ছোকরা কথাটা উচ্চারণ করতেই একজন রেগে উঠল। –ছোকরা বললি কেন আমাকে? আমি কি তোর নওকর? আমার বাপ তোর বাপের চেয়ে বেশি মাইনে পায় নিজামতে, তা জানিস?
তারপর শুরু হয়ে গেল হাতাহাতি।
ঘটনাটা ঘটছিল সারাফত আলির দোকানের সামনে।
এই, ভাগ ইহাসে, ভাগ যা–
একজন বললে–হুজুর, শালা বলছে নবাব মিরনকে ভয় করে!নবাব ডরপোক আদমি! শরিফ আদমিকে গালাগালি দিচ্ছে বেওকুফ
কে শরিফ আদমি? কৌন হারামি বলছে নবাব শরিফ আদমি?
সারাফত আলির গলা চড়ে উঠল–নি যা ইধারসে! হাজি আহম্মদ কা পোতা কভি শরিফ হো সকতা হ্যায়? ভাগ ইহাসে, ভাগ যা তু লোগ–
সারা মুর্শিদাবাদে এই রকমই চলে। কাজকর্ম না থাকলে যা হয় তাই। নতুন জমানার বাচ্চারা কেবল দিনভর চৌকের রাস্তায় বেত্তমিজি আর বেলেল্লাগিরি করে কাটায়। তারা জন্ম হওয়ার পর থেকে দেখে আসছে খোশামোদ আর ঘুষ দিলে যে কাজ হয়, সত্যি কথা আর সততায় সেকাজ হয় না। নিজামতে নোকরি পেতে গেলে কারও জামাই হওয়া চাই, কারও ছেলে হওয়া চাই, কিংবা কারও পোতা হওয়া চাই। আর তা যদি না হতে পারো তো ঘুষ দাও। ঘুষের কড়ি যদি তোমার না থাকে তো
আমির-ওমরাওদের মেয়েমানুষ জোগাও। যে কাজ টাকা দিলে হাসিল হবে না, সেকাজ মেয়েমানুষ দিলে জলের মতো সোজা হয়ে যাবে। শুধু মুর্শিদাবাদ কেন, দিল্লির বাদশাকে কাত করতেও ওর চেয়ে বড় হাতিয়ার আর দুসরা কিছু নেই। যাদের বয়েস পনেরো-ষোলো তারা দেখেছে গুণের কদর নেই। নিজামতে, সবচেয়ে বেশি কদর ঘুষের। ঘুষের আর আওরতের। আরে ইয়ার, আলিবর্দি নবাব কখনও খাজনা পাঠিয়েছে বাদশার দরবারে? নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা কখনও পাঠিয়েছে? দুনিয়াদারি আলখ জিনিস! যা কোরানে লেখা আছে সবকিছু বেত্তমিজ, যা গীতা-রামায়ণ-মহাভারতে লেখা আছে সব ঝুটা বাত। ওগুলো আমাদের মাদ্রাসা আর পাঠশালায় ওরা পড়ায় ওদের সুবিধের জন্যে। ওরা চুরি করবে, বেত্তমিজি করবে, আর আমাদের বলবে কোরান পড়তে, গীতা পড়তে! দুনিয়াদারির কানুন বদলে গেছে। ইয়ার। ওই কোরান-গীতা ভি বদলাতে হবে। নইলে তোমাদের কথা আর শুনব না।
ওদিকে যখন কোম্পানির সিলেক্ট কমিটির দফতরে হাজার হাজার মাইল দূর থেকে নতুন যুগের মানুষরা সারা পৃথিবীতে নতুন বাজার খুঁজতে বেরিয়েছে, জেসাস ক্রাইস্টের ক্রস বুকে ঝুলিয়ে পৃথিবীর মানুষকে স্লেভ করে রাখতে এসেছে, তখন হিন্দুস্থানে বাদশার দরবারে ঘুষ না দিলে সনদ পাওয়া যায়, মেয়েমানুষ না দিলে খেলাত পাওয়া যায় না। তখন পণ্ডিত, মৌলবি, সাধু, ফকির, কোরান, গীতার কোনও কদর নেই। কদর আছে শুধু সেলামের আর