ছোটমশাই চোখ তুলে দেখলে জগা খাজাঞ্চিমশাই তখনও সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
জিজ্ঞেস করলে–এ-লোক কোথায়?
আজ্ঞে, অতিথিশালায় বসিয়ে রেখে এসেছি।
ছোটমশাই বললে–ঠিক আছে, তাকে যেতে বলে দাও
জগা খাজাঞ্চিমশাই চলে যাচ্ছিল। পেছন থেকে আবার ডাকলে ছোটমশাই–শোনো
জগা খাজাঞ্চিমশাই ফিরল।
ছোটমশাই কী বলতে গিয়েও থেমে গেল।
বললে–না থাক, তুমি যাও
জগা খাজাঞ্চিমশাই চলে যেতেই ছোটমশাই চিঠিখানা হাতে নিয়ে বড়গিন্নির মহলের দিকে চলতে লাগল।
*
আপনি ফেব্রুয়ারির সন্ধির অনুরূপ কার্য না করিয়া নানাপ্রকার ছল করিয়া আসিতেছেন। চার মাসে অঙ্গীকৃত অর্থের মাত্র পঞ্চমাংশ শোধ করিয়াছেন। সন্ধিবন্ধনের সঙ্গে সঙ্গেই ইংরেজগণকে বাংলা হইতে তাড়াইবার জন্য ফরাসি সেনাপতি বুশিকে আহ্বান করিয়াছেন। ফরাসি সেনানি ল’কে এখনও রাজধানী হইতে পঞ্চাশ ক্রোশ দুরে নিজ অর্থে পোষণ করিতেছেন। অকারণে ইংরেজগণকে অপমান করিয়াছেন। ফৌজ পাঠাইয়া কাশিমবাজার কুঠি অনুসন্ধান করিয়াছেন, একবার ইংরেজ উকিলকে দরবার হইতে দূর করিয়া দিয়াছেন। অঙ্গীকৃত স্বর্ণমুদ্রা দেন নাই, এবং উমিচাঁদই ইংরেজগণকে ওইরূপ অঙ্গীকারের কথা বলিয়াছে বলিয়া তাহাকে নগর হইতে বহিস্কৃত করিয়াছেন। পক্ষান্তরে ইংরেজগণ সহিষ্ণুতার সহিত সমস্ত সহ্য করিয়াছেন। পাঠান আক্রমণসংবাদে ভীত হইলে তাহারা সাহায্য করিতে প্রস্তুত ছিলেন। এক্ষণে উপায়ান্তর না দেখিয়া ইংরেজ সৈন্য মুর্শিদাবাদ যাত্রা করিল। সেখানে গিয়া আপনার দরবারের প্রধান পাত্র-মিত্র মিরজাফর, দুর্লভরাম, জগৎশেঠজি, মিরমদন ও মোহনলালের উপর ভার দিব। তাহারা যাহা মীমাংসা করিবেন, রক্তপাত পরিহারের জন্য আপনি তাহা স্বীকার করিয়া লইবেন, ভরসা। করি।
ইংরেজ ফৌজ আগেই কলকাতা ছেড়ে চলে গেছে। ক্লাইভ সাহেব চিঠিটার নীচেয় সই করে ফ্লেচারের হাতে দিলে।
তারপর নিজেও নৌকোয় চড়ে বসল। দু’শ নৌকোর ব্যবস্থা হয়েছে। পেরিন সাহেবের বাগানে কেউ নেই বলতে গেলে। সব ফাঁকা। শুধু পাহারা দেবার জন্যে কয়েকজন সেপাই রইল। ক্লাইভ সাহেব আরও কয়েকজনকে নিয়ে বজরায় উঠে বসল। কলকাতা থেকে নবদ্বীপ। নবদ্বীপ থেকে ছ’ক্রোশ দূরে পাটুলি, পাটুলি থেকে ছ’ক্রোশ দূরে কাটোয়া। সেখান থেকে আরও, উত্তরে সাঁকাই। অ্যাডমিরাল ওয়াটসন আগেই চলে গেছে।
হঠাৎ মনে হল আর একটা নৌকো দূর থেকে সাদা কাপড় ওড়াচ্ছে।
হু ইজ দ্যাট? ও কে! ও কারা?
