মিরজাফর আলিসাহেবের মুখে তখনও কোনও কথা নেই। ভাবলে, নবাব আজ কুটনীতির অন্য ঘোরালো পথ ধরে কথা বলছে। তা হোক, আজ কূটনীতির লড়াই-ই হয়ে যাক এখানে।
তারপর আলিসাহেব, আমি সেই বজরাটা থামাতে বললাম। শুনলাম নদিয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র সেই বজরায় আছে। আর গান গাইছে রামপ্রসাদ! আপনি রামপ্রসাদের গান নিশ্চয় শুনেছেন আলিসাহেব। আমি বাংলা বিহার উড়িষ্যার সুবাদার, কিন্তু ঘাটে মাঠে নদীতে নৌকোয় যারা দিনরাত একজনের নাম করে সে তো আমিনয় আলিসাহেব, সে তো রামপ্রসাদ। তার তো মসনদ নেই, জায়গির নেই, খেলাত নেই, সনদ নেই, ফার্মান নেই। ভাবলাম, দেখে আসি সেই আর এক সুবাদারকে, যাকে বড়লোক-গরিব সব লোকই মানে। তারপর গেলুম। আমাকে দেখে সেই রামপ্রসাদ উর্দু গজল গান ধরলে। সেঁইয়া গেও পরদেশ, সখিরি ক্যা করু ম্যায়।’আমি বললুম-না, তোমার ওই মায়ের গান গাও
মির্জা মহম্মদ বলতে লাগল–তারপর আলিসাহেব, সে গাইতে লাগল–মা গো আমার এই ভাবনা। আমি কোথায় ছিলাম…
হঠাৎ ফটকের বাইরে কার যেন টোকা পড়ল।
মির্জা মহম্মদ বললে–কে?
মিরজাফর আলি বললে–আমি দেখে আসছি—
মির্জা বললেন আলিসাহেব, এখন যাকে-তাকে ঢুকতে দেবেন না, আজকে আমি অনেক কথা বলতে এসেছি, আমার সব কথা আমি আপনাকে শোনাব।
মিরজাফর আলি সাহেব বললে–ঠিক আছে, আমি আর কাউকে এখানে ঢুকতে দেব না। তোমার কথাই শুনব। তবু দেখে আসি কে। কী জন্যে ডাকছে
বলে মিরজাফর আলি সাহেব ফটক খুলতে গেল।
*
এও ইতিহাসের এক আশ্চর্য ঘটনা। একদিন যেনবাব মতিঝিলের দরবারে সবাইকে ডেকে এনে কুর্নিশ করতে বাধ্য করেছে, সেই নবাবকেই আবার নিজের গরজে একদিন যেতে হয়েছে নিজের ওমরাহের বাড়িতে তোষামোদ করে খুশি করতে। কথায় বলে গরজ বড় বালাই। কিন্তু নবাবের গরজ আরও বড় বালাই।
কিন্তু পৃথিবীর যত বাদশা, যত নবাব অতীতে পাপ করে গিয়েছে, সব যেন একলা নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলারই দায়িত্ব। সকলের সব অপরাধের দায় যেন নবাবের ঘাড়েই এসে পড়েছে। চোখের সামনে যেন নতুন যুগের নতুন মানুষরা এসে নবাব সিরাজউদ্দৌলার সামনে জবাবদিহি চাইছে। বলছে–জবাব দাও। তোমার পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ, বৃদ্ধ প্রপিতামহ, অতিবৃদ্ধ প্রপিতামহ, এমনকী প্রাগৈতিহাসিক সব মানুষের সব গুনাহর প্রায়শ্চিত্ত করো।
কে? কারা?
মিরজাফর সাহেব দরজা খুলতে গিয়েছিল। এবার ফিরে এল।
মির্জা মহম্মদ আবার জিজ্ঞেস করলে কে? কে এসেছিল এখন?
মিরজাফর সাহেব বললে–কেউ না, এমনি
এমনি মানে? এমনি কখনও দরজায় শব্দ হয়?
মিরজাফর সাহেব বললে–হয়, হয় মির্জা হয়! এমন শব্দ আমি প্রায়ই শুনি। দিনে রাত্রে দুপুরে, প্রায়ই মনে হয় কে যেন আমার দরজায় ঘা দিলে।
সত্যিই হয় আলিসাহেব? সত্যিই আপনার মনে হয় কেউ যেন দরজায় ঘা দিলে?
