*
ইতিহাসের এও বুঝি এক পরিহাস। কে জানত বেগম মেরী বিশ্বাস সেই রাত্রে জগৎশেঠজির বাড়ি যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এমন করে সারা পৃথিবীর মানচিত্রের রং বদলে যাবে। সামান্য এক গ্রামের মেয়ে মরালী! মরালীবালা দাসী, শোভারাম বিশ্বাসের মেয়ে। সে-ই হবে সেই রং বদলের উপলক্ষ। আর বেগম মেরী বিশ্বাস নিজেই কি জানত? না
যতক্ষণ জগৎশেঠজির সঙ্গে ওয়াটস্ আর উমিচাঁদের কথা হয়েছে, সব কান পেতে শুনেছে মরালী। পাশের ঘর থেকে স্পষ্ট সব কথা কানে এসেছে।
তারপর আবার যখন জগৎশেঠজি ঘরে ঢুকল তখন মরালী দূরে সরে এসে নিজের জায়গায় বসল।
জগৎশেঠজি বললেন–এত রাত্রে আপনি এখানে এসেছেন, আপনার চেহেল্-সুতুনে কেউ টের পায়নি।
মরালী বললে–টের তো পেয়েছেই–আমার তাঞ্জামের বেহারারা আমার সঙ্গেই এসেছে, তারা বাইরে রয়েছে–
তা হলে?
কিন্তু আমার তো এখন ওসব কিছু ভাববার সময় নেই।
কিন্তু আপনাকে এখন আমার বাড়িতে থাকতে দিলে আপনারও ক্ষতি হবে, আমারও ক্ষতি হবে
মরালী বললে–আপনার মতো লোকও যদি একথা বলেন তা আমি কোথায় যাব? কার কাছে গিয়ে আশ্রয় চাইব? কে আমার মতো মেয়েদের বাঁচাবে? আমাদের ইজ্জত কে রাখবে?
জগৎশেঠজির বোধহয় দয়া হল। কিংবা হয়তো নিজেকে বাঁচাবার জন্যেই বললেন–আপনি এখন চেহেল্-সুতুনে যান বেগমসাহেবা, পরে আমি হাতিয়াগড়ে আপনার স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ করে আপনাকে খবর দেব
কিন্তু আমাকে আপনি খবর দেবেন কী করে?
আপনি বলুন আপনাকে কী করে খবর দেওয়া যায়?
মরালী বললে–একজন লোক আছে আমার তার কাছে আমার খবর নিতে পারেন
কে সে?
চকবাজারে সারাফত আলি নামে এক খুশবু তেলওয়ালা আছে, সেখানে সে থাকে। তার নাম কান্ত। কান্ত সরকার। তাকে খবর দিলেই আমি খবর পাব–
সে কে? জগৎশেঠজি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
মরালী বললে–সে আমার দেশের লোক।
পাশের ঘরে তখন ওয়াটস আর উমিচাঁদ অন্য মতলব করছে। যখন মরিয়ম বেগম এসে গেছে। জগৎশেঠজির বাড়িতে তখন আর দেরি করা চলে না। চলুন, চলুন। উমিচাঁদের রক্তের মধ্যে তখন সন্দেহের ফণা ফোঁস ফোঁস করে উঠছে। একবার ফিরিঙ্গি কোম্পানির হাতে ধরা পড়েছে আগে, আর একবার এই মরিয়ম বেগমের হাতেও ধরা পড়েছিল। এবার ধরা পড়লে আর ছাড়া পাওয়া যাবে না। চলুন! চলন!
ভিখু শেখ তখনও কড়া নজর রেখে ফটকের সামনে পায়চারি করছে। হঠাৎ পেছন থেকে দুজন শরিফ আদমিকে আসতে দেখে পা খাড়া করে বুক চিতিয়ে দাঁড়াল।
সেলাম হুজুর!
