দুর্গা বললে–তুমি থামো বউরানি, শেষকালে হিতে বিপরীত হয়ে যাবে। তার চেয়ে কেষ্টনগরের মহারাজাকে বলে যদি কিছু সুরাহা করতে পারি।
শেষকালে যখন নৌকোটা একেবারে মোহানার মুখোমুখি এসে পড়ল তখন বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে। বনজঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে দু-একটা আলো জ্বলতে আরম্ভ করেছে টিমটিম করে। মাঝগঙ্গার ওপর থেকেও বউরানির গা-টা ছমছম করতে লাগল।
হঠাৎ হরিচরণ দরজার কাছে এসে বললে–দিদি, আলোটা নিবিয়ে দিচ্ছি
কেন হরিচরণ, কী হল?
পেছনে কাদের একটা বজরা আসছে!
বজরা? কাদের বজরা? কারা আসছে?
হরিচরণ বললে–কী জানি দিদি, মনে হচ্ছে নিজামতের। নিজামতি ঝালরদার বজরা–
সঙ্গে সঙ্গে আলোটা নিবিয়ে দিলে হরিচরণ। আর চারদিকের অন্ধকারটা আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল। দুর্গা বউরানির আরও কাছে ঘেঁষে এসে দুই হাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে রইল।–ভয় পেয়ো না। বউরানি, এই তো আমি রয়েছি। আমি যতক্ষণ আছি, ততক্ষণ কাউকে তোমার গা ছুঁতে দেব না–
২.১২ পেরিন সাহেবের বাগান
পেরিন সাহেবের বাগানে তখন আর-এক নাটক জটিল হয়ে উঠেছে। সকাল থেকেই ক্লাইভের মনটা অস্থির ছিল। হুগলি থেকে ফেরবার সময়ই ক্লাইভ খবর পেয়েছিল, রাজা দুর্লভরাম আর্মি সরিয়ে নিয়ে গেছে লঙ্কাবাগ থেকে। তারপর এখানে এসে দিদির সঙ্গে কথা বলবার সময়েই কেষ্টনগরের মহারাজা এসে হাজির হয়েছিল। সঙ্গে ছিল হাতিয়াগড়ের জমিদার।
এতদিন ধরে যে-ধারণাটা মনে মনে গড়ে উঠেছিল সেইটেই আরও শক্ত হয়ে শেকড় গজাল সাহেবের মনে। এরাই ইন্ডিয়ান। অ্যাডমিরাল ওয়াটসন আগেই ভাল করে চিনেছিল এদের, এবার ক্লাইভও চিনতে পারলে। া, এরাই ইন্ডিয়ান। সামান্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে একদিন ছ’টাকা মাইনের রাইটার হয়ে এসেছিল সে। না আছে তার ফ্যামিলি পরিচয়, না আছে বিদ্যে, না আছে টাকা। বলতে গেলে কিছুই নেই তার। গড শুধু দিয়েছে দুটো চোখ, একখানা বুক আর দুর্জয় সাহস। ক্যাপিট্যাল বলতে আর কিছুই নেই তার। একজন জগৎশেঠ কি একজন উমিচাঁদ তাকে কিনে নিতে পারে। তবু তার কাছেই এই ইন্ডিয়ানরা আসছে। সবাই চাইছে ক্লাইভ তাদের কিং করে দেবে। ক্লাইভই তাদের সেভিয়ার, ক্লাইভই তাদের অলমাইটি গড। এদের কি লজ্জাও হয় না! এদের কি নিজেদের ওপর একটু আস্থাও নেই? তোমরা তোমাদের কান্ট্রির কথা ভাবছ না, শুধু ভাবছ নিজের লাভ-লোকসানের কথা। কিন্তু আমিও তো মানুষ। আমারও তো লোভ থাকতে পারে। আমিও তো তোমাদের প্রপার্টি কেড়ে নিতে পারি।
ওয়াটসন বলেছিল–এই-ই আমাদের অপরচুনিটি রবার্ট, এমন সুযোগ আর আসবে না। ফ্রেঞ্চরা নেই, ডাচরা নেই, পর্তুগিজরা নেই, এখন আমরাই লর্ড অব দি ল্যান্ড
মহারাজার কথা শুনতে শুনতে ওয়াটসনের কথাগুলোই মনে পড়ছিল বারবার। নবাবের ফেবারে কেউই নেই। নবাবের নিজের মাদার পর্যন্ত নবাবের বিরুদ্ধে। এর চেয়ে বড় হতভাগা আর কে আছে দুনিয়ায়। এনবাব তো যেতে বাধ্য। তবু ইতিহাসের এমন ভাগ্য যে আমিই এই সেঞ্চুরির ডেনিয়্যাল হয়ে উঠব।
হঠাৎ ক্লাইভ বললে–আমি যদি মুর্শিদাবাদ অ্যাটাক করি তো আপনারা আমাকে হেলপ করবেন কথা দিচ্ছেন?