ক্লাইভ নৌকো থামাতে বললে। বললে–স্টপ হিয়ার
পেছনের নৌকোটা ছুটতে ছুটতে আসছে সোঁসোঁ করে। তারপর একটু কাছাকাছি আসতেই ওয়াটস চিৎকার করে উঠল-কর্নেল
ক্লাইভ অবাক হয়ে গেছে। বললে–কাশিমবাজার কুঠি ছেড়ে চলে এসেছ?
ইয়েস। কিন্তু আর একটা নিউজ আছে কর্নেল। আমরা মরিয়ম বেগমকে অ্যারেস্ট করেছি
কোথায়?
ভেতরে আছে।
*
তারপর? তারপর কী হল?
উদ্ধব দাস সেই গল্প এসে শুনত মরালীর সামনে বসে। আর বেগম মেরী বিশ্বাস’ কাব্য লিখত।
সে বলত—তারপর? তারপর কী হল?
ক্লাইভ সাহেব উদ্ধব দাসকে বড় খাতির করত। বড় ভালবাসত তাকে। বলত–পোয়েট, তুমি নবাবকে গান শোনাতে পারলে না, কিন্তু আমি তোমার গান শুনেছি। তুমি তো মেরীর জীবন কাহিনী লিখছ, কিন্তু আমার জীবন কাহিনী কে লিখবে?
আশ্চর্য না আশ্চর্য, ইতিহাসে কে কার কাহিনী লেখে! সেই ক্লাইভ সাহেবই কি জানত, একদিন তারও কাহিনী লিখবে উদ্ধব দাস। উদ্ধব দাসকে একদিন সাহেব জিজ্ঞেস করেছিল লাইফের মানে কী, পোয়েট?
তার মানে? উদ্ধব দাস বুঝতে পারেনি প্রশ্নটা।
সাহেব বলেছিল–আমি এত যুদ্ধ করলাম, এত কাণ্ড করলাম, অথচ মনে হয় এ যেন আমার ঠিক হল না, আমি ন্যায় করলাম কি অন্যায় করলাম বুঝতে পারছি না। আমি ছিলুম গরিব, হয়েছি বড়লোক, কিন্তু তবু মনে হয় ঠিক যেন এই জীবন আমি চাইনি! বলতে পারো পোয়েট, কেন এমন হয়?
উদ্ধব দাস বলত–দেখুন প্রভু, মানুষ যখন জন্মায় তখন সে কাঁদে, আর সবাই হাসে—
ক্লাইভ বলত–তা তো বটেই মানুষ জন্ম হলেই কান্না দিয়ে শুরু হয় তার জীবন
কিন্তু যখন সে চলে যায় তখন আর সবাই কাঁদে, সেই কেবল হাসতে হাসতে চলে যায়। যে তেমন করে হাসতে হাসতে যেতে পারে, সেই মানুষের জীবনই তো সার্থক প্রভু
কথাটা ক্লাইভ সাহেবের ভাল লেগেছিল। সেইদিন থেকেই মরালী দেখেছিল ক্লাইভ সাহেব যেন কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল। নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলার শেষ জীবনটা দেখেনি সে। শুধু কানে শুনেছিল। সে বড় মর্মান্তিক শেষ। সমস্ত মুর্শিদাবাদ সেদিন কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। সেদিন কোথায় ছিল এই উদ্ধব দাস আর কোথায় ছিল বা সে নিজে।
আরও মনে পড়ে সেই রাত্রের কথা। সে রাত্রে তার মান-সম্ভ্রম সবকিছু জলাঞ্জলি দিয়ে সে ছুটে গিয়েছিল জগৎশেঠজির বাড়িতে। কে যেন তার কানে কানে বলে দিয়েছিল, সেই রাত্রেই তার চরম সর্বনাশ হবে। জগৎশেঠজি বলেছিলেন–আপনি যান বেগমসাহেবা, আমি আপনার স্বামীর কাছে খবর পাঠাব
কিন্তু কে তার স্বামী? কোথায় তার স্বামী? যে-মেয়ে স্বামীর হাত থেকে পালিয়ে বেঁচেছিল তাকে কেমন করে অন্য লোকে উদ্ধার করবে? তাই তাঞ্জামটা আবার মহিমাপুর থেকে তাকে নিয়ে ফিরে এসেছিল। মহিমাপুর দিয়ে ফিরে আসবার সময়ই দেখেছিল, সেই ভোরবেলা কাশিমাজার কুঠি থেকে সাহেবরা ঘোড়ায় চড়ে বেড়াতে বেরোচ্ছে।