কিন্তু তখন আর সেলামের প্রতিদান দেবার সময় নেই কারও। ওয়াটস্ সাহেব বোরখাটা পরে নিয়ে মুখ ঢেকে দিয়েছে। তারপর সোজা পালকিতে উঠে চড়ে বসল দুজনেই। রাত শেষ হয়ে আসছে। মহিমাপুরের আকাশের পুবদিকে তখন একটা তারা জ্বলজ্বল করে জ্বলছে শুধু। সমস্ত পৃথিবী নিস্তব্ধ। সমস্ত হিন্দুস্থান ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু ঘুম নেই ইতিহাসের। সে নিঃশব্দে নিজের খাতায় সালতামামি করে চলেছে অতীত বর্তমান আর ভবিষ্যতের। সামনের সাদা পাতায় তখন আরও কী কী লিখবে, ভাবছে। মৃত্যু না জীবন, পতন না উত্থান, ধ্বংস না সৃষ্টি। মোতোমন উল মুলক আলাউদ্দোলা জাফর খাঁ নসিরি নাসির জঙ মুর্শিদকুলি খাঁ যে মসনদ পয়দা করে গিয়েছে, তার যদি অসম্মান কেউ করে তো তার শাস্তির বিধান লেখা হচ্ছে তখন সেই সাদা পাতায়। ইতিহাস-পুরুষ লিখছে আর ভাবছে।–১৭০৭ সালে, হিজরি ১১১৮, ২৮ জেকদ, ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখে যেবাদশা আওরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্যে নশ্বর দেহ রেখে বেহেস্তে চলে গিয়েছে, তার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে গেল তোমাদের মসনদ। হে ক্ষণভঙ্গুর মনুষ্যসমাজ, কিছুই চিরস্থায়ী নয়। ইহা স্থির জানিবে যে তোমাদের নিয়মের চেয়ে আমার নিয়ম আরও কঠোর আরও নিষ্ঠুর। আমি নিয়ম স্থির করে দিয়েছি যে, যেখানে অত্যাচার সেখানেই পতন, যেখানে অন্যায় সেখানেই ধ্বংস, যেখানে অপব্যয় সেখানেই বিলোপ। এ-নিয়ম তোমরা জানো বা না-জানো, শোনো বা না-শোনো, অনাদি কাল ধরে এ-নিয়ম লঙ্ঘন করে কেউ অবিনশ্বর হতে পারেনি। দোর্দণ্ডপ্রতাপ মহাপ্রাণ আকবর বাদশা যে মহতী শাসনীতির প্রবর্তন করে প্রকৃতিপুঞ্জের হৃদয়াসনে দেশীয় ভূপালের সিংহাসন রচনার প্রকৃষ্ট উপায় উদ্ভাবন করেছিলেন, তার অদূরদর্শী উত্তরাধিকারী ভ্রান্তনীতির অনুসরণ করে মোগল রাজশক্তিকে ঘৃণাস্পদ করে তুলেছিল বলেই আমি তার পতন ঘটিয়েছি। সামনে পতনের সংকেত দিলাম, তোমরা যদি সেসংকেত চিনতে পারো তো বাঁচবে,নয়তো ভাগীরথীর স্রোতে তোমাদের ভাগ্য বিলুপ্ত হয়ে যাবে, দু-তিন শো বছরের মতো। আজ ১১ জুন তারিখের শেষ রাত্রে ইহা লিখিতং। শুভমস্তু।
*
ফ্লেচারকে আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিল ওয়াট।
ফ্লেচার বলেছিল–এ-চিঠি কর্নেল সাহেবকে দেব, না অ্যাডমিরাল সাহেবকে?
ওয়াটস বললে–প্রথমে ক্যালকাটার ফোর্টে যাবে অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের কাছে, তারপর ওয়াটসনকে নিয়ে যাবে পেরিনসাহেবের বাগানে কর্নেল ক্লাইভের কাছে। ভেরি ইমপর্ট্যান্ট ডকুমেন্ট। রাত্রে ঝাপসা অন্ধকারেই ফ্লেচার চলে গিয়েছিল। কিন্তু খানিক পরে আবার এসেছে–স্যার–
কী? কী হল? গেলে না?
ফ্লেচার বললে–স্যার, মরিয়ম বেগমসাহেবা আজ ক্যালকাটায় যাচ্ছে
চমকে উঠেছে উমিচাঁদ। বললে–কে বললে?
স্যার বশির মিঞা, নিজামতের স্পাই
