আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি যাও—
আর দাঁড়াল না ফ্লেচার। কিন্তু কাশিমবাজারের কুঠিতে বসেও মনটা খচখচ করতে লাগল। তা হলে তো তাদের সব ষড়যন্ত্র জেনে ফেলেছে মরিয়ম বেগম।
উমিচাঁদ বললে–আমিও যাই—
ওয়াটস বললে–তুমি একলা গেলে কেউ জেনে ফেলবে–তার চেয়ে…
তারপর একটু ভেবে বললে–আমিও তোমার সঙ্গে যাব
কোথায়?
ক্যালকাটায়। মরিয়ম বেগম যখন সব জেনে ফেলেছে তখন এখানে থাকা আর সেফ নয়, সেবারের মতো তা হলে নবাব আবার আমাকে অ্যারেস্ট করবে
উমিচাঁদ বললে–তা হলে কুঠি কে দেখবে?
কেউ জানবেনা আমি চলে যাচ্ছি। এখানে কাউকে জানাবনা। তোমার সঙ্গে যেন আমি মর্নিং-ওয়াক করতে বেরোচ্ছি, এইভাবে দুটো ঘোড়া নিয়ে দুজন চলে যাব
তারপর?
ওয়াটস্ বললে–পরের কথা পরে ভেবে দেখব। এখানে সব জানাজানি হয়ে গেছে, এখনই নবাবের লোক এসে যাবে।
উমিচাঁদ বললে–কিন্তু মরিয়ম বেগম কলকাতায় কী করতে যাবে? সেখানে তার কী কাজ? আবার ক্লাইভসাহেবের কাছে যাবে নাকি! আবার কী মতলব?
ওয়াটস্ বললে–কী জানি কী মতলব, কর্নেলসাহেবের তো আবার মেয়েমানুষের ওপর দুর্বলতা আছে। তাকে মিসগাইড করতে পারে
আর দেরি নয়। যেখানকার জিনিস সেখানেই পড়ে রইল। কাশিমবাজার কুঠি থেকে দু’জন। ভোরবেলা বেরোল ঘোড়ায় চড়ে। সবাই দেখলে সাহেবরা বেড়াতে বেরোচ্ছে। ফিরিঙ্গি কুঠির সাহেবরা এমন করেই রোজ বেড়ায়। চাষারা লাঙল নিয়ে খেতের দিকে চলেছে। বর্ষার আগেই খেত খুঁড়ে তৈরি রাখতে হবে। তারপর যখন আরও সকাল হল তখন সামনে ধুধু করছে ফাঁকা পোডো জমি। সেখানে তখন কেউ লোকজন আসেনি। দুটো ঘোড়া জোর কদমে ছুটতে লাগল। যখন আর কোনও কেউ দেখবার ভয় নেই, তখন অগ্রদ্বীপের কাছে এসে ঘোড়া থেকে নেমে পড়ল ওয়াট। ঘোড়া দুটোকে ছেড়ে দিলে, যা চরে চরে ঘাস খেয়ে বেড়া। কাদের একটা নৌকো ছিল ঘাটে। সেই নৌকোটা নিয়েই উমিচাঁদ আর ওয়াট পঁাড় বাইতে লাগল। বললে–কাম অন উমিচাঁদ-কুইক-কুইক–
সাহেবের গায়ে ক্ষমতা আছে বটে। নবদ্বীপে পৌঁছেই ভাল বজরা পাওয়া গেল। খবর পেয়ে কোম্পানির সাহেব পাঠিয়ে দিয়েছে।
ওয়াটস্ জিজ্ঞেস করলে–ফ্লেচারসাহেব এত শিগগির পৌঁছোল কী করে?
হুজুর, গহনার নৌকোকে টাকা দিয়ে জলদি জলদি চলে গেছেন। কোম্পানির ফৌজও কালনার দিকে রওনা দিয়েছে
তোমাকে কে পাঠাল?
অ্যাডমিরাল সাহেব।
বেশ মজবুত বজরা। নবদ্বীপের ঘাট থেকে উঠলে কালনায় পৌঁছোতে দেরি হবার কথা নয়। দাড়িরা ঝপঝপ করে দাঁড় টেনে চলতে লাগল। বদর, বদর
.
