মরিয়ম বেগমসাহেবাকে নবাব ভোররাত্রেই কলকাতায় পাঠিয়ে দিয়েছে।
সেকী? বেগমসাহেবা যে আমার বাড়িতেই রাত্রে এসেছিল। আমার সামনে অনেক কান্নাকাটি করলে। আমি তাই শুনে তখনই হাতিয়াগড়ে লোক পাঠিয়ে দিলুম।
সে-লোক চলে গেছে নাকি?
হ্যাঁ, তাকে হাতিয়াগড়ের ছোটমশাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দিয়েই তো আমি ঘুমোতে গেলুম। বলে দিলুম যত তাড়াতাড়ি পারো ছোটমশাইকে গিয়ে খবরটা দেবে।
মেহেদি নেসার সাহেব বললে–আপনি এত সহজে শয়তানির ধাপ্পাবাজিতে ভুললেন জগৎশেঠজি! ওদিকে উমিচাঁদ আর ওয়াটস্ সাহেবও কাশিমবাজার কুঠি ছেড়ে পালিয়েছে। সে-খবর নবাবের কানে উঠে গেছে।
কী করে কানে গেল? তোমাদের চর বেইমানি করেনি তো?
না শেঠজি, আমার লোক বেইমানি করবে না।
তা হলে নবাব টের পেলে কী করে? নবাবকে কে খবর দিলে?
মেহেদি নেসার বললে–আবার কে? মরিয়ম বেগমসাহেবা!
তা হলে কি ক্লাইভসাহেব এখনও কলকাতায় আছে? ক্লাইভসাহেবের তত ১২ জুন তারিখে মুর্শিদাবাদে রওনা দেবার কথা!
মেহেদি নেসার সাহেব বললে–কী জানি, আর তো কোনও খবর পাবার উপায়ই নেই, কাশিমবাজার কুঠিতে যে-লোক খবরাখবর আনত সে তো আর এখানে আসবে না!
তা হলে মিরজাফরসাহেব কোথায়?
তার হাবেলিতে!
মিরজাফরসাহেব কি জানে যে, মরিয়ম বেগমসাহেবা কলকাতায় পালিয়ে গেছে?
মেহেদি নেসার বললে–তা জানি না। বোধহয় খবর পাননি!
তা হলে তুমি এখনই গিয়ে তাকে খবরটা দিয়ে দাও। ক্লাইভসাহেবের সঙ্গে মিরজাফরসাহেবের যে-চিঠি চলছে তা যদি বেগমসাহেবার হাতে পড়ে তা হলে যে সব ফাঁস হয়ে যাবে! তা হলে যে একসঙ্গে সকলের কোতল হয়ে যাবে! ইয়ার লুৎফ খাঁ-কেও খবরটা দিয়ে এসো–সকলের সাবধান হওয়া দরকার
বড় সন্দেহের, বড় সাবধানের, বড় সতর্কতার সেই দিনগুলো। আর সেই রাতগুলো। মেহেদি নেসার সাহেবের চলে যাওয়ার পরও জগৎশেঠজি কিছুক্ষণের জন্যে চুপ করে বসে রইলেন। শুথু তো মসনদের পরিবর্তন নয়, মসনদের সঙ্গে সঙ্গে যে সমস্ত মুর্শিদাবাদে ওলোটপালোট হয়ে যাবে। সরফরাজ খা’র মৃত্যুর পর যেমন করেছিল আলিবর্দি খাঁ, তেমনি করে কড়া হাতে সমস্ত কিছুর দখল নিতে হবে। ফৌজের লোকেরা এখনও কিছু জানে না। তারা জানবার আগেই সব হাসিল করতে হবে। সেখানে মিরবকশি হয়ে মোহনলাল এখনও নবাবের দলে রয়েছে। কিন্তু আর কতদিন! একদিন-না-একদিন খবর আসবেই। খবর ঠিক এসে পৌঁছোবে যে ক্লাইভ আর অ্যাডমিরাল ওয়াটসন সাহেব মুর্শিদাবাদের দিকে সেপাই কামান-জাহাজ নিয়ে এগোচ্ছে, তখন নবাবের ঘুম ভাঙবে! তখন নবাব জগৎশেঠজিকে ডেকে পাঠাবে।
