কিন্তু আসবার সঙ্গে সঙ্গে মহিমাপুর থেকে জগৎশেঠজির চিঠি নিয়ে নোক এসেছে।
বড়গিন্নির মেজাজ আরও বিগড়ে গেল সব শুনে। বললে–তা হলে চুপ করে ঠুটো জগন্নাথ হয়ে বাড়িতেই বসে থাকো। আর কিছু করতে হবে না–
ছোটমশাইয়ের বলবার মুখও ছিল না।
একদিন ছোটমশাইয়ের পূর্বপুরুষরা যে বংশের প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিল ত্যাগ-ভোগ–সংযম-সংগ্রাম দিয়ে, এই এতদিন পরে যেন তারই পরীক্ষা হয়ে যাচ্ছে তার ওপর দিয়ে। এতদিন পরে যেন তারই পূর্বপুরুষ আবার বিদেহী আত্মা নিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এতদিন পরে এসে যেন আবার বলছে–তোমার ধর্ম, তোমার বংশ, তোমার নিষ্ঠা, তোমার দেশ, তোমার কাছে আজ সাহস চাইছে, তোমার কাছে তোমার বীর্য চাইছে। আজ তোমার পরীক্ষার দিন। আজ তোমার আত্মবিশ্লেষণের দিন। হয় তুমি ত্যাগ করে দরিদ্র হও, নয়তো আত্মঅধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে সংগ্রাম করো। একক সংগ্রাম যদি সম্ভব না হয়, তা হলে যৌথ সংগ্রাম করো। এ তোমার নিজের অধিকারের প্রশ্ন নয়, এ তোমার নিজের বংশের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নও নয়, এ তোমার রাজ্য, তোমার প্রজা-সাধারণ সকলের অস্তিত্বের প্রশ্ন। সকলের অস্তিত্বের প্রশ্ন নিয়ে আজ ইতিহাস তোমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এর জবাব তোমাকে দিতে হবে।
রাত্রে ঘুমোত ঘুমোতেও ছোটমশাই জেগে ওঠে। প্রতিদিনকার পৃথিবী তার চাহিদা নিয়ে সামনে এসে হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকে। বলে–কই, তোমার জবাব দাও
বড়গিন্নি ভোরবেলা বুড়োশিবের মন্দির থেকে পুজো দিয়ে ফিরে এসে বলে–কী ভাবছ?
ছোটমশাই বলে–না, কই, কিছু ভাবছি না তো!
বড়গিন্নি আর থাকতে পারে না। বলে–দোহাই, আর বসে থেকো না, একটা কিছু করো, তোমাকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখলে আমার ভাল লাগে না
কিন্তু কী করব তুমি বলে দাও?
আমিই যদি বলব তো আমি পুরুষমানুষ হলেই পারতাম।
কিন্তু একটা কিছু পরামর্শ দেবে তো?
তোমাদের এত বড় বড় মাথা রয়েছে, তারা থাকতে আমি দেব পরামর্শ?
ছোটমশাই বলে-মহারাজ তো বললেন আরও কিছুদিন সবুর করতে
কেন, কীসের জন্যে সবুর করব? মহারাজের নিজের বউকে যদি নবাব চুরি করে নিয়ে যেত তো মহারাজই কি সবুর করতেন?
না, সে ব্যাপার নয়। ক্লাইভসাহেব চেষ্টা করছে খুব। আমাকে বলে কিনা আমার বউ নবাবের হারেমের ভেতরে মদ খায়–আমি বললুম তা কক্ষনও হতে পারে না।
বড়গিন্নি বললে–তা বললে–না কেন, সে মদই খাক আর জাহান্নামেই যাক, সে আমরা বুঝব?
তা তো বললাম।
তা শুনে কী বললে?
ছোটমশাই বললে–এত ব্যস্ত মানুষ যে কথা বলবার সময়ই নেই সাহেবের। কথা বলতে বলতে নোক এসে গেল। আর আমরা চলে এলুম। আমি বলে এলুম দরকার হলে আমি ফিরিঙ্গিদের টাকাকড়ি দেব, হাতি দেব, নবাবের সর্বনাশ না হলে আমার ঘুম হচ্ছে না
তুমি বলে এলে ওই কথা?
