মির্জা বলে কিন্তু তখন কেন তোমার কথা শুনিনি নানিজি? তোমার কথা না শুনলে আমাকে তুমি বকোনি কেন? কেন আমাকে বলোনি যে, এ-জীবনেই পাপের ফল ভোগ করতে হয় মানুষকে? কেন তুমি শেখাওনি আমাকে যে, মসনদের চেয়ে মানুষের ভালবাসা আরও বড় মসনদ!
নানিবেগম বলত–কিন্তু হঠাৎ তোর একথা কেন মনে এল রে?
না নানিজি, আমি কোরান শুনছিলুম। কোরান শোনার পর আমার ঘুম এল আবার। আজকাল রাত্রে ভাল করে ঘুমোই, তা জানো নানিজি?
নানিবেগম বলত–সে তত ভাল কথা রে। সেই জন্যেই তো আমি কোরান রোজ পড়ি
কিন্তু তা হলে তুমি আমার নানাকে এসব শেখালে না কেন?
নানিবেগমের মুখের জবাব বন্ধ হয়ে আসত কথাগুলো শুনে। নানিবেগমই কি সেদিন কম কষ্ট পেয়েছিল? এই মসনদ কি কারও কাছে আরামের মসনদ ছিল কোনওদিন? নবাব আলিবর্দি কি বিশ্বাসঘাতকতা করেনি নবাব সুজাউদ্দিনের সঙ্গে। একদিন যে-আলিবর্দিকে, যে-হাজি আহম্মদকে সুজাউদ্দিন আশ্রয় দিয়েছিল, তার বিশ্বাসঘাতকতা করতে কেন নবাব আলিবর্দি খাঁ’র বাধল না? সরফরাজ তো কোনও অন্যায় করেনি, তবে কেন আলিবর্দি খাঁ তাকে খুন করতে গেলেন? এ কথা কি সত্যি যে, হাজি আহম্মদ বিষ খাইয়ে সুজাউদ্দিনকে খুন করেছিল? বলল, একথা কি সত্যি?
এসব কথা এতদিন পরে কেন মনে এল মির্জা?
না, তুমি বলো, তোমাকে বলতেই হবে। তোমাকে এর জবাব দিতেই হবে।
এর পর নানিজির আর কোনও জবাব দেবার থাকত না।
তা হলে আজ যদি আমাকে কেউ বিষ দিয়ে নবাব সুজাউদ্দিনের মতো খুন করে ফেলে, তখন তুমি কাঁদতে পারবে? যেমন করে নবাব সরফরাজকে আমার নানাজি খুন করেছিল, তেমনি করে আমাকেও যদি কেউ খুন করে তো তুমি তাকে দোষ দিতে পারবে? বলল, পারবে?
নানিজি কথাগুলো শুনে শুধু কাঁদে। এর জবাব দিতে পারে না।
বলো নানিজি, তোমাকে বলতেই হবে। বলো?
কী বলব, বল?
মির্জা বলে–সত্যি বলল না নানিজি, আমি আমার নিজের পাপের ফলও ভোগ করব আবার নবাব আলিবর্দির পাপের ফলও ভোগ করব? দিল্লির বাদশা যদি কোনও অন্যায় করে থাকে তো তার ফলও ভোগ করব আমি?
নানিজি এসব কথা বেশিক্ষণ শুনতে পারত না। ঘর ছেড়ে চলে যাবার চেষ্টা করত। কিন্তু মির্জা ছাড়ত না। বলত–বলল না নানিজি, আমি কী করব?
নানিজি একটু শক্ত হবার চেষ্টা করত মির্জার সামনে। বলত–কেন রে, এখন তো তোর সব ঠিক হয়ে গেছে। এখন তো আর কোনও অশান্তি নেই। তুই যা চেয়েছিলি, সব তো পেয়েছিস!
মির্জা বলত–আমি কী পেয়েছি নানিজি?
কেন, কী পাসনি তুই? তুই এই মসনদ চেয়েছিলি, তা তো পেয়েছিস।
মির্জা বলত–একে মসনদ পাওয়া বলে নানিজি? চারদিকের এই ষড়যন্ত্র, চারদিকের এই দুশমনি, এই-ই কি আমি চেয়েছিলুম?
