কেন, তোর কী হয়েছে খুলে বল না। চেষ্টা করেই না হয় দেখি, কিছু করতে পারি কিনা তোর জন্যে।
মরালী বলত–তোমার নাতিও আমাকে সেই কথা বলে নানিজি।
তা, সে তো ঠিক কথাই বলে বাছা। মির্জা তোকে ভালবাসে বলেই ওই কথা বলে।
মরালী বলে আমি সেকথা জানি নানিজি। কিন্তু ওই যে বললুম, ভগবান আমার সব চাওয়ার মুখে ঝাটা মেরে দিয়েছে! চাইতে কি আমার অসাধ? কিন্তু কেমন করে চাই? আমি বউ হয়েও কারও বউ হতে পারলাম না, আমার সোয়ামি থেকেও কেউ আমার সোয়ামি হতে পারল না।
নানিজি বলত-কী জানি বাপু, আমি তোর হেঁয়ালি কথা বুঝতে পারি না
কথা বলে আর দাঁড়াত না মরালী, সোজা তার নিজের ঘরে গিয়ে খিল দিয়ে দিত। এ যে কী যন্ত্রণা, তা কাউকেই বোঝানো যেত না,কাউকে বোঝাতে চাইলেও বুঝত না। কান্ত চেষ্টা করেও কখনও বুঝতে পারেনি। কান্তকে অনেকবার মরালী বলেছে–তুমি কেন আমার পেছন পেছন ঘুরছ? তুমি যাও না এখান থেকে। আমাকে না খুন করে কি তুমি শান্তি পাবে না?
কান্ত বলত–কেন, আমি তোমার কী করলুম?
কেন তুমি আমার সামনে সামনে থাকো? কেন তুমি আসো আমার কাছে? তোমার কি আর কোনও চুলোয় যাবার জায়গা নেই? নিজামত ছাড়া কি আর কোথাও চাকরি জোটে না তোমার?
কান্ত বলত–কিন্তু তুমিই তো আমাকে ডাকো মরালী। আমি একদিন না এলে তুমিই তো আমাকে ভাকতে পাঠাও
যাও, এবার থেকে আমি ডাকতে পাঠালেও আর এসো না। খবরদার, আর আসবে না।
মাঝে মাঝে মরালীকে দেখে অবাক হয়ে যেত কান্ত! যেন পাগলের মতো আবোলতাবোল বকত। কান্তকে দেখলে যা ইচ্ছে তাই বলে গালাগালি দিত। আবার কিছুদিন দেখা না হলে ডেকে পাঠাত।
তখন কাছে গেলে মরালী বলত–কী হল, কদিন আসোনি যে?
কান্ত বলত–তুমিই তো আসতে বারণ করলে!
বা রে, আমিও বারণ করলাম, আর তুমিও তাই আসা বন্ধ করলে?
কান্ত বলত–আমি আসিনি বটে, কিন্তু তোমার খবর নিয়েছি। কিন্তু কেন আমার খবর নাও বলল তো তুমি? আমি তোমার কে? তোমার সঙ্গে আমার কীসের সম্পর্ক?
এইরকম আবোলতাবোল কত বকত মরালী। জীবনে কান্ত কখনও মরালীকে বুঝতে পারেনি। একবার মনে হত মরালী তাকে পছন্দ করে। কান্ত যে তার কাছে লুকিয়ে লুকিয়ে যায়, সেটা তার ভাল লাগে। আবার এক একদিন কী যে হয়, তখন আর তাকে চেনা যায় না।
সেদিন ভোরবেলা মরালীর তাঞ্জামটা যাচ্ছিল মতিঝিলের দিকে। কান্তও পেছন পেছন গেল। তাঞ্জামটা মতিঝিলের ভেতরে গিয়ে ঢুকল। চবুতরায় নেমে ভেতরে যাবার মুখে কান্তকে দেখেই থমকে দাঁড়াল। বললে–কী হল, তুমি আবার এখানে কেন?
তুমি যে আমায় আসতে বলেছিলে?
আমি? আমি আবার কখন তোমায় ডাকলুম?
সেই যে উদ্ধব দাসকে নিয়ে আসতে বলেছিলে। তাকে এনেছি মুর্শিদাবাদে। অনেক কষ্টে তাকে মোল্লাহাটি থেকে ধরে এনেছি।
কিন্তু এখন তো আমার শোনবার সময় নেই। নবাবেরও গান শোনবার সময় হবে না এখন।
কান্ত বললে–তা হলে তাকে চলে যেতে বলব?
