জগৎশেঠজি বললেন–খোলেনি, খুলতে যাচ্ছিল, আমি বারণ করলাম। খুব কান্নাকাটি করছে, বলছে, প্রাণ গেলেও আর চেহেল্-সুতুনে ফিরে যাবে না–
আপনি কী বললেন?
আমি ওকে বসিয়ে রেখে আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে এলাম।
এখনও ও-ঘরে বসে আছে নাকি বেগমসাহেবা?
হ্যাঁ।
জগৎশেঠজি বললেন–কিন্তু আমার মনে হল নবাবের হাত থেকে ছাড়া পেলে উনিও বেঁচে যান। খুব কষ্ট হচ্ছে ওঁর। হাজার হোক হিন্দুর মেয়ে তো! স্বামীর ঘর ছেড়ে কতদিন বাইরে থাকতে পারেন।
তা হলে কী করবেন?
কী করব সেই পরামর্শ করতেই ওকে বসিয়ে রেখে এসেছি এখানে। হাতিয়াগড়ের রাজা একবার আমার কাছে এসেছিলেন তার স্ত্রীর কথা বলতে। যখন সেই সফিউল্লা সাহেবকে খুন করেছিল ছুরি দিয়ে।
উমিচাঁদ বললে–আপনি বিশ্বাস করলেন নাকি বেগমসাহেবার কথা? জানেন, ওই বেগমসাহেবা একবার ক্লাইভসাহেবের দফতরে ঢুকে আমার চিঠি চুরি করেছিল।
জগৎশেঠজি বললেন কিন্তু আমার তো বিশ্বাস হয় না উমিচাঁদজি!নবাবের কাছে থেকে নবাবের হুকুম না মেনে উপায় কী বলুন! আসলে বোধহয় মহিলাটি ভাল
কীসে বুঝলেন?
জগৎশেঠজি বললেন–খুর কাঁদতে লাগলেন আমার সামনে
মেয়েরা অমন কথায় কথায় কাঁদতে ওস্তাদ, জগৎশেঠজি!
জগৎশেঠজি বললেন কান্নারও রকমফের আছে উমিচাঁদজি! এ-বেগমসাহেবা আমার বাড়িতেই থাকতে এসেছেন যে৷ বলছেন, আর চেহেল্-সুতুনে ফিরে যাব না।
আপনি কী বললেন?
আমি বেগমসাহেবাকে কী করে আমার হাবেলিতে রাখি তাই ভাবছি। বেগমসাহেবা আমার এখানে আছেন এ-খবর নবাবের কানে গেলে কি আর রক্ষে থাকবে! আমাদের সব চেষ্টা পণ্ড হয়ে যাবে।
ওয়াটস্ সাহেব বললে–আপনি ওকে ভাগিয়ে দিন জগৎশেঠজি!
উমিচাঁদ বললো জগৎশেঠজি, ওকে বিশ্বাস করবেন না—
কিন্তু হাতিয়াগড়ের রাজাকে আমি কী বলব? তিনি যদি আবার এসে আমার কাছে দরবার করেন? তখন আমি তাকে কী বলব? কী বলে কৈফিয়ত দেব? তার স্ত্রীকে নিজের আশ্রয়ে পেয়েও তার কোনও উপকার করিনি এ জেনে তো তার কষ্ট হবে। তিনি বড় ভাল লোক যে
কিন্তু এত রাত্তিরে তাকে পাবেন কোথায়?
জগৎশেঠজি বললেন–তাঁকে আজই খবর পাঠাতে হয়!
খবর পাঠাতে, তার এখানে আসতেও তো দু-তিন দিন সময় লাগবে। ততদিন কোথায় রাখবে বেগমসাহেবাকে?
জগৎশেঠজি বললেন–তাই তো ভাবছি
তারপর ভেবে পরামর্শ করে কিছুই কিনারা পাওয়া গেল না।
জগৎশেঠজি বললেন–আপনারা বসুন, অনেকক্ষণ ওকে বসিয়ে রেখে এসেছি, একবার পাশের ঘরে যাই, ওকে বুঝিয়ে বলি–
কী বলবেন?
আপনারাই বলুন না কী বলব?
