মুখ বাড়িয়ে মরালী বেহারাদের জিজ্ঞেস করেছিল–ওরা কারা রে? ওরা কারা?
বেহারারা তাঞ্জাম থামিয়ে খবর এনে দিয়েছিল। ও হল ওয়াটস্ সাহেব আর উমিচাঁদ সাহেব। বেতে বেরিয়েছে।
কেমন যেন সন্দেহ হয়েছিল মরালীর। এমন তো হবার কথা নয়।
আর তারপর পঁড়ায়নি সেখানে। সেখান থেকে চলে গিয়েছিল সোজা একেবারে মতিঝিলে। মতিঝিলে তখন সব শান্ত, সব নিঝুম। সেখানে গিয়ে তাঞ্জাম ছেড়ে দিয়েছিল।
বেহারাদের বলে দিয়েছিল সোজা গঙ্গার ঘাটের দিকে যেতে। ঝালর দেওয়া তাঞ্জাম। ঝালর ঢাকা থাকলে কারও জানবার কথা নয় ভেতরে কে আছে।
মরালী বলে দিয়েছিল কেউ যদি জিজ্ঞেস করে তো বেহারারা যেন বলে দেয়, মরিয়ম বেগমসাহেবা কলকাতার দিকে চলে গেছে।
গঙ্গার ঘাটে নিজামতের নবাবি বজরা সাজানো থাকে সার সার। নবাব যখন খুশি গিয়ে হাজির হতে পারে সেখানে। হঠাৎ যদি নবাবের ইচ্ছে হয় বিহার করবার তো বজরা ছেড়ে দিতে হবে। তখন আর দেরি করা চলবে না।
খালি তাঞ্জামটা সেখানে গিয়ে থামল। তখন বেশ অন্ধকার। গমগম করছে অন্ধকার। তখন চেহেল্-সুতুনের নহবতখানার ইনসাফ মিঞা সুর ধরেনি। তাঞ্জামটা গিয়ে থামতেই বজরার মাঝিমাল্লা টের পেয়েছে।
কে? কে রে?
মাঝিমাল্লারা তাড়াতাড়ি দাঁড় নিয়ে তৈরি হয়ে পড়ছে। হয় নবাব এসেছে, নয়তো নবাবের বেগমসাহেবা।
তাঞ্জাম নামল। কিন্তু ভেতর থেকে কেউ নামে না।
বেহারারা মাঝির কাছে গিয়ে কানে কানে যেন কী বললে। আর মাঝিমাল্লারাও তৈরি হয়ে বজরা ছেড়ে দিলে। সেই ভোররাত্রে মুর্শিদাবাদের গঙ্গার ঘাট থেকে খালি বজরাটা বদর’ বদর’ বলে পাল তুলে কাছি খুলে দিলে।
কথাটা যেন কেউ জানতে না পারে মিঞাসাহেব, মরিয়ম বেগমসাহেবার হুকুম, দেখো
মাঝি বললেন ভাইসাহেব, কেউ জানবে না
তারপর তাঞ্জামটা আবার মুখ ঘোরাল। আবার ফিরতে লাগল চেহেল্-সুতুনের দিকে। কিন্তু ফেরবার মুখেই বশির মিঞার নজরে পড়ে গেছে।
বশির মিঞা ফিরছিল মোহরার সাহেবের হাবেলি থেকে। কেমন যেন সন্দেহ হল তাঞ্জামটা দেখে। এই তাঞ্জামটাকেই দেখেছে সে জগৎশেঠজির বাড়ির চবুতরে। আবার এখন দেখছে গঙ্গার ঘাটের কাছে।
কী ভাইসাহেব, কার তাঞ্জাম যাচ্ছে?
বেগমসাহেবার মিঞাসাহেব, বেগমসাহেবার।
কোন বেগমসাহেবার?
মরিয়ম বেগমসাহেবার! মরিয়ম বেগমসাহেবা শ্যায়র করতে গেল কলকাতায়
তাজ্জব হয়ে গেল বশির মিম। মরিয়ম বেগমসাহেবা। মরিয়ম বেগমসাহেবা শ্যায়র করতে গেল কলকাতায়। তবে তো মতলব ধরা গেছে। এতক্ষণ জগৎশেঠজির বাড়িতে ছিল। এতক্ষণ ওয়াটস সাহেব আর উমিচাঁদ সাহেবও ছিল সেখানে। তা হলে কি সব তালাস পেয়ে গেল নাকি বেগমসাহেবা? তালাস পেয়ে কলকাতায় খবর দিতে গেল?
