গুঞ্জনটা ক্রমেই যেন কোলাহলে পরিণত হল। জগৎশেঠজি বাইরে মুখ বাড়ালেন। সঙ্গে সঙ্গে স্তম্ভিত হয়ে গেছেন। এরা? এরা কারা? এ কি কোম্পানির সেপাই? সেপাইরা বন্দুক নিয়ে ঢুকে পড়েছে। নাকি? মুর্শিদাবাদে কখন এল? আজ তো ১২ জুন। এত শিগগির ওরা এসে গেল এখানে?
চোখের সামনে যেন চকচক ঝকমক করে উঠল সেপাইদের তলোয়ারগুলো। তলোয়ার উচিয়ে তারা ছুটে আসছে ভেতরের দিকে। মতিঝিলের দিকে। চেহেল্-সুতুনের দিকে।
জগৎশেঠজি চিৎকার করে তাড়া দিলে বেহারাদের–চল চল, জলদি চল–জলদি
কিন্তু ইতিহাসের চেয়ে জলদি আর কে চলতে পারে! ইতিহাসের পালকি লক্ষ লক্ষ সূর্যের বেহারারা চালায়। তারা ভোরবেলা পুব দিক থেকে ওঠে আর রুদ্ধ নিশ্বাসে আকাশ পরিক্রমা করে, তাদের গতির সঙ্গে কে পাল্লা দেবে? কোন জগৎশেঠের এত ক্ষমতা? তুমি জগৎশেঠ হতে পারো কিন্তু আমি ব্ৰহ্মাণ্ডশেঠ। এই বিশাল বিরাট ব্রহ্মাণ্ডে তুমি কতটুকু? তোমার কত টাকা আছে যে তুমি আমার সঙ্গে পাল্লা দেবে? তুমি আজ নবাবকে হটিয়ে দিচ্ছ, কিন্তু একথা কি তুমি জানো যে, তোমাকেও একদিন আর একজন হটিয়ে দেবে! সেদিন তোমার টাকা তোমাকে বাঁচাতে পারবে না, তোমার খ্যাতি তোমাকে বাঁচাতে পারবে না, তোমার বিত্ত-সম্পত্তি-আত্মীয়রাও তোমাকে পরিত্যাগ করবে। সেদিন কোনও রবার্ট ক্লাইভ কোনও কোম্পানির ফৌজ নিয়েই আর রক্ষে করতে পারবে না তোমাকে। সেদিন রবার্ট ক্লাইভের মতোই তুমিও মুছে নিঃশেষ হয়ে যাবে চিরকালের মতো!
জগৎশেঠজি!
একেবারে চমকে উঠেছেন নিজের নামটা শুনে! কে? কে ডাকলে আমাকে?
সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠলেন–না না, আমি কেউ নই, আমি কিছু নই, আমি কারও দলে নেই, আমার সঙ্গে মিরজাফর উমিচাঁদ, ক্লাইভ, ওয়াটসন কারও কোনও সম্পর্ক নেই আমাকে ছেড়ে দাও, আমায় মুক্তি দাও আমার গলায় বড় লাগছে
আমি মেহেদি নেসার, আমায় চিনতে পারছেন না?
এতক্ষণে যেন হুশ হল। চারদিকে চেয়ে দেখলেন জগৎশেঠজি। এ কোথায় তিনি! এ তো রাস্তা নয়। এ তো তার নিজের ঘর। এ তো তিনি তার নিজের ঘরেই বসে আছেন আর তার সামনে দাঁড়িয়ে মেহেদি নেসার সাহেব।
মেহেদি নেসার বললে–মিরজাফরসাহেবকে নবাব বন্দি করেছে, সেই কথাই আপনাকে বলতে এসেছি
মিরজাফর খাঁ-কে ধরেছে?
হ্যাঁ।
জগৎশেঠজি বললেন–তা হলে তো আমাদের সকলকেই ধরবে, আমাদেরও বন্দি করবে!
মেহেদি নেসার বললে–আপনার কথা শুনে আমি সকালেই গিয়েছিলাম মিরজাফরসাহেবের বাড়ি, সেখানে গিয়েই দেখি নিজামতের সেপাইরা বাড়ি ঘেরাও করে ফেলেছে। তখন আর এখানে আসতে পারিনি–এখন এলাম।
জগৎশেঠজি কী বলবেন ভেবে ঠিক করতে পারলেন না।
মেহেদি নেসার বললে–অত ভাবনার কিছু দরকার নেই, ওদিকে মরিয়ম বেগমসাহেবাকেও ধরে ফেলেছে ক্লাইভসাহেব
সেকী?