খোশামোদের। আজ যে নবাবের ভাল চায় নবাব তার ভাল চায় না। যে নবাবের নজরে পড়তে পারবে, নবাব তারই ভাল চাইবে। সেই নজরে পড়বার জন্যেই আমির-ওমরাওদের প্রিয় হতে হবে। আমির-ওমরাওদের খুশি করতে হবে। আমির-ওমরাওদের খোশামোদ করতে হবে। কিন্তু খোশামোদ করবার লোকেরও তো সংখ্যা কম নয়। তাদের সকলের ভিড় ঠেলে সামনে যাব কেমন করে! আমার কী আছে যে আমাকে তুমি খাতির করবে? আমার টাকা নেই, আমার মেয়েমানুষ নেই, আমার খোশামোদ করবার ক্ষমতাও নেই। তোমার কাছ পর্যন্ত পৌঁছোতে পারব এমন ক্ষমতাও আমার নেই। আমি থাকি মুলুকের এক প্রান্তে, সেখানকার . ডিহিদার তালুকদার আমার কথা শুনবে কেন? অনেক কায়দা করে যদি তাদের হাত করতে পারি তো. তবে বড় জোর তোমার মিরবকশির কাছ পর্যন্ত পৌঁছোতে পারব। কিন্তু তারপর? তারপর কি তোমারই এমন সময় আছে যে আমি আমার আর্জি তোমার কাছে পেশ করতে পারব। তোমার সময় কোথায়, আমার অভাব-অভিযোগের কথা তুমি শুনবে! তোমার নিজের আরাম আছে, মর্জি আছে, অবসর আছে, আছে খেয়াল-খুশি, খেদমত। খোদাহতালারও হয়তো সময় আছে মানুষের আর্জি শোনবার, কিন্তু নবাববাদশার তো সময় নেই প্রজার কথা শোনবার জন্যে। সে ভুগে ভুগে মরুক, সে জাহান্নমে যাক, সে গোল্লায় যাক। তার কথা আমার কানে তুলো না। কানে তুললে আমার মেহফিলের মজা নষ্ট হয়ে যাবে। আমার মসনদের মেজাজ খারাপ হয়ে যাবে। আমাকে তোমরা শান্তিতে থাকতে দাও।
এমনি করেই পাঠান আমল পার হয়েছে। এমনি করেই মোগল আমলও পার হতে চলেছে। কিন্তু আর বুঝি চলল না। ওদিকে শিখরা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল, মারাঠারাও মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু তারা তো নিজেদের মধ্যেই ঝগড়া করে করে নিঃশেষ হয়ে যাবে। এবার সাগর পার থেকে তোমরা এসেছ, তোমরাই আমাদের ভরসা, তোমরা আমাদের বাঁচাও সরকার। এবার থেকে তোমাদেরই সেলাম। করব। সেলাম সরকার, সেলাম!
.
নবাব মির্জা মহম্মদের সামনেও সেদিন সবাই যথারীতি সেলাম করেই দাঁড়িয়েছিল এসে। চিরকাল যারা সেলাম করার দলে তারা দরকার হলে তোমাকে সেলাম করবে, কিন্তু আবার দরকার ফুরিয়ে গেলে অন্য লোককে সেলাম করতেও তাদের বাধবে না।
অন্য সময় হলে মির্জা মহম্মদ বুঝত না। কিন্তু সেদিন বুঝল। একেবারে না-বোঝার চেয়ে দেরি করে। বোঝাও বোধহয় ভাল। সকালবেলাই ফৌজ পাঠিয়েছিল মিরজাফর আলির হাবেলিতে। কোতোয়ালিতে হুকুম হয়েছিল মিরজাফর সাহেবকে হাতকড়া পরিয়ে দরবারে ধরে এনে হাজির করতে। কিন্তু খানিক পরে কী যে হল, নবাব কোতোয়াল সাহেবকে ফিরে আসতে বললে।
