নন্দরানির নিজের বিয়েতে শুভদৃষ্টিও হয়নি, ফুলশয্যেও হয়নি, বাসরঘরও হয়নি। কিন্তু পাড়ার সব বিয়ের বাসর জেগেছে।
নন্দরানির মা বলতেন–মেয়েমানুষ হয়ে জন্মেছ, সব মুখ বুজে সহ্যি করতে হবে মা তোমাকে
নন্দরানি কিন্তু মার কথা শুনে হাসত। বলত–মা যেন কী! দিদির চেয়ে তো আমার কপাল ভাল। আমার বর তবু আমার বাড়িতেই থাকে, কিন্তু দিদির বর যে আসেই না একেবারে
তা অনন্তদিদির বর কিন্তু আর একবার এসেছিল। যথারীতি নিজের নৌকো করে পোঁটলাপুঁটলি নিয়ে রাত দেড়-প্রহরের সময় এসে হাজির। জগদীশ বাঁড়ুজ্জে বাড়ির ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন–কে?
অনন্তবালার বর বলেছিল–আমি আপনাদের জামাই বাবাজীবন
কথাটা শুনেই জগদীশ বাঁড়ুজ্জে লাফিয়ে উঠেছিলেন। গিন্নিও উঠেছিলেন। সেই রাত্রে আবার উনুনে আগুন দেওয়া হল। ভাল চাল আনা হল বাবুদের মরাই থেকে। সেই অত রাত্রে আবার পাশের ডোবা থেকে বড় বড় কই মাছ ধরা হল। গাছের কলার কাদি থেকে কলা পেড়ে, সরের ঘি, নারকেল নাড়ু, দুধ-ক্ষীর খেতে দেওয়া হল জামাইকে। জামাইয়ের জন্যে কাঁঠাল কাঠের সিন্দুক খুলে বগি থালা, জামবাটি, রেকাবি বার করা হল।
জামাই বাবাজীবন খেতে বসবার আসনে খেতে বসল কিন্তু ভাতে হাত দিলে না।
বললে–আমি তো খেতে আসিনি, কিছু টাকার দরকারে এসেছিলাম আপনার কাছে
বাঁড়ুজ্জেমশাই অবাক হয়ে বললেন–টাকা!
অনন্তবালা ততক্ষণে তোরঙ্গ থেকে একখানা পোশাকি পাটশাড়ি বার করে পরে নিয়েছে। খোল দিয়ে মুখখানা মেজে চকচকে করে নিয়েছে। মা বিছানা করে দিয়ে গেছে। কনে-জামাই এই প্রথম এক ঘরে শোবে। তাম্বুল দিয়ে পান সেজে ডিবে ভরতি করে দিলেন। তারপর মেয়ের কাছে গিয়ে চুপি চুপি ফিসফিস করে বললেন–এইটে খোঁপায় বেঁধে রাখ।
ছোট একটা ন্যাকড়ায় বাঁধা পুঁটলির মতন।
কী এটা?
মা বলেছিল–দুগাকে বলেছিলাম কিনা, দিয়েছে সে, অচ্ছেদ্দা করিসনে—
কী আছে এতে?
মা বলেছিল–কী জানি মা কী আছে, দুৰ্গ দিয়েছে, দুগাই জানে–বলছিল সাপের গায়ের এঁটুলি আর দানকাকের রক্ত,
অনন্তবালা বললে–কী হবে এ দিয়ে?
মা রেগে গিয়েছিল–তুই আর জ্বালাসনে বাপু, মেয়ের এত বড় বয়েস হল, এখনও জামাইকে বশ করতে পারলিনে, তোর জন্যে আমার মাথা খুঁড়ে মরতে ইচ্ছে করে মা
তারপর অনন্তবালা সেজেগুজে বিছানায় বসেই রইল। জামাই খেয়ে ঘরে শুতে আসবে। কিন্তু গোল বাধল খাবার আগেই। জামাই বললে–আমি খেতে তো আসিনি, টাকা নিতে এসেছি।
মা আড়াল থেকে বললে–এত দিন পরে এলে বাবাজি, না খেলে কি চলে? খেয়েদেয়ে ঘরে একটু বিশ্রাম করো, টাকা তোমায় দেবই যেমন করে থোক–
কী জানি কী হল! জামাই খেলে সবকিছু চেটেপুটে। কিন্তু খাওয়ার পর আর ওঠে না আসন ছেড়ে।
বললে–এবার টাকা ছাড়ুন, খাইয়েদাইয়ে নিয়ে শেষে টাকা দেবেন না, আমার এসব অনেক দেখা আছে
তা বাবাজীবন বিশ্রাম তো করবে একটু, অনন্তবালার সঙ্গে একটু দেখাও তো করবে–
জামাই নাছোড়বান্দা। বললে–ওসব কথা সবাই বলে, শেষে কলা দেখিয়ে দেয়, আমি ওসব অনেক দেখেছি, কথায় আর ভুলছে না এ শর্মা