হ্যাঁ! মরিয়ম বেগমসাহেবা কলকাতায় গিয়েছিল চালাকি করতে, যাতে ক্লাইভের ফৌজ মুর্শিদাবাদে না আসে, কিন্তু রাস্তাতেই ওয়াটস্ সাহেব আর উমিচাঁদের নজরে পড়ে যায়, তারাই বেগমসাহেবাকে ক্লাইভসাহেবের হাতে তুলে দিয়েছে–
হঠাৎ বাইরের সদর-ফটকে মতিঝিলের পেয়াদা এসে দাঁড়াল।
ভিখু শেখ জিজ্ঞেস করলে-ক্যা হুয়া!
নবাবের পেয়াদার সঙ্গে ভিখু শেখ একটু নরম করেই কথা বলে।
জগৎশেঠজির নামে পরওয়ানা আছে।
ভেতরের দরবারে জগৎশেঠজির হাতে পরওয়ানা পৌঁছোতেই তিনি চমকে উঠলেন। যা ভেবেছেন তাই। পরওয়ানা তারও এসেছে। যখন তারও পরওয়ানা এসেছে তখন সকলেরই এসেছে। ওই মিরজাফর খাঁ’র এসেছে, ইয়ার লুৎফ খাঁ’র এসেছে, উমিচাঁদ সাহেবের এসেছে, মেহেদি নেসারের এসেছে, ইয়ারজান সাহেবেরও এসেছে
মেহেদি নেসারও দেখলে। দেখে খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। সব ফঁস হয়ে গেল নাকি! এতদিনের সব ষড়যন্ত্র, সব আয়োজন সব মতলব বিলকুল ফাঁস হয়ে গেল!
জগৎশেঠজি মেহেদি নেসারকে জিজ্ঞেস করলে–কে ফাস করে দিলে?
মেহেদি নেসার সাহেবও বুঝতে পারছিল না। বললে–মরিয়ম বেগমসাহেবা ফাস করে দিতে পারে। কিন্তু তাই-ই বা কী করে হয়, মরিয়ম বেগমসাহেবাকে তো ধরে ফেলেছে ক্লাইভ সাহেব।
ধরে কোথায় রেখেছে?
তা জানি না।
নবাবের মতিঝিলের পেয়াদা পরওয়ানা দিয়ে তখনই চলে গিয়েছিল। জগৎশেঠজি বললেন–তা হলে আমি তৈরি হয়ে নিই–তুমি এসো–
বলে জগৎশেঠজি অন্দরমহলের দিকে চলে গেলেন। নবাবের পরওয়ানা বিধাতার পরওয়ানার চেয়ে কি কিছু কম জরুরি?
*
ছোটমশাই চিঠি পেয়েই রওনা দিয়ে দিলেন হাতিয়াগড় থেকে। এতদিন পরে আবার ছোট বউরানিকে পাওয়া গেছে, এ কি কম কথা নাকি? ধর্ম হয়তো গেছে, কিন্তু ধর্মের চেয়েও যা বড়, ধর্মের চেয়েও যা মহৎ তার আকর্ষণ কি কিছু কম?
হয়তো পুরুতমশাই বিধান দেবেন। বলবেন, প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। মুসলমানের সঙ্গে ছোওয়া-লেপা করেছে, মুসলমানের রান্না খেয়েছে, সেটা কম অপরাধ নয়। হোক বড় অপরাধ, কিন্তু তবু তো একবার দেখতে পাবেন তাকে।
বড়গিন্নি আসবার সময় বলে দিয়েছিল–খবরটা পেলে আমাকে জানিও, আমিও যাব মুর্শিদাবাদে
তা তুমি আবার কেন যাবে?
বড়গিন্নি বলেছিল–আমি গিয়ে তাকে গোটাকতক কথা জিজ্ঞেস করব—
কী কথা বলল না, সেগুলো না-হয় আমিই জিজ্ঞেস করব!
তুমি জিজ্ঞেস করলে হবে না। আমি তাকে শুধু একটা কথা জিজ্ঞেস করব। পোড়ারমুখি জাত যদি দিয়েই থাকে তো ধম্ম দিয়েছে কিনা তাই জিজ্ঞেস করব।