উমিচাঁদ বললে–এখন ক্লাইভসাহেবের সঙ্গে আমাদের কথাবার্তা চলছে, এই সময়ে কি বেগমসাহেবাকে নিয়ে এই ঝুঁকির মধ্যে যাওয়া ভাল? নবাব বেশ চুপচাপ আছে, খুঁচিয়ে ঘা করে লাভ কী?
ঠিক আছে আমি আসছি
বলে জগৎশেঠজি আবার দরজা খুলে পাশের ঘরে গিয়ে ঢুকলেন।
*
উঠোন পেরিয়ে দুর্গা তখন সোজা একেবারে ক্লাইভ সাহেবের দফতরে গিয়ে হাজির। কিন্তু অবাক কাণ্ড! সাহেব কোথায়? এই তো হরিচরণ বললে–সাহেব নিজের দফতরে কার সঙ্গে গল্প করছে। কিন্তু দফতর ফাঁকা!
হরিচরণ, ও হরিচরণ, কোথায় গো, তোমার সাহেব কোথায়?
হরিচরণও দৌড়োতে দৌড়োতে কাছে এল। বললে–সাহেব নেই?
না, তোমার সাহেবের দফতর তো ফাঁকা। তুমি বললে–দু’জন লোক এসেছে, সাহেবের সঙ্গে কথা বলছে, কই, কেউ তো নেই ঘরে হরি
হরিচরণও জানত না সাহেব কখন বেরিয়ে গেছে। সত্যিই সাহেব বেরিয়ে গেছে কিনা দেখতে গেল দফতরের দিকে। হরিচরণও গিয়ে দেখলে সত্যিই সাহেবের ঘর ফাঁকা। সাহেব কখন বেরিয়ে গেছে তাকে বলেও যায়নি। হরিচরণও অবাক হয়ে গেল। কোথায় গেল সাহেব তা হলে? এমন তো হয় না। এমন তো না বলে সাহেব কখনও চলে যায় না।
দুর্গা এবার খেপে উঠল সাহেবের ওপর। হাতের কাছে সাহেবকে না পেয়ে যত তার রাগ হরিচরণের ওপর গিয়ে পড়ল। যেন সাহেব তাদের কোনও উপকারই করেনি। এতদিন সাহেব যে তাদের জন্যে নিজেদের দলের সাহেবদের সঙ্গে ঝগড়া করেছে, তাদের জন্যে এত টাকা খরচ করে বসিয়ে বসিয়ে খাইয়েছে, তাও যেন দুর্গার আর মনে পড়ল না। মুখে যা এল তাই বলে গালাগালি দিতে লাগল।
বললে–হারামজাদা সায়েব কি ভেবেছে আমাদের কিনে রেখে দিয়েছে? তুমি বলতে পারো না যে, আমরা তার কেনা বাঁদি নই?
হরিচরণ বললে–তুমি ওকথা বলছ কেন দিদি? কেউ কি তোমাকে বলেছে তোমরা কেনা বাঁদি?
বলব না? হাজার বার বলব। কেন তোমাদের সায়েব আমাদের এখানে আটকে রাখে শুনি? আমরা কিছু বলিনে বলে? লড়াইফড়াই সব চুকেবুকে গেল, এখনও কেন ছুতো করে আমাদের আটকে রেখেছে এখেনে? আমরা আজই চলে যাব, চলো, এখনই আমাদের নিয়ে চলো–
বলে তরতর করে উঠোন পেরিয়ে একেবারে অন্দরমহলে চলে গেল। ছোট বউরানিও দুর্গার গলার আওয়াজ পেয়ে এদিকে আসছিল।
বললে–কী হল রে দুগ্যা?
দুর্গা বললে–দেখো না, আমাদের এখেনে আটকে রেখে সাহেব গেল আড্ডা মারতে। চলো, এখুনি আমরা চলে যাব এখান থেকে। আমাদের কি বাড়ি-ঘর-দোর নেই? আমাদের কি আপনার মানুষজন নেই? ওসায়েব ভেবেছে কী?
ছোট বউরানি বললে–কোথায় যাবি? কে নিয়ে যাবে?
যেখানে হোক যাব। জাহান্নমে যাব, চুলোয় যাব। যাবার কি জায়গার অভাব আছে নাকি? ভেবেছে আমি তোমাকে নিয়ে চলে যেতে পারিনে? নাও, কাপড়চোপড় গুছিয়ে নাও। আর এক দণ্ডও এখেনে থাকছিনে।