সঙ্গে আর কে গেল ভাইসায়েব?
সঙ্গে গেল বাঁদি, আর কে যাবে?
তোবা, তোবা! বশির মিঞা আর দাঁড়াল না সেখানে। দূর থেকে দেখা গেল নিজামতের বজরাটা তখন অন্ধকার মাঝ-গঙ্গাতে পাল তুলে দিয়ে সোঁ সোঁ করে এগিয়ে চলেছে। সোজা সেখান থেকে বশির মিঞা একেবারে মোহরার সাহেবের বাড়ির দিকে ছুটল।
কিন্তু পথেই দেখা ফিরিঙ্গি কোম্পানির হরকরার সঙ্গে। সে ফ্লেচার সাহেব।
বশির মিঞা বললে–কী সাহেব, এত রাত্তিরে কোথায় চলেছ?
ক্যালকাটায়।
বশির মিঞা বললে–আরে, আমাদের মরিয়ম বেগমসাহেবাও যে তোমাদের ক্যালকাটায় গেল।
কেন? হোয়াই?
তা জানিনে। শায়েদ মতলব উতলব কিছু আছে!
ফ্লেচার সাহেব কী যেন ভাবলে। তারপর ঘোড়াটার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বললে–যাই, ওয়াটস সাহেবকে খবরটা দিয়ে আসি গিয়ে–
বলে ফ্লেচার সাহেব চলে গেল। কিন্তু বশির মিঞাও আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলে না। মোহরার সাহেবকে খবরটা দিলে খুশি হবে। অনেক গালাগালি দিয়েছে ফুপা সাহেব। এ-খবরটা দিলে এবার খুশ করা যাবে তাকে।
*
ভোররাত্রেই খবরটা এল। জগৎশেঠজির বাড়িতে যা কিছু সলাপরামর্শ হয় সবই রাত্রে। বেশি রাত্রেই তার কাজ কারবার। মোগল আমলে যখন নবাব বাদশারা রাত্রের আসরে নাচের আর গানের তালে বিভোর হয়ে থাকে, তখনই শুরু হয় আমির-ওমরাওদের কাজের পালা। দিনেরবেলায় যে কাজ সেকাজ প্রকাশ্য কাজ। সেখানে শুধু আইন কানুনের বাঁধা-পথে চলা-ফেরা। ঠিক জায়গায় ঠিক লোককে তসলিম জানানো, ঠিক-ঠিক সহবত, ঠিক-ঠিক নজরানা। তখন আদবকায়দায় কোনও ভুল নেই। তখন যার যা তকমা নিয়ে চাপরাস নিয়ে ঠিক-ঠিক ব্যবহার। কিন্তু রাত্রের বেলাতেই আসল রূপ তাদের। তখন কাকে ওঠাতে হবে, কাকে নামাতে হবে, কাকে বধ করতে হবে, কাকে খেতাব দিতে হবে, এইসব মতলব।
শেষরাত্রের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন জগৎশেঠজি! অনেক সম্পত্তির মালিক হলে ঘুম থাকার কথা নয়। সম্পত্তি যত ভারী হয়, ঘুম তত পাতলা হয়ে আসে। পেট ভরে ঘুমোয় জগৎশেঠজির ঝি-চাকর-নোকর-চোপদারবরদার-বেহারারসুইকর সবাই। তারা খেতেও যেমন ঘুমোতেও তেমনি। কিন্তু সেদিন ডাকাডাকিতে তাদেরও ঘুম ভাঙল। ভিখু শেখ খবর পাঠালে সদরে। সদরের লোক খবর পাঠালে অন্দরে। অন্দরের লোক খবর পাঠালে অন্তঃপুরে।
কী খবর?
খবর শুনে জগৎশেঠজির আর শুয়ে থাকা হল না। গোসলখানায় ঢুকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলেন। তখনও ভাল করে ভোর হয়নি।
অত্যন্ত চুপিচুপি কথা। অত্যন্ত আস্তে আস্তে।
কী খবর?
মেহেদি নেসার সাহেব একেবারে নিজেই সরাসরি চলে এসেছে। মনসুর আলি মেহের মোহর সাহেব নিজে ঘুম থেকে উঠে মেহেরবানি করে তাকে খবরটা দিয়ে গেছে। এ সময় আর কারও ওপর নির্ভর করা যায় না। নবাব সব টের পেয়ে গেছে।
