বললে–না, আমি নিজেই যাব মিরজাফরসাহেবের কাছে
যা কখনও হয়নি, সেদিন তাই হল। একদিন সেই রাস্তা দিয়েই মির্জা মহম্মদ কতবার খেলা করতে গেছে ওই হাবেলিতে। ছোটবেলায় খেলার জায়গা ছিল ওই হাবেলিটা। ওবাড়ির প্রত্যেকটা ইটের সঙ্গে নবাবের পরিচয় ছিল একদিন। আলিবর্দি খাঁ’র বোনের খসম মিরজাফর আলি।
নানিবেগম বলে দিয়েছিল ওর কাছে ছোট হতেও তোর লজ্জা নেই মির্জা। ওতে তোর ইজ্জত যাবে না। বরং ইজ্জত বাড়বে
মির্জা বলেছিল–কিন্তু তামাম মুর্শিদাবাদের লোক কী বলবেনানিজি? তারা বলবে আজ বিপদে পড়েছে বলেইনবাব মিরজাফরসাহেবকে আবার খোশামোদ করতে এসেছে
তা বলুক মির্জা। লোকের কথায় আর কান দিসনে!
কিন্তু লোকের কথায় কান দিয়েই তো আমার এই দশা হয়েছে নানিজি!
কী এমন দশা হয়েছে তোর যে এমন করে কথা বলছিস?
মির্জা বলেছিল–না নানিজি, মানুষের সম্মানে আর কখনও আঘাত দেব না ঠিক করেছি। এবার থেকে মানুষের মেজাজকেও সম্মান দেব আমি
তা হলে তাই যা, মিরজাফরসাহেবকে গিয়ে নিজে এখেনে ডেকে নিয়ে আয়
প্রথমে মিরজাফর সাহেব অবাকই হয়ে গিয়েছিল মির্জাকে দেখে। হাসতে গিয়েও হাসি বেরোয়নি মুখ দিয়ে। অনেকদিনের অপমানের প্রতিশোধ নেবার ইচ্ছে হয়েছিল সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু মির্জার কথায় বুঝল যে বিপদে পড়লে মানুষ এমনি করেই মাথা নিচু করে।
কিন্তু আমি দরবারে যদি না যাই হলে কি আমাকে তুমি গ্রেফতার করে নিয়ে যাবে? যদি তাই করতে চাও তো গ্রেফতারই করো!
মির্জা বলেছিল–গ্রেফতার করবার ইচ্ছে থাকলে কি আমি আজ নিজে আসতুম আলিসাহেব? আমি কোতোয়াল পাঠাতুম!
কিন্তু কোতোয়ালকেই তো পাঠিয়েছিলে আমার কাছে। কোতোয়ালকে ফিরে যেতে বললে–কেন?
তা বলে মানুষের কি ভুল হয় না? ভুল করেছি বলেই ভুলের খেসারত দিতে আমি নিজেই এসেছি আপনার কাছে।
কিন্তু আমার কাছে কেন?
মির্জা বললে–আমার আর কেউ নেই বলেই আপনার কাছে এসেছি!
কিন্তু যারা তোমার নিজের লোক তারা কোথায় গেল?
আমার নিজের লোক বলতে কার কথা বলছেন?
কেন? যেদিন আমাকে দরবার থেকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছিলে সেদিন তো তাদের ওপরেই ভরসা করেছিলে! সেদিন তো তারাই তোমার নিজের লোক ছিল।
কাদের কথা বলছেন? তারা কারা?
কেন, তোমার নিজের শ্বশুর ইরাজ খাঁ, মোহনলাল, মিরমদন, আবার কারা?
আমি নিজে আপনার বাড়িতে এসেছি, মুর্শিদাবাদের নবাব হয়ে আমি আপনার কাছে নিজের ভুলের জন্যে ক্ষমা চাইছি, তবু আপনার রাগ যাবে না?
মিরজাফর আলি বললে–আমার রাগ করাটাই দেখলে, আর তোমার অপমান করাটা বুঝি কিছুই নয়? দরবারে গিয়ে মোহনলালকে কুর্নিশ করার হুকুমটাও বুঝি রাগ করার পক্ষে যথেষ্ট নয়?
আমি তো বলছি আমি ভুল করেছি। নবাব বলে কি আমি মানুষ নই? আপনি আমাকে আগে যা দেখেছেন, আজ আমি আর তা নই! বিশ্বাস করুন, বাংলা মুলুকের ইতিহাস আমাকে একেবারে বদলে দিয়েছে। আমি আজ অন্য মানুষ।
তার মানে?
