হরিচরণ পেছন পেছন এসেছিল। বললে–তুমি একটু বুঝিয়ে বলো তো বউরানি। সাহেব ফিরে না এলে কি চলে যাওয়াটা ভাল হবে?
ছোট বউরানি বললে–তা তুমি আমাদের পৌঁছে দাও না গা–আমরা চলে যাই–
হরিচরণ বললে–আমি তো পৌঁছে দিতে পারি, কিন্তু সাহেব ফিরে এসে যদি আমাকে বকাঝকা করে?
বকবে কেন? বকবে কেন শুনি?
দুর্গা চেঁচিয়ে উঠল। আমরা কি এখানে চেরকাল থাকতে এইচি? আমরা কি তোমার মতো সায়েবের চাকর?
হরিচরণ আর তর্কের মধ্যে গেল না। বললে–তা কোথায় নিয়ে যেতে হবে বলো না, আমি নিয়ে যাচ্ছি; আমি কি বলেছি আমি নিয়ে যাব না? তোমাদের দেখাশোনা করবার জন্যেই তো সাহেব আমাকে রেখেছে। বলো, কোথায় যাবে তোমরা?
দুর্গা চাইলে ছোট বউরানির মুখের দিকে। অর্থাৎ কোন দিকে যাওয়া যায়। কিন্তু কারওই তখন মনস্থির নেই। একদিন কেনগরের দিকে যাত্রা করবে বলেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল দু’জনে। সেদিন কী তিথি ছিল তা দেখা হয়নি। তখন যে অবস্থা তাতে তিথি-নক্ষত্র দেখবার সময় ছিল না। শুধু কোনওরকম করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়াটাই ছিল সমস্যা। তখন কি জানত এই মাসের-পর-মাস আটকে থাকতে হবে পথে! তখন কি জানত এইরকম এক ম্লেচ্ছ সাহেবের সঙ্গে এক বাড়িতে একসঙ্গে রাত কাটাতে হবে!
তখন আড়ালে দুর্গা বলত–মুখে আগুন অমন সায়েবের! নিজের মাগ ছেলে কোথায় পড়ে রইল, এখেনে এসেছে লড়াই করতে! তা লড়াই-ই যদি করবি বাপু তো লড়াই করে নবাবকে খুন করে ফেলতে পারছিসনে? তা হলে তুই কীসের সায়েব শুনি? ও পাষণ্ডটাকে মেরে কবরে পুরতে পারছিসনে?
আবার যখন সাহেবের কথায় মনটা ভিজে যেত তখন আবার খুব মিষ্টি কথা বেরোত দুর্গার মুখে।
আহা গো, সারাদিন ভেবে ভেবে মুখটা শুকিয়ে গেছে বাছার!
দুর্গা বুঝতে পারত সাহেব যেন খুব ভাবনায় পড়েছে। কিন্তু ছোট বউরানির মুখখানার দিকে চাইলেই ছোটমশাইয়ের কথাটা মনে পড়ে যেত। আহা, যে-মানুষ বউরানি বলতে পাগল সেমানুষটা সেখানে কী রকম করে দিন কাটাচ্ছে কে জানে! কত ফুল দিয়ে বউরানির খোঁপা বেঁধে দিত দুর্গা। বিকেলবেলা বউরানির গা ধুইয়ে দিয়ে পায়ে আলতা পরিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখত। একদিন খোঁপা বাঁধা খারাপ হলে ছোটমশাই আবার রাগ করত। সেই মানুষ কি আর বউরানিকে দূরে পাঠিয়ে দিয়ে শান্তিতে আছে। তারও প্রাণটা সেখানে ধড়ফড় করছে। এখানে এই পেরিন সাহেবের বাগানে ছোট বউরানি রাত্রে শুয়ে শুয়ে কাঁদে। বলে–আমার গলাটা টিপে আমাকে তুই মেরে ফ্যাল দুগ্যা, আমি মরে যাই, আমার আর বেঁচে থাকতে ভাল লাগছে না।
কতদিন পাশের বাদাম গাছটা থেকে বাদুড় ডাকার শব্দে বউরানি ভয় পেয়ে চিৎকার করে ডেকেছে–দুগ্যা, দুগ্যা
দুর্গা বলেছে–কী বউরানি?
