশা আর নবাব দেওয়ানদের গল্প শুনে শুনে নিজেকে কেমন ছোট মনে করেছে কান্ত। বশির মিঞা রাজার জাতের লোক। আর সে ফিরিঙ্গি কোম্পানির তিন টাকা তলবের ক্রীতদাস। কত বড় বড় লোক সব জন্মেছে মুসলমানদের মধ্যে। এই যে মুর্শিদকুলি খাঁ। ও-ও তো কাফের ছিল আগে। বামুনের ছেলে। খেতে পেত না। ইস্পাহানের হাজিসুফি মেহেরবানি করে খাইয়ে পরিয়ে মানুষ করেছিল বলেই তো সুবে বেরারের দেওয়ান হাজি আবদুল্লা খোরাসানির দফতরে নোকরি পেল। আমাদের বাদশা তো গুণের কদর করত–বাদশা আওরঙ্গজেব।
বলে বশির মিঞা নিজের নাক আর দুটো কান মলে দিল।
বললে–অমন বাদশা আর হিন্দুস্তানে হবে না রে। দীন-দুনিয়ার বাদশা আওরঙ্গজেব বাদশা। জাফর খাঁ সায়েবকে গুণ দেখে নিজের খাস-দরবারে এত্তালা দিলে। দিয়ে তার খেলাত দিলে কারতলব খা। মনসবি দিলে। তোকে তোর কাজ দেখে খেলাত দেবে বেভারিজ সায়েব? গুণের কদর করবে ফিরিঙ্গি বাচ্চা?
এমনি গল্প করত বশির মিঞা। তারপর আবার কোথায় চলে যেত। কী কাজ যে করত বশির তা কোনওদিন বলেনি। মাঝে মাঝে কান্তকে জিজ্ঞেস করত–বেভারিজ সায়েবের কাছে কোন কোন সায়েব আসে, তাদের নাম কী। সোরা বেচে সাহেবের কত মুনাফা থাকে। গঙ্গার কিনারায় কেল্লা বানাচ্ছে কেন ফিরিঙ্গিরা। তাদের মতলব কী!
যা জানত কান্ত তাই বলত। কান্ত বলত–আমি তো ইংরিজি জানি না তাই সব কথা ওদের বুঝতে পারি না
তা এতদিন নোকরি করছিস আর ইংরিজি শিখিসনি? শিখে নে। কী কথা হয় ওদের আমাকে বলবি, তোকে ইনাম পাইয়ে দেব, বকশিশ পাইয়ে দেব–ফিরিঙ্গিদের যত খবর দিতে পারবি তার জন্যে তুই টাকা পাবি। কেল্লাতে ফিরিঙ্গিদের কত পল্টন আছে, কত কামান আছে, আমাকে খবরটা দিতে পারিস?
এসব কথা শুনতে শুনতে কান্তর কেমন সন্দেহ হত। বেভারিজ সাহেব তাকে কতবার সাবধান করে দিয়েছিল। কোম্পানির এলাকায় স্পাই ঘুরে বেড়াচ্ছে। খুব হুঁশিয়ার থাকবে মুনশি। স্পাই মানে চর। গেরুয়া পরা সন্ন্যাসী দেখলে বুঝবে ওরা মারাঠিদের চর। ওরা মুসলমানদের হঠিয়ে হিন্দু রাজাকে দিল্লির মসনদে বসাতে চায়। তাদের সঙ্গে বেশি কথা বলবে না। অনেকে বাউল ফকিরের মতো গান শোনাবে গদিতে এসে। ভিক্ষে চাইবে। তাদের আমল দেবে না। আর তারপর আছে মুর্শিদাবাদের স্পাই। তারাও কলকাতায় ঢুকে পড়েছে। খুব হুঁশিয়ার থাকবে।
কিন্তু বশিরকে কিছুতে এড়ানো যেত না। বশির বলত–তোর ডর কীসের? আমি তো আছি, আমার ফুপা তো আছে–
একদিন রাত্তিরবেলার কথা মনে আছে। অনেকদিন আগেকার কথা। সাহেব সকালবেলা একবার গদিতে আসত। তারপর মাল-চালান দিয়ে বাড়িতে খেতে চলে যেত। দুপুরবেলা বাড়িতে গিয়ে ঘুমোত। দিবানিদ্রা দেওয়াটা বেভারিজ সাহেবের ছিল স্বভাব। সেসময়ে সাহেবকে বিরক্ত করা চলবে না। তারপর বিকেলবেলা যখন ঘোড়ায় চড়ে বেড়াতে বেরোত তখন এক-একদিন আসত। কিন্তু সেদিন রাত্তিরবেলাই পালকি চড়ে এসে হাজির। অত রাত্তিরে সাহেব কখনও আসে না। সাহেবের মুখ গম্ভীর। এসেই কান্তর হাত দিয়ে একটা চিঠি পাঠালে কেল্লাতে। সাহেবের সঙ্গে আরও দু’জন লোক। তারা চুপি চুপি কী সব কথা বলতে লাগল। কান্ত অনেক চেষ্টা করেও বুঝতে পারলে না।
