তার মানে? জাত আর ধর্ম আলাদা জিনিস নাকি?
বড়গিন্নি বলেছিল–সে তুমি বুঝবে না–সে তোমার বোঝবার দরকারও নেই, তুমি যাও শিগগির, যা হয় আমাকে জানিও, তারপর যাকরবার আমি করব
এরপর আর কিছু বোঝবার চেষ্টা করেনি ছোটমশাই। সোজা তাড়াতাড়ি দাঁড় বেয়ে চলে এসেছিল মুর্শিদাবাদে। কিন্তু মুর্শিদাবাদে এসে মহিমাপুরের ঘাটে নেমেই কেমন যেন মনে হল চারদিকে থমথমে ভাব। ঘাটের ওপর মাঝিমাল্লারা যেন কেমন অন্যমনস্ক। কী হল ওদের? এমন তো হয় না। অন্যবার ওরা রাঁধা বাড়া করে, গান গায়, নমাজ পড়ে, কেউ বা কৌতূহলি হয়ে তার দিকে চায়। এবার কী হল? মুর্শিদাবাদে কিছু হয়েছে নাকি? কিছুই বুঝতে পারলে না ছোটমশাই।
বুঝতে পারলে মহিমাপুরে জগৎশেঠজির হাবেলিতে এসে।
জগৎশেঠজির দেওয়ান সামনেই ছিল। বললে–শেঠজি বাড়িতে তো নেই এখন
কোথায় গেলেন তিনি? আমি তো তার চিঠি পেয়েই এসেছি
দেওয়ানজি বললে–তা জানি আমি, তিনি গেছেন মতিঝিলে, নবাবের পরওয়ানা এসেছিল
পরওয়ানা? পরওয়ানা কেন?
দেওয়ানজি বললে–মিরজাফর খাঁ সাহেব ধরা পড়ে গেছেন, তা জানেন না আপনি?
কবে? কখন? তা হলে সব ফাস হয়ে গেছে নাকি?
হয়তো ফাঁস হয়েছে, সকলের নামেই পরওয়ানা বেরিয়েছে। ইয়ার লুৎফ খাঁ, মেহেদি নেসার সাহেব, ইয়ারজান সাহেব, জগৎশেঠজি, কেউ বাদ নেই।
ছোটমশাই জিজ্ঞেস করলে–তা হলে কী হবে?
দেওয়ানজি বললে–কী হবে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। জগৎশেঠজি না ফিরলে কিছুই বলতে পারছি না-আপনি বসুন, বিশ্রাম করুন, তারপর দেখা যাক কী হয়। নিজামতের অবস্থা বড় খারাপ
কেন, খারাপ কেন?
খারাপ তো বটেই। কাশিমবাজার কুঠির ফিরিঙ্গিরা তো সব কুঠি ছেড়ে পালিয়েছে!
পালাল কেন?
দেওয়ানজি বললে–নিশ্চয়ই কোম্পানির হেড-অফিস থেকে নোটিশ এসেছিল সেই রকম,নইলে কি এমন করে সবকিছু ছেড়ে কেউ পালায়?
তা হলে কি ফিরিঙ্গিরা যুদ্ধটুদ্ধ বাধাবে নাকি?