বউরানি বলত–কে যেন কেঁদে উঠল না রে?
অথচ এখান থেকে বেরিয়ে গেলেই যে একেবারে শান্তি, তারও তো কোনও ঠিক নেই। আবার ভাসতে ভাসতে কোথায় গিয়ে কার ডেরাতে ঠেকবে কে বলতে পারে! ৪৯৮
হরিচরণ বলছিল–তা বেশ তো, কেষ্টনগরে যদি যেতে চাও তো সেখানেই তোমাদের পৌঁছিয়ে দিচ্ছি–
তখন বিকেল হয়ে গেছে। ছোট বউরানি লম্বা একটা ঘোমটা দিয়ে নৌকোয় গিয়ে উঠল। সাহেব নেই, না-থাক। সাহেবকে বলে গেলে হয়তো যেতেই দিত না। হয়তো আরও কিছুদিন ঠেকিয়ে রাখত। নানা ছলছুতো করে আটকে রাখত তাদের। কিন্তু লড়াই যদি কোনওদিন না থামে তো চিরকাল কি তোমার বাড়িতে পড়ে থাকব নাকি?
কাপড়ের একটা পোঁটলা ছাড়া আর তো কিছু নেই সঙ্গে। সেই পোঁটলাটাই নৌকোর ভেতরে উঠিয়ে রাখলে হরিচরণ।
সাহেব কিন্তু এসে রাগ করবে খুৰ দিদি!
দুর্গা বললে–রাগ করুক গে। সায়েব কি আমার একেবারে সাতপুরুষের ভাতার, রাগ করলে আমার একেবারে সব্বনাশ হয়ে যাবে।
ছোট বউরানি বললে–তা সায়েব তোমার গেলই বা কোথায় হরিচরণ? আমাদের তো বলে যেতে হয়!
হরিচরণ তখন নৌকোর গলুইতে উঠে বসেছে। বললে–সায়েবের কি মাথার ঠিক আছে বউরানি, এই তো সবে ফরাসডাঙা থেকে ফরাসিদের তাড়িয়ে দিয়ে এল, এরই মধ্যে আবার বোধহয় কাজ পড়েছে
কাজ পড়েছে না ছাই! কাদের সঙ্গে গপ্পো করতে বেরিয়েছে। কারা এসেছিল, জানো তুমি?
হরিচরণ বললে–কত কাজের লোক আসে সাহেবের কাছে, আমি.কি সকলকে চিনি দিদি?
ততক্ষণে গঙ্গার স্রোতে নৌকোয় টান ধরেছে। তরতর করে ভেসে চলেছে উত্তর দিকে। বরানগরের ঘাট পেরিয়ে যতদূর চাও কেবল গাছপালা আর জঙ্গল। বিকেলের নরম সূর্যের আলোয় জলের ঘোট ছোট ঢেউ সোনার মতো চিকচিক করে উঠছে। পেরিন সাহেবের বাগানটা আর নজরে পড়ে না। বাগানের ছাউনির সেপাইরা যারা টের পেয়েছিল, তারা একবার দূর থেকে চেয়ে দেখছিল। কিন্তু এদিকে তাদের ভাল করে দেখা নিষেধ। কর্নেল সাহেব কাউকেই এদিকে আসতে দিত না। বরানগর পেরিয়ে নৌকো বড়গঙ্গায় পড়ল। বড়গঙ্গার এপার ওপার অনেক দূর।
বউরানি হঠাৎ বললে–মরালীকে খবর দেওয়ার কী করলি রে দুগ্যা?
দুর্গা বললে–তোমাকে আগে কেষ্টনগরের রাজবাড়িতে তুলি, তারপর দেখি কী করতে পারি।
সে কি এখন আর আমাদের চিনতে পারবে রে!
মুখপুড়ি চিনতে না পারলে তার মুখ আরও পুড়িয়ে দেব না! আমি সেদিন না বাঁচালে মুখপুড়ি থাকত কোথায় শুনি! আজ নবাবের সঙ্গে শুয়ে কি একেবারে সাপের পাঁচ পা দেখেছে?
তা হরিচরণকে বললে–হয় না আমাদের খবরটা একবার মরিয়ম বেগমকে দিতে?