আস্তে আস্তে দিন হল। জগৎশেঠজি সকাল থেকেই অপেক্ষা করতে লাগলেন। কোনও খবর এল না। সারাটা দিন বড় অস্বস্তিতে কাটল। জগৎশেঠজির দফতরে কানুনগো আর সেরেস্তা আর গোমস্তার দল আবার যথারীতি কাজ করতে এল। জগৎশেঠজিও সকালবেলা দফতরে গেলেন। চোখের সামনে হিসেবের খাতা। খাতার পাতায় অঙ্কের অক্ষরগুলো অনেকগুলো শূন্য বুকে করে তার দিকে হা করে চেয়ে রইল। অঙ্ক নয় যেন, অঙ্কের পাহাড়। হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি শূন্যের অঙ্ক যেন হঠাৎ চোখের সামনে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। একদিন নবাব বাদশার প্রয়োজনেই জগৎশেঠের সৃষ্টি হয়েছিল, এখন যেন আবার নবাববাদশার সৃষ্টি হল জগৎশেঠের জন্যে! সুদের অঙ্ক যেন নিয়ম করে বাড়ছেনা। সুদ কমে গিয়ে যেন আসলে গিয়ে ঠেকতে চাইছে। তবে আর কীসের জন্যে জগৎশেঠগিরি! তিনিই যদি জগৎশেঠ তো নবাব কেন তাকে হুকুম করে। হঠাৎ পাতার ওপর অঙ্কের শূন্যগুলো যেন তাঁকে চড় কষাতে লাগল। যেন অঙ্ক নয়, নবাব। নবাব যেন খাতার পাতায় কামানের গুলি ছুঁড়ে দিয়েছে। অথচ এই অঙ্কগুলো যদি না থাকত তো কোথা থেকে নবাবিনা আসত। কোথা থেকে চেহেল-সুতুন আসত। কোথা থেকে মতিঝিল-বেগম-মসনদ-তাঞ্জাম-হাতি কামান-গোলাগুলি আসত!
সমস্ত রাস্তাটা তিনি কান পেতে রইলেন। কই, কেউ তো কিছু বলছে না। কেউ কি জানে না যে, ক্লাইভ সাহেব ফৌজ নিয়ে মুর্শিদাবাদে আসছে! কেউ কি জানে না যে, এবার থেকে মিরজাফর খাঁই নিজের বিছানা পাতবে চেহেল্-সুতুনে, নিজের দরবার বসাবে মতিঝিলে।
প্রতিদিন এমনি করেই এই রাস্তা দিয়েই জগৎশেঠজি দফতরে যান। জগৎশেঠজির পালকি দেখলেই মুর্শিদাবাদের লোক তাকে উদ্দেশ করে মাথা নিচু করে হাত জোড় করে প্রণাম করে। রাস্তার লোক সসম্ভ্রমে দু’পাশে সরে দাঁড়ায়। অঙ্কের শূন্যগুলো তার বাড়ির লোহার সিন্দুকের ভেতরে থাকে, শুধ তিনি যান দফতরে। দফতরের হিসেবের খাতার পাতায় নিজের চোখে সেই শূন্যগুলোকে দেখেন আর নিশ্চিন্ত মনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন। সব ঠিক আছে। টাকা-পয়সা কড়া-ক্রান্তির কূট ভগ্নাংশটা পর্যন্ত তাঁর খাতায় ঠিক লেখা থাকে। নবাব যাই বলুক, ওই হিসেবের খাতার শূন্যগুলোর জন্যে নবাব মুর্শিদাবাদের নবাব আর বাদশা দিল্লির বাদশা। একটা শূন্যও যদি খাতা থেকে কম পড়ে তো নবাবের মতিঝিলের একটা মশাল সঙ্গে সঙ্গে নিবে যাবে, চেহেল সুতুনের খাবার থালায় সঙ্গে সঙ্গে একটা পদ কমে যাবে। যতক্ষণ জগৎশেঠজি আছেন ততক্ষণ নবাবও আছে। শুধু আছে নয়, সগৌরবে সবিক্রমে আছে।
হঠাৎ বাজারের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে একটা গুঞ্জন কানে এল। ওটা কীসের গুঞ্জন? ওটা কীসের কোলাহল?