মিরজাফর আলি সাহেব মির্জার মুখের দিকে মুখ ফেরাল। ঘরের চারদিকের জানালা-দরজা সব বন্ধ। এখনই বাংলার মসনদের মালিকের মুখখানা চিরকালের মতো বন্ধ করে দেওয়া যায়। তা হলে আর কোনও বাধাই থাকে না মসনদ দখল করার পথে। কিন্তু আলি সাহেবের মনে হল রাজনীতি কূটনীতি বটে, কিন্তু কূটনীতিরও একটা নীতি থাকা উচিত। সে-নীতি বলে যে, তোমার খাদ্যদ্রব্য সামনে এলেও তাকে খেতে নেই। তার সামনে নির্লোভ নিরহংকার সাজতে হয়। নিষ্পাপ নিষ্কলঙ্ক সাজতে হয়। তাতে সুবিধে বই অসুবিধে নেই। আজ যখ সমস্ত প্রকাশ হয়ে পড়েছে তখন নবাব তার কাছে এসেছে। অনুশোচনা নিয়ে। খোদাহতালার মর্জি একেই বলে! খোদাহতালার দোয়া একেই বলে!
হ্যাঁ, সত্যিই আমি অন্য মানুষ আলি সাহেব। যে-মানুষ হোসেনকুলি খাঁ-কে খুন করেছিল, যে-মানুষ নিজের মাসিকে গ্রেফতার করে বন্দি করে রেখেছিল, যে-মানুষকে মুর্শিদাবাদের লোক ভয় করত, এখন আর আমি সে-মানুষ নই। বিশ্বাস করুন আলিসাহেব, আমার কথা একবর্ণও মিথ্যে নয়।
তারপর একটু থেমে নবাব আবার বলতে লাগল লোকে বলছে, আমার বদনামের সুযোগ নিয়ে, আমার দুর্বলতার সুবিধে নিয়ে আপনি নাকি কোম্পানির ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে দুশমনি করছেন, তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন
লোকে যা বলে বলুক, তুমিও কি তাই বলো?
মির্জা বলতে লাগল লোকের কথা থাক, কিন্তু হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই, কাশিমবাজার কুঠি ছেড়ে ওয়াটসই বা চলে গেল কেন? তারপর এই চিঠি
বলে একখানা চিঠি দেখালে বার করে।
এর মানে কী?
মিরজাফর আলি সাহেব চিঠিখানা হাতে নিয়ে পড়লে। তারপর পড়া হয়ে যাবার পর ফেরত দিলে।
এর মানে, এই মুর্শিদাবাদেই আমার মসনদের জন্যে আমাকে লড়াই করতে হবে। আর আপনারা মানে আপনি, জগৎশেঠ, ইয়ার লুৎফ, রাজা দুর্লভরাম, আপনারা সবাই আমাকে ত্যাগ করবেন।
মিরজাফর সাহেব তবু চুপ করে রইল।
এই আমার জীবনের প্রথম লড়াই নয়, আলিসাহেব। আপনি সবই জানেন। লড়াই করতে আমি ভয় পাই না। তামাম দুনিয়ার সকলের সঙ্গে আমি একলা লড়াই করতে রাজি। কিন্তু ওই যে আমি বললাম, এই মির্জা মহম্মদ আর সে মির্জা মহম্মদ নেই। আমি আজ অন্য মানুষ। আপনি জানে না হয়তো আলিসাহেব–আমি আজকাল রোজ কোরান পড়ছি। আমি আজ সকলের ভালবাসা চাই, মুহব্বত চাই। তবে শুননে, কেন এমন হল? আমি কলকাতা থেকে ফিরছিলাম। গঙ্গার ওপর তখন অনেক রাত। বজরার মধ্যে বিছানায় শুয়ে আছি, কিন্তু ঘুম আসছে না। মনের মধ্যে নানারকম ভাবনা ভাবছি। ভাবছি, মসনদ পেয়ে আমার কী লাভ হল, মসনদ পেয়ে আমার কী সুবিধে হল? অথচ ছোটবেলায় জন্মাবার সঙ্গে সঙ্গে এই মনদ নিয়েই তো আমার যত শক্রতা। মসনদের জন্যেই তো আমার রিস্তাদারদের সঙ্গে এত ঝগড়া। জীবনে খুনখারাপি যা-কিছু করেছি সব তো এই মনদের জন্যে। কিন্তু এই কি সেই মসনদ যার জন্যে আমি এত কিছু করেছি? এ-মসনদ আমাকে কী দিলে? এই মসনদ পেয়ে আমি কী পেলুম? ভাবতে ভাবতে ভাবনা আরও বেড়ে গেল। হঠাৎ কোথা থেকে একটা গানের সুর কানে ভেসে এল, আলিসাহেব। মনে হল, এত রাত্তিরে কে গান গাইছে। বাইরে চেয়ে দেখলুম, আর একটা বজরা যাচ্ছে উলটো দিকে। গানটা আসছে সেই বজরার ভেতর থেকে।
