তারিখ ১৫ই রমজান। ৪ জুলুস। ইতি– মিরজাফর খাঁ
তারই নীচে সকলের সই রয়েছে। ওয়াটসন, ড্রেক, ওয়াট, কিলপ্যাট্রিক, বিচার।
ওয়াটসন জিজ্ঞেস করলে তুমি যেমন ড্রাফট করে দিয়েছিলে ঠিক তেমনই লিখে পাঠিয়ে দিয়েছে। এখন তুমি একটা সই করে দাও
ক্লাইভ বারবার পড়তে লাগল টামর্শগুলো। কোথাও কোনও ফাঁক না থাকে।
ওয়াটসন বললে–ফ্লেচার এই টার্মস নিয়ে চলে এসেছে কাশিমবাজার থেকে এখনই আবার এক কপি নিয়ে মিরজাফরকে দিতে যাবে।
আর ওয়াটস?
সে জগৎশেঠের বাড়িতে গিয়েছিল।
কিন্তু উমিচাঁদ যায়নি?
গিয়েছিল। উমিচাঁদ সঙ্গেই ছিল। কিন্তু ফ্লেচার বললে–যে, মুর্শিদাবাদে সমস্ত জানাজানি হয়ে গেছে।
ফ্লেচার কোথায়?
ওয়াটসন বললে–বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে এসেছি। তুমি আগে ওদের বিদেয় করে দাও, ওরা চলে গেলে তোমাকে আরও অনেক কথা বলব অনেক জরুরি কথা আছে
ক্লাইভ উঠল।
পাশের ঘরে তখনও মহারাজ আর ছোটমশাই চুপ করে অপেক্ষা করছিলেন। ক্লাইভ গিয়ে বললে–মহারাজ, আজকে একটা জরুরি কাজে আটকে পড়েছি, আপনি আর একদিন বরং আসবেন
মহারাজ উঠলেন। ছোটমশাইও উঠল।
ক্লাইভ বললে–কিছু মনে করবেন না ছোটমশাই, আপনারা যদি আমাকে হেলপ করেন তা হলে আমিও আপনাদের হেলপ করব–গড উইল হেলপ আস
অনেক আশা নিয়ে এসেছিল ছোটমশাই। মনটা বড় ভেঙে গেল। আজ কতদিন ধরে কেবল এই ক্লাইভ সাহেবের সঙ্গে দেখা করবার জন্যে চেষ্টা করে আসছে। কিন্তু প্রত্যেকবারই একটানা-একটা বাধা এসে পড়ছে। সেবারও সেই বাউন্ডুলে কবিটাকে মুরুব্বি ধরে এসেছিল। সেবারও বাধা পড়েছিল।
মহারাজ বাইরে বেরিয়ে বললেন–এতদিন ধৈর্য ধরলেন, আর একটু ধৈর্য ধরুন! যদি ধৈর্যই ধারণ করতে না-পারবেন তো পুরুষমানুষ হয়েছিলেন কেন?
কিন্তু আমি বড়গিন্নির কাছে মুখ দেখাব কেমন করে?
তা আপনার তো কিছু দোষ নয়, আপনিই বা কী করবেন?
ছোটমশাই বললে–আমারই তো দোষ, আমি যদি আমার স্ত্রীর রূপ দেখাবার জন্যে বাহাদুরি করে মুর্শিদাবাদে নবাবজাদার বিয়ের সময় না নিয়ে যাই তা হলে এসব আর কিছুই হয় না। কেউ জানতেই পারত না যে আমার স্ত্রী সুন্দরী
ততক্ষণে বাইরে বেরিয়েছে দু’জনে। মহারাজ বললেন–আপনার বজরা কোথায়?
আমি তো কালিঘাটে বজরা রেখে এসেছি।
তা হলে আমার সঙ্গেই চলুন। একসঙ্গে কালীঘাট পর্যন্ত যাই, ওখান থেকে সকলকে নিয়ে আমি কেষ্টনগরে চলে যাব, আপনি হাতিয়াগড়ে চলে যাবেন
কিন্তু আমি বড়গিন্নিকে গিয়ে কী বলব?