হ্যাঁ মির্জাসাহেব, সত্যিই হয়।
কিন্তু আমি ভেবেছিলাম শুধু আমি একলাই শুনি, আমি একলাই শুনতে পাই, আর কারও হয় না। কিন্তু কেন এমন হয় আলিসাহেব? কে অমন ধাক্কা দেয় আলিসাহেব? কারা?
মিরজাফর সাহেব বললেও কিছু নয়, ও মনের ভুল
সত্যিই বলছেন মনের ভুল? সত্যিই বলছেন ও কিছুনয়? কিন্তু আমি ভাবতুম ও শুধু আমারই হয়। আমি ভাবতুম সামনে হয়তো আমার খুব বিপদ আসছে, ও তারই ইঙ্গিত।
মিরজাফর বললে–ও নিয়ে তুমি আর ভেবো না–ওতে আরও শরীর খারাপ হবে—
কিন্তু শরীরের আমার কী দোষ আলিসাহেব। ওদিকে যখন কাশিমবাজার কুঠি থেকে সবাই পালিয়েছে, ওদিকে ক্লাইভসাহেব যখন মুর্শিদাবাদে আসবে বসে শাসাচ্ছে, তখন শরীর খারাপ হবে না? আমার শরীর খারাপ হবে না তো কার হবে? কিন্তু আমি কী করেছি বলতে পারেন? আমি আপনাদের কী ক্ষতি করেছি যে, আপনারা এমন করে মুর্শিদাবাদের সর্বনাশ করছেন? মুর্শিদাবাদ আপনাদের কাছে।
কী দোষ করল? আজ যদি ফিরিঙ্গিরা এসে এখানে হামলা করে তখন কে মুর্শিদাবাদের মানুষদের রক্ষে করবে?
মিরজাফর সাহেব বললে–কিন্তু আমাকে এসব কথা বলছ কেন তুমি? আমি কে? আমাকে তো তুমি নিজামত থেকে তাড়িয়ে দিয়েছ।
আমি আপনাকে তাড়িয়ে দিয়েছি?
তুমি তোমার মিরকশি মোহনলালকে সেলাম করে তবে দরবারে ঢুকতে বলে দিয়েছ সকলকে। আমি যদি সে নিয়ম না মেনে থাকি তো সে কার দোষ? আমার, না তোমার? আমার যদি আত্মসম্মান বলে কোনও জিনিস থাকে তো সে কি আমার দোষ না গুণ। তুমি বাংলার নবাব, তোমার যেমন আত্মসম্মান আছে, তেমনই তোমার প্রজাদেরও তো আত্মসম্মান থাকতে পারে।
কিন্তু সেই অপরাধের জন্যে আপনি আমাকে এত বড় শাস্তি দেবেন?
কে বললে–আমি তোমাকে শাস্তি দিয়েছি?
আপনি ইংরেজদের সঙ্গে হাত মেলাননি? আপনি আমাকে মসনদ থেকে উৎখাত করবার জন্যে ফিরিঙ্গি সাহেবদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করছেন না বলতে চান? আপনি বলতে চান, আমি যা কিছু শুনেছি সব মিথ্যে? তা হলে কেন আমি দরবার ছেড়ে আপনার এই জাফরগঞ্জের বাড়িতে এলুম? বিপদে না পড়লে কি কোনও নবাব এমন করে তার ওমরাহর বাড়িতে একলা একলা আসে?
তুমি তো আমাকে ধরে নিয়ে যাবার জন্যে ফৌজ পাঠিয়েছিলে। আমি যাব না জেনেই তুমি ফৌজ ফেরত পাঠাবার হুকুম দিয়ে নিজে এসেছ। এ তো তোমার নিজেরই গরজ! নিজের গরজেই তুমি এসেছ। আমার কাছে!
মির্জা মহম্মদ বললে–তা না হয় নিজের গরজেই হল, তবু তো আমি নবাব। আপনিও তো একদিন এই নিজামতের নিমক খেয়েছেন। না হয় সেই নিমকের দোহাই দিয়েই আমি আপনার কাছে আমার আর্জি পেশ করছি