তা হলে বল, কী চাস তুই?
মির্জা বলত–আমি একটু ভালবাসা চাই নানিজি, এখন আর কিছু চাই না!
কেন, আমি কি তোকে ভালবাসি না?
তুমি ভালবাসলে কী হবে নানিজি, আমি তো তোমাকে ভালবাসি না। মরিয়ম বেগমসাহেবা। আমাকে বলেছে যে, ভালবাসা পেলেই শুধু হয় না, ভালবাসার প্রতিদানও দিতে হয়!
তা তুই কি আমাকে ভালবাসিস না মির্জা?
মির্জা বলত–আমি তোমাকে কী করে ভালবাসব নানিজি? পাপ করে করে কি আমার বুকের মধ্যে আর কিছু ভালবাসা আছে যে ভালবাসব?
নানিজি বলত–তুই আর ওসব কথা ভাবিসনি মির্জা, ওসব কথা ভাবলে মসনদ রাখা চলে না, মসনদে বসলে ওসব কথা ভাবতে নেই। কে কী ভাববে, কার কী ক্ষতি হবে, কে আমাকে ভালবাসল না বাসল, ওসব নবাববাদশার ভাবনা নয়। ও ভাবলে তোর মাথা খারাপ হয়ে যাবে
আমার মাথা খারাপই হয়ে গেছে নানিজি!
কিন্তু এই বয়েসেই মাথা খারাপ হলে তো তোর চলবে না মির্জা! তোর ভাল-মন্দের ওপর যে আমাদের সকলের ভাল-মন্দ নির্ভর করছে রে। তোর একটা কিছু হলে তখন আমরা কী করব, আমরা কোথায় যাব? আমাদের কথাও একবার ভাববি তো তুই?
চেহেল-সুতুনে এসে নানিবেগম মরালীকে জিজ্ঞেস করত–কী রে মেয়ে, মির্জা আজকাল অমন করে কথা বলে কেন রে? তুই ওকে কী শিখিয়েছিস? কী বলেছিস ওকে? তুই কি আমার সর্বনাশ করতে চাস?
কেন নানিজি?
কেন, তুই জানিসনে যে, নবাববাদশাদের ওসব কথা শোনাতে নেই!
মরালী বলত–কেন নানিজি, নবাববাদশারা কি আলাদা?
আলাদা না হলে খোদাতালাহ তো সকলকেই নবাব করতে পারত। সকলকে নবাব করেনি কেন? নবাববাদশারা যদি আলাদা না হত তো তাদের কেউ ভয় করত, ভক্তি করত?
কিন্তু তোমার মির্জা যে তাতে শান্তি পায় না নানিজি। শান্তির জন্যেই তো আমি কলকাতা থেকে আসবার সময় তোমার নাতিকে রামপ্রসাদের গান শুনিয়ে দিলুম। শান্তির জন্যেই তো তোমার নাতি আজকাল মৌলভিসাহেবকে ডাকিয়ে কোরান পড়ছে। মসনদের চেয়ে তো শান্তি বড় জিনিস নানিজি!
নানিজি বলত–যা ভাল বুঝিস কর বাপ, আমার কিন্তু ভয় করছে
মরালী বলত–না নানিজি, দেখো, তোমার কোনও ভয় নেই, তোমার মির্জা এবার ভাল হয়ে যাবে
কিন্তু আমার মির্জার জন্যে তোর এত ভাবনা কেন রে? আরও তো কত বেগম রয়েছে চেহেল-সুতুনে, তারা তো কেউ এমন করে ভাবে না?
মরালী বলত–তারা তো আমার মত কেউ এত হতভাগি নয় নানিজি!
সেই তোর এক কথা! তোর কী হয়েছে বল তো? কীসের দুঃখু তোর! বললুম তোকে না হয় তোর সোয়ামির কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি, না হয় যা তুই চাইবি, তাই করে দেব। তা কিছুই তো তুই চাস না–
মরালী বলত–ভগবান যে আমার চাওয়ার মুখে ঝাটা মেরে দিয়েছে নানিজি! লোকে সোয়ামি চায়, সংসার চায়, ছেলেমেয়ে চায়, কিন্তু আমি যে সে-সব কিছুই চাইতে পারিনে নানিজি!