ছোটমশাই সমস্ত কথাই মন দিয়ে শুনছিল। বললে–আমি কথা দিচ্ছি আপনাকে সব রকম সাহায্য করব। আমি টাকা দিয়ে সাহায্য করব, মানুষ দিয়ে সাহায্য করব, আমার হাতি আছে, আপনি যদি চান তো তাও দিতে পারি–
কিন্তু ক্লাইভ উত্তর দেবার আগেই বাইরে কার যেন পায়ের শব্দ হল।
অর্ডারলি!
অর্ডারলি ভেতরে এসে কী যেন বলতে গিয়ে থেমে গেল। মিলিটারি সিক্রেট বাইরের লোকের কাছে প্রকাশ করার কথা নয়। রবার্ট ক্লাইভ মুখ দেখে বুঝতে পারলে। মহারাজকে বসতে বলে পাশের ঘরে গেল। অ্যাডমিরাল ওয়াটসন বসে ছিল সেখানে। জিজ্ঞেস করলেও-ঘরে কারা?
ক্লাইভ বললে–কৃষ্ণনগরের মহারাজ আর হাতিয়াগড়ের জমিনদার—
কী বলছে ওরা? কী করতে এসেছে?
দি সেম প্রপোজাল। ওরাও নবাবের এগেনস্টে। আমরাই ওদের সেভিয়ার। আমাদের হেলপ করতে রেডি ওরা।
কিন্তু এই দেখো, ওয়াটসের কাছ থেকে চিঠি এসেছে। দোহাজারি মনসবদার ইয়ার লুৎফ খা আর মিরজাফর তাদের টার্মস দিয়েছে। এই হচ্ছে মিরজাফরের টার্মস
এক দুই তিন করে বারো দফা শর্ত মিরজাফরের।
এক এক করে সবগুলি শর্ত পড়তে লাগল ওয়াটসন। সাত নম্বর শর্তে লেখা আছে
(৭) আরমানিগণের ক্ষতিপূরণের জন্য সাত লক্ষ টাকা দিব। ইংরেজ, দেশীয় প্রভৃতির মধ্যে কাহাকে কী পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিতে হইবে তাহা ওয়াটসন, ক্লাইভ, ড্রেক, ওয়াটস, কিলপ্যাট্রিক ও বিচার সাহেব ঠিক করিয়া দিবেন।
(৮) কলিকাতা যে-খাত দ্বারা বেষ্টিত আছে তাহার মধ্যে অনেক জমিদারের জমি রহিয়াছে। এই জমি এবং খাতের বাহিরে ছয় শত গজ ইংরেজ কোম্পানিকে দান করিব।
(9) কলিকাতার দক্ষিণে কুলপি পর্যন্ত স্থান ইংরেজ কোম্পানির জমিদারি হইবে। তথাকার সমস্ত কর্মচারী কোম্পানির অধীন হইবে এবং কোম্পানি অন্যান্য জমিদারের মতো রাজকর দিবেন।
(১০) যখন আমি ইংরাজ-সৈন্যের সাহায্য চাহিব তখন তাহার ব্যয়ভার আমার। (১১) হুগলির দক্ষিণে কোনও স্থানে দুর্গ প্রস্তুত করিব না।
(১২) আমি বাংলা বিহার উড়িষ্যা এই তিন প্রদেশের রাজ্যে অধিষ্ঠিত হইলেই উল্লিখিত সমস্ত টাকা দিব।
ঈশ্বর এবং পয়গম্বরের নামে শপথ করিয়া প্রতিজ্ঞা করিতেছি, যতদিন জীবিত থাকিব ততদিন এই সন্ধিপত্রের নিয়ম পালন করিব।