মরালী কী যেন ভাবলে। তারপর বললে–এখন যে ভীষণ কাণ্ড বেধে গেছে এর মধ্যে। তুমি জানো না কিছু? বোধহয় আমিও আর বাঁচব না
সেকী?
কান্ত অবাক হয়ে গেল মরালীর কথা শুনে। মরালী বলছে কী? অনেক দিন কান্তই মরালীকে সাবধান করে দিয়েছে। আর মরালীই আজ কান্তকে ভয় পাইয়ে দিলে? কান্ত আরও কী বলতে যাচ্ছিল কিন্তু ওদিকে চবুতরার মধ্যে যেন কারা এল। অনেক লোকজনের ভিড় হতে লাগল।
তবু কান্ত এগিয়ে গিয়ে বললে–কী হয়েছে বলো না মরালী!
মরালী বললে–ওয়াট সাহেব কাশিমবাজার কুঠি ছেড়ে পালিয়েছে
কান্তর মনে আছে, সেদিন সেই ওয়াটসাহেবের পালিয়ে যাওয়া উপলক্ষ করেই সমস্ত মুর্শিদাবাদে যেন ঝড় বয়ে গিয়েছিল। সেদিন আর ভাল করে ঘুমই হয়নি কান্তর। শুধু কান্তর কেন, মুর্শিদাবাদে কি কারওই ঘুম হয়েছিল? চকবাজারের রাস্তায় রাস্তায় আবার সবাই গুজগুজ ফিসফিস আরম্ভ করেছিল মনে আছে। সবাই সে সময় কান পেতে থাকত। মিরজাফর সাহেব নাকি ফিরিঙ্গি ফৌজের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। আপনি কিছু শুনেছেন জনাব? কিছু শোনেননি? এ ওকে জিজ্ঞেস করে, ও একে। চকবাজারের রাস্তায় রাস্তায় আবার ঘোট ঘোট জটলা হয়। সকলের মুখ শুকিয়ে যায় খবর শুনে। তবে কী হবে? আবার লড়াই শুরু হবে নাকি? তা হলে মরিয়ম বেগম এতদিন কী করছে? যে গনতকারটা রোজ মানুষের ভাগ্য গণনা করত চকবাজারের রাস্তায় বসে, সেও যেন তখন অন্যমনস্ক হয়ে অন্য আলোচনা করছে। কান্ত সব কথা কান পেতে শুনতে লাগল সমস্ত দিন ধরে। এ কী হল! বুড়ো সারাফত আলি আবার রোজকার মতো সন্ধেবেলা খুশবু তেলের দোকান খুলে বসল। আবার রোজকার মতো আগরবাতির ধোঁয়ার সঙ্গে তাম্বাকুর গন্ধ মিশে রাস্তা মাতোয়ারা করে তুলল। কথাটা বোধহয় সেও শুনেছে। ইয়া আল্লা, জিন্দগির আশা তা হলে পূরণ হবে তার। নেশা তার আরও চড়ে যায়। সন্ধেবেলা বাড়িতে ফিরতেই উদ্ধব দাস জিজ্ঞেস করে–কী গো বাবুসাহেব, তোমার নবাব আমার গান শুনবে না?
*
বহুদিন পরে ছোটমশাই আবার হাতিয়াগড়ে ফিরে এসেছে। কোথায় মুর্শিদাবাদ, কোথায় কেষ্টনগর, কোথায় কালিঘাট আর কলকাতা। সব জায়গায় ঘুরে ঘুরে বড় কান্ত হয়ে পড়েছিল। জগা খাজাঞ্চিমশাই একলা কত দিক সামলাবে! ডিহিদার রেজা আলিও বসে থাকবার লোক নয়। একটা-না-একটা ছুতো করে খাজাঞ্চিখানায় আসে, মুনশি পাঠায়। খোদ মুর্শিদাবাদ থেকে আরও ভেট চেয়ে পাঠিয়েছে নিজামত, তারই তাগাদা করে। ঘি, নয়তো গুড় নয়তো তামাক। আবওয়াব দিয়েও রেহাই নেই। নিজামতের খাতায় যা লেখা আছে তা তো আদায় করবেই, তারপর যা লেখা নেই তারও বরাত আসে।