দেওয়ানজি বললে–আপনি বিশ্রাম করুন, জগৎশেঠজি যদি আসেন তো তার মুখ থেকেই সব শুনতে পাবেন–
বলে, দেওয়ানজি ঘর ছেড়ে ভেতরের দিকে চলে গেল।
*
মতিঝিলের মধ্যে তখন দরবার বসেছে পুরোদমে। মুর্শিদকুলি খাঁর যা-কিছু সম্পত্তি ছিল সুজাউদ্দিন খাঁর আমলেই তার সবটুকু নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। তিনি ছিলেন বিলাসী মানুষ। অল্প টাকায় তার চলত না। তার কাছে টাকা ছিল হাতের ময়লা। বেগমদের নিয়ে দোল খেলেই লক্ষ লক্ষ টাকা উড়িয়ে দিনে এক রাত্রে। পরের জমানো টাকা। নিজের গতর নিজের মাথা ঘামিয়ে সে টাকা রোজগার করতে হয়নি। তাই টাকার ওপর মায়া ছিল তার কম।
কিন্তু আলিবর্দি খাঁ যখন নবাব হলেন তখন বাদশাহি পেশকস দিতেই ফতুর হয়ে গেলেন। তারপর আছে ঘুষ। দিল্লির বাদশার কাছে বাদশাহি সনদ আনা কি অত সহজ! ঘুষ না দিলে কি বাদশার মিনিস্টারদের কাছে পাত্তা পাওয়া যায়? আমির-ওমরাওরা হাঁ করেই বসে আছে। আগে আমাদের প্রণামী দাও তবে বাদশার কাছে তুমি পৌঁছোতে পারবে। চিরকাল এই নিয়মই চলে আসছে, সুতরাং তোমাকেও সেই নিয়ম মানতে হবে।
তারপর গেছে বর্গিদের হাঙ্গামা।
টাকা না জল! বাংলাদেশের রক্ত নিংড়ে যা টাকা পাওয়া গেছে সব গেছে বর্গি তাড়াতে। বর্গিরা যাবার পর মাত্র তিনটি বছর রাজত্ব করেছিলেন আলিবর্দি খাঁ। তিন বছর পরেই ওপার থেকে ডাক এসেছিল তার। সিরাজ-উ-দ্দৌলা যখন নবাব হল তখন নিজামতের ভাঁড়ারে মাত্র সেই ক’টা বছরের জমানো টাকা। সেই জমানো টাকা নিয়েই মির্জা মহম্মদের মসনদ আরম্ভ হয়েছিল।
কিন্তু মিরজাফর আলির ধারণা ছিল অন্যরকম।
মিরজাফর খাঁ বলেছিল-আমিনবাব হলে টাকার অভাব হবে না আপনাদের আপনাদের আমি লক্ষ লক্ষ দিয়ে ক্ষতিপূরণ করব
কিন্তু ঠিক যখন সব তৈরি তখন এমন করে যে ধরা পড়ে যাবে তা ভাবতে পারেনি কেউই।
ভোর থাকতেই নিজামতের ফৌজ গিয়ে মিরজাফর খাঁ’র বাড়িতে হামলা করলে। আশেপাশের বাড়ি থেকে যারা ঘটনাটা দেখতে পেয়েছিল, তারা যে যার বাড়ির ভেতরে গিয়ে আবার ঢুকল। নবাবি রাগ কখন কার ওপর গিয়ে পড়ে তার ঠিক নেই। এর কান থেকে ওর কানে গিয়ে পৌঁছোল কথাটা।
চকবাজারের রাস্তায় তখন কানাকানি শুরু হয়ে গেছে।
একজন বললে–নবাব মিরজাফরকে কোতল করে ফেলেছে বড়ে ভাইয়া
যারা শুনল তারা অবাক হয়ে গেল। একজন ওরই মধ্যে আবার প্রতিবাদ করে উঠল–দুর, মিরজাফরসাহেবকে খুন করবে বাংলা মুলুকে এমন কেউ নেই
আর একজন বললে–তা হলে মিরনসাহেব আছে কী করতে রে! মিরনসাহেব তো গুন্ডা! গুন্ডা কি ছেড়ে কথা বলবে?
অন্য একজন বললে–আরে রেখে দে তোর মিরন গুন্ডার কথা। মিরনসাহেব আমাদের মতো ঘোট আদমির সঙ্গে গুন্ডামি করবে, নবাবের ফৌজের সঙ্গে গুন্ডামি করতে হিম্মত চাই
আরে হিম্মত দেখাতে যাসনে মিরনসাহেবের কাছে! গুম-খুন করে ছাড়বে তোকে।
শেষকালে মিরনের সাহস আছে না সাহস নেই, এই নিয়ে দুই দলে তর্ক বেধে গেল। তর্ক বাধলেই ভিড় জমে। আরে, নবাব কি কম গুন্ডা নাকি? নবাবের ছোটবেলাকার গুন্ডামি যারা একদিন দেখেছে তাদের কাছ থেকে সেসব দিনের ইতিহাস অনেকে শুনেছে। নবাব মির্জা মহম্মদ কি গুন্ডামি কম জানে ভেবেছিস? নবাব নিজেই গুন্ডামি শেখাতে পারে তোদের। আমার চাচার কাছে শুনেছি, নবাব বাচপানমে আওরতদের ধরে ধরে বজরায় পুরে হাওয়া খেতে বেরিয়েছে। সেসব জমানা আমার চাচা দেখেছে। তুই কী জানিস? তুই তো সেদিনকার ছোকরা!