জগদীশ বাঁড়ুজ্জের কিছু টাকা ছিল লুকোনো। কাঁঠাল গাছের তলায় বহুদিন আগে লুকিয়ে রেখেছিলেন তিনি। অবরেসবরে বিপদেআপদে কাজে লাগতে পারে। সেই অত রাত্রে আবার শাবল নিয়ে গিয়ে খুঁড়ে বার করে আনলেন। পাঁচটি মাত্র টাকা। কাদামাটি মাখানো। জামাইয়ের হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন যৎসামান্য এই যা ছিল সব তোমায় দিলাম বাবাজীবন, এইটি নিয়ে একটু বিশ্রাম করে যাও শুধু
জামাই টাকা ক’টি ট্র্যাকে খুঁজে নিলে। কিন্তু বিশ্রাম করতে শোবার ঘরে আর গেল না।
বললে–তবে আর থাকা হল না আমার, ঘুষুটির চাটুজ্জে মশাইয়ের বাড়িতেই যাওয়া ভাল ছিল দেখছি
বলে উঠল জামাই। তারপর সেই নিজের এঁটো বগি থালা, জামবাটি, রেকাবি সবকিছু পোঁটলায় বেঁধে নিয়ে আবার গিয়ে উঠল নৌকোতে। অনন্তবালা তখনও সেজেগুজে বসে ছিল বিছানায়। মা ঘরের ভেতর ঢুকে চিৎকার করে উঠল–তোর মরণ হয় না মুখপুড়ি, তুই মরিসনে কেন, আমি দেখে চোখ জুড়োই, এত ধিঙ্গি বয়েস হল, জামাই বাড়ি বয়ে এল আর তুই ঠুটো জগন্নাথ হয়ে বসে রইলি? জামাইয়ের পা দুটো জড়িয়ে ধরতে পারলিনে?
সেদিন অত বকুনি খাওয়ার পরও অনন্তবালা পাথরের মতো চুপ করে বসে ছিল।
কিন্তু নন্দরানির বেলায় আর সে-সব কোনও আয়োজন অনুষ্ঠান করেননি জগদীশ বাঁড়ুজ্জে। আর তখন টাকাকড়িও ছিল না তার।
নয়ানপিসি পরামর্শ দিয়েছিল তার চেয়ে নন্দরানির গাছবরে বিয়ে দাও দাদা, মেয়ে এমনিতেও ঘরে থাকবে, অমনিতেও ঘরে থাকবে, জাত-কুলও বজায় থাকবে
তা তাই-ই হল শেষপর্যন্ত। শুভদিনে পাঁজি দেখে বরণডালা কুলো পিদিম সুপুরি হলুদ আর দুধের সর নিয়ে কলাগাছের তলায় গিয়ে সাত পাক দিলে নন্দরানি। পুরুতমশাই মন্ত্র পড়তে লাগল।
নয়ানপিসি বললে–এবারে কলাগাছটাকে দুহাতে জড়িয়ে ধর
নন্দরানি তাইই করল।
নয়ানপিসি বললে–এবার এই কড়ি আর সুপুরি নিয়ে শেকড়ের কাছে রাখ, রেখে মনে মনে তিনবার বল
কলাগাছ বর,
হলাম স্বয়ংবর,
কড়ি দিলাম, সুপুরি দিলাম,
দিলাম দুধের সর।
তুমি আমার বর।
এমনি করে একদিন জগদীশ বাঁড়ুজ্জের ছোট মেয়েরও বিয়ে হয়ে গেল। আর শুধু কি নন্দরানি। এ-গাঁয়ের আরও অনেক মেয়েরই এমনি করে বিয়ে হয়ে গিয়েছে। এমনি করেই নন্দরানির মতো বাপের বাড়িতে হাঁড়ি ঠেলে তারা। এমনি করেই বাড়ি বাড়ি বর দেখে বেড়ায়, কারও বাড়ি জামাই এলে ঘটা করে দেখতে যায়, বরের সঙ্গে ফস্টিনস্টি করে। বরকে হাসায়, নিজেরাও হেসে গড়িয়ে পড়ে। তারপর একদিন খবর আসে গুপ্তিপাড়া কিংবা বর্ধমান কিংবা পূর্বস্থলী কিংবা বড়চাপড়ার শ্রীযুক্ত দেবনারায়ণ দেবদর্শন: সময়োচিত নিবেদনমিদং ৩ বৈশাখ শুক্রবার বেলা আড়াই প্রহরের সময় আমার পিতা লোকান্তর হইয়াছে জ্ঞাত কারণ লিখিলাম, ইতি। আর সঙ্গে সঙ্গে একশো মেয়ের শাঁখা ভাঙে, সিঁদুর মোছে, শাড়ি ছেড়ে থান কাপড় পরে। তাদের সবাই আজ জড়ো হয়েছে মরালীর বিয়েতে। সবাই বাসর জাগবে বলে এসেছে। নয়ান পিসিরও কবে বিয়ে হয়েছিল কে জানে। নিজেও নয়ানপিসি কখনও শ্বশুরবাড়ি যায়নি। পাড়া-প্রতিবেশীর বিয়ে উৎসব অনুষ্ঠানে খেটে খেটে পরিশ্রম করে উপদেশ দিয়েই নয়ানপিসি নিজের জীবনটা কাটিয়ে দিলে।