মহারাজ বললেন–বলবেন আমি তার ভার নিয়েছি। দেখলেন না ক্লাইভসাহেবের মুখের চেহারাখানা! ভেতরে ভেতরে ওদের ষড়যন্ত্র চলছে। আপনি ভাল করে দেখেননি। আমি দেখেছি, সাহেবের আরদালি যেই ঘরে ঢুকল আর সাহেবের মুখখানা কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেল।
আমি তো বললাম সাহেবকে আমি টাকা দিয়ে পয়সা দিয়ে লোকবল দিয়ে হাতি দিয়ে সবকিছু দিয়ে সাহায্য করব।
ভালই করেছেন বলে। আমি ভেতরে ভেতরে সাহায্য করব, কিন্তু আমি তো মহারাজা হয়ে প্রকাশ্যে সাহায্য করার কথা বলতে পারিনে আপনার মতো। জানাজানি হয়ে গেলে আমাদের সকলের ক্ষতি হয়ে যাবে। রাজনীতিতে অত তাড়াতাড়ি কিছু করতে নেই। সইয়ে সইয়ে ঠিক সময় ঘা দিতে হয় তা জানেন তো! সেই জন্যেই নবাব এখনও আমার ওপর সন্দেহ করেনি। সকলের ওপর সন্দেহ হলে সব বন্দোবস্ত গোলমাল হয়ে যাবে
ছোটমশাই বললে–তা হলে আমি এখন কী করব?
মহারাজ বললেন আমি কৃষ্ণনগরে গিয়েই আপনাকে খবর দেব
কিন্তু কী খবরই বা দেবেন, আমি তো কোনও আশা দেখতে পাচ্ছি না।
মহারাজ বললেন–আশা কারও মেটবার কথা নয় ছোটমশাই, নইলে বাদশা আওরঙ্গজেবের মতো লোক বিরেনব্বই বছরে মরবার সময় কখনও ওইরকম কথা বলে যায়? আপনি আমি তো তুচ্ছ। আমরা যদি তিনশো বছর বাঁচি তবু আমাদের আশা মিটবে না।
.
ঘরের মধ্যে ওয়াটসন বললে–ওরা গেছে এখন?
হ্যাঁ, ওদের বিদেয় করে দিয়ে এলাম।
তা হলে এখনই ফোর্টে চলো।
কেন?
কাশিমবাজার থেকে ওয়াটসন ফ্লেচারকে চিঠি দিয়েছে যে, মিরজাফরের সঙ্গে যে আমাদের কথাবার্তা চলছে তা মুর্শিদাবাদে সব জানাজানি হয়ে গেছে। জগৎশেঠজির বাড়িতে যখন ওয়াটস আর উমিচাঁদ গিয়েছিল তখন হঠাৎ সেখানে মরিয়ম বেগম গিয়ে হাজির
সেকী! মরিয়ম বেগম কী করে জানতে পারলে?
ভগবান জানে! শুনলাম মরিয়ম বেগম নাকি জগৎশেঠের বাড়িতে গিয়ে কান্নাকাটি করেছে, বলেছে। তার হাজব্যান্ডের কাছে ফিরে যেতে চায়
ক্লাইভ বললে–অল ব্লাফ। সমস্ত মিথ্যে কথা
কিন্তু সত্যি হোক মিথ্যে হোক, উই মাস্ট বি কেয়ারফুল। চলো, আমি সমস্ত প্ল্যান করে ফেলেছি। কালকে ওয়াটস আর উমিচাঁদ আসছে। ক্যালকাটায়। আমার মনে হয় এখনই আর্মি নিয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত
ক্লাইভ বললে–আচ্ছা, চলো তা হলে–
দু’জনেই বাইরে বেরোল। আর সময় নেই। একবার ইচ্ছে হল হরিচরণকে বলে যায়। কিন্তু কাছাকাছি কোথাও তাকে দেখা গেল না।
ওয়াটস জিজ্ঞেস করলে কী খুঁজছ? ক্লা
ইভ বললে–আমার এখানে যে লেডিরা রয়েছে তাদের খবর দিয়ে যাচ্ছি
তোমার এখানে এখনও তারা আছে? ওরা তো রইলই, ওদের জন্যে ভাবছ কেন, এখন চলো পরে এসে দেখা কোরো
একদিকে মিরজাফরের টার্মস, আর অন্য দিকে এরা। ঠিক আছে, একটুখানি ফোর্টে যাবে আর আসবে, কত আর দেরি হবে। অ্যাডমিরাল ওয়াটসনও তখন টানাটানি করছে। তখন আর সময়ও নেই। কাউকে না বলে বাইরে চলে এল। তারপর সেই পেরিন সাহেবের বাগানের ছাউনি পেরিয়ে কর্নেল আর অ্যাডমিরালকে নিয়ে কোম্পানির পালকিটা সোজা ফোর্টের দিকে চলতে লাগল। হেঁইও হেঁই, হেঁইও হেঁই হেঁইও–