তা বলব না? মহারাজের সামনেই ওকথা বলেছি। মহারাজও তার সাক্ষী আছেন! মহারাজকেই কি কম বলেছি? কাকে বলতে বাকি রেখেছি? জগৎশেঠজির সঙ্গে দেখা করেও সব বলে এসেছি। তুমি কি ভাবছ আমি সেখানে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকি শুধু? শুনলাম এখন নাকি নবাব ছোটবউয়ের হাতের মুঠোর মধ্যে। ছোটবউ যা বলে নবাব তাই-ই করে। মুর্শিদাবাদের সব নোক সেই কথা বলছে।
আর দুগ্যা? সে-মাগি কী করছে সেখানে বসে বসে? ছোটবউয়ের না-হয় আক্কেল গেছে, কিন্তু সে তো সেয়ানা, তার তো বুদ্ধি-বিবেচনা আছে? সে কী বলে তাল দিচ্ছে?
ছোটমশাই বললে–তাকে সঙ্গে পাঠালাম সবকিছু সামলাবার জন্যে, আর সে পর্যন্ত একটা খবর দিচ্ছে না
বড়গিন্নি বললে–তার কথা ছেড়ে দাও, সে ছোটলোক। ছোটলোকের আর কত বুদ্ধি হবে। কিন্তু তুই যে পোড়ারমুখি নিজের মুখ পোড়ালি, আর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মুখও পোড়াচ্ছিস, তোর একটা আক্কেল-বিবেচনা নেই?
ছোটমশাই বললে–তুমি সব না-জেনে না-শুনে তাকে গালাগালি দিচ্ছই বা কেন?
দেব না? আমি তাকে নিজে ঘরে আনলুম, আমিই তাকে এ বাড়ির বউ করে আনলুম, আর আমারই এমন করে সর্বনাশ করলে? আমি তার এই সংসার নিয়ে কী করে দিন কাটাচ্ছি, তা সে বুঝতে পারছে না? এ কি আমার সংসার না তার সংসার, না ভূতের সংসার?
জগা খাজাঞ্চি ভয়ে ভয়ে কাছে আসে। কাজকর্ম বুঝিয়ে সইসাবুদ আদায় করে নিয়ে যায়। সেদিন তার ওপরেও রেগে খাপ্পা হয়ে গেল ছোটমশাই। বললে–সব কাজ আমাকেই যদি করতে হয় তো তুমি আছ কী করতে খাজাঞ্চিবাবু?
মাথা চুলকোতে চুলকোতে চলে যায় জগা খাজাঞ্চিবাবু। অথচ এই জগা খাজাঞ্চিবাবু আছে বলেই তবু টিকে আছে হাতিয়াগড়, তা-ও জানে ছোটমশাই।
আবার সেদিন জগা খাজাঞ্চিবাবু সামনে আসতেই রেগে উঠল ছোটমশাই।–আবার? আবার কী করতে এসেছ শুনি? আমাকে না মেরে তুমি ছাড়বে না?
কিন্তু জগা খাজাঞ্চিবাবু একটা চিঠি দিতেই ছোটমশাই অবাক হয়ে গেল।
কার চিঠি?
চিঠিখানার চেহারা দেখেই ছোটমশাই একেবারে লাফিয়ে উঠেছে। জগৎশেঠজির নিজের নামের সিলমোহর করা লেফাফা। চিঠিখানার একটা ধার ছিঁড়ে ফেলেই ভেতরের লেখা পড়তে লাগল ছোটমশাই: এই পত্রবাহক মারফত জানাইতেছি যে আপনার সহধর্মিণী শ্রীমতী মরিয়ম বেগমসাহেবা কাল রাত্রে আমার হাবেলিতে আসিয়া আমার সহিত দেখা করিয়াছিলেন। তিনি আপনার কাছে ফিরিয়া যাইতে ইচ্ছুক। আমার নিকট তিনি নিজের দুঃখ-দুর্দশার কথা সবিস্তারপূর্বক নিবেদন করিলেন। আমি তাহাকে আশ্বাস দিয়াছি যে, আমি আমার যথাসাধ্য তাহার জন্য করিব। এই পত্রপাঠমাত্র আপনি আমার এখানে চলিয়া আসিবেন। অন্যথা করিবেন না। এখানে নিজামতের ব্যাপারে নিরতিশয় গণ্ডগোল চলিতেছে। কখন কী হয় কিছুই বলিতে পারা যায় না। এই সময়ে আপনার সহধর্মিণীকে সরাইয়া লওয়া যাইতে পারে। পরে এ-সুযোগ আর কখনও না-আসিতে পারে। ইতি–