হরিচরণের তখন ভয় লেগে গেছে। সত্যি সত্যিই নিজামতের নৌকো নাকি! হরিচরণও তাগাদা দিতে লাগল দাড়িদের। একটু জোরে জোরে পঁাড় বাও মিঞা, জোরে জোরে
কিন্তু আর বোধহয় ঠেকানো গেল না। পেছনের নৌকোটা যেন তিরের বেগে ছুটে আসছে। অন্ধকার চারদিকে। বজরার আলোটা নিবিয়ে দিয়েছে হরিচরণ, তবু যেন তাদের লক্ষ করেই জোরে জোরে বজরাটা ছুটে আসছে।
দুটো বজরাই জোরে চলেছে। কিন্তু আর পারা গেল না। পেছনের বজরাটা কাছে আসতেই হরিচরণ চিৎকার করে উঠেছে সামাল-সামাল
কিন্তু কারা যেন হরিচরণকে ধরে তার গলা টিপে ধরেছে। নৌকোর ওপর ধস্তাধস্তির শব্দ হল খানিকক্ষণ। দুর্গা বাইরে উঁকি মেরে দেখলে অন্ধকারে কালো কালো কটা ছায়ামূর্তি তাদের নৌকোয় উঠে পড়েছে।
কে? কারা তোমরা?
বউরানি ভয়ে দুর্গার বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ফেলেছে। দুর্গা আবার চেঁচিয়ে উঠল–কে? কারা তোমরা?
ওয়াটস্ তখনও নিজের বজরার মধ্যে বসে আছে। জিজ্ঞেস করলে ভেতরে লেডি কেউ আছে? জেনানা? মেয়েমানুষ?
হ্যাঁ, হুজুর। একজন নয়, দু’জন।
ওয়াটস্ উমিচাঁদের দিকে চাইলে। বললে–দেখলে তো, আমি বলেছিলাম, মরিয়ম বেগম লুকিয়ে পালাচ্ছিল, তাই আমাদের দেখে বজরার বাতি নিবিয়ে দিয়েছিল–
তারপর পঁড়িয়ে উঠে বললে–চলো, ও-নৌকোয় গিয়ে দেখে আসি
উমিচাঁদ বললে–কিন্তু দু’জন কেন? সঙ্গে কি নানিবেগমসাহেবা আছে?
তা হবে, কিংবা কোনও বাঁদি–
ওয়াটস আর উমিচাঁদ দুজনই এ-নৌকো থেকে ও-নৌকোয় গিয়ে উঠল। মরিয়ম বেগমের নৌকোর দাড়ি-মাঝি-মাল্লাদের হাত-পা-মুখ সব তখন বাঁধা হয়ে গেছে। তারা পাটাতনের ওপর পড়ে রয়েছে, কথা বলতে পারছে না।
উমিচাঁদ বললে–খুব সাবধান ওয়াটস্, মরিয়ম বেগমসাহেবার পেট কাপড়ে ছোরা থাকে-
-ওয়াটস্ বললে–তা থাক, আমার কাছেও পিস্তল আছে—
*
ওদিকে যখন রাত আরও গম্ভীর হল, মতিঝিলের ভেতরে নবাবের হঠাৎ কেমন মনে হল, ঠিক যেমন করে রোজ রাত আসছিল, তেমনি করে আর রাত এল না। প্রতিদিন মরিয়ম বেগমসাহেবা আসে, প্রতিদিন এসে পাশে বসে। রামপ্রসাদের কথা বলে, উদ্ধব দাসের কথা বলে, আর ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে কখন পালিয়ে যায় টের পাওয়া যায় না।
বড় আরামে কাটছিল ক’দিন। অনেকদিন পরে একটু শান্তির মুখ দেখেছিল নবাব।
নানিবেগম যেদিন আসত মির্জা জিজ্ঞেস করত–কেমন আছ নানিজি?
নানিবেগম বলত–তুই কেমন আছিস মির্জা?
আমি খুব ভাল আছি নানিজি!
নানিবেগম বলত–তুই ভাল থাকলেই আমি ভাল থাকি মির্জা। আমার নিজের বলতে আর তো কিছু নেই–তুই-ই আমার সব
আচ্ছা নানিজি—
মির্জা যেন হঠাৎ কী বলতে চায়। তারপর বলে–আচ্ছা নানিজি, ছোটবেলায় তুমি আমাকে অনেকবার ভাল হবার কথা বলতে, না?
হ্যাঁ বলতাম। কিন্তু কেন রে? ওকথা জিজ্ঞেস করছিস কেন?
