তা ক’দিন ধরে কান্ত ছিল না মুর্শিদাবাদে। একটু বেলা হতেই উদ্ধব দাসকে রেখে সোজা মতিঝিলে চলে গেল।
ইব্রাহিম খাঁ কান্তকে দেখেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে।
কী খবর পুরকায়স্থমশাই!
ইব্রাহিম খাঁ বললে–তুমি আর আমাকে পুরকায়স্থমশাই বলে ডেকো না কান্তবাবু, আমার চাকরি চলে যাবে।
কিন্তু কে আর শুনতে পাচ্ছে আমার কথা! কেউ তো এখানে নেই!
পুরকায়স্থমশাই বললে–আজকাল সব ওলোটপালট হয়ে গেছে কান্তবাবু। সেসব দিন আর নেই। এখন আমার চাকরি থাকে কিনা সন্দেহ
আশ্চর্য! তুমি হিন্দু থেকে মুসলমান হলে, তবু তোমার চাকরি থাকবে না?
কান্ত অনেকবার ইব্রাহিম খাঁর কথাও ভেবেছে। বেচারি হয়তো মরেই যেত না-খেতে পেয়ে। তবু প্রাণটা টিকে আছে ধর্মের বিনিময়ে। যেন ধন চেয়ে প্রাণটা বড় হল তার কাছে। কিন্তু প্রাণটা বড় নয়ই বা কেন? দুটো খেতে পাওয়ার তাগিদেই তো কান্ত একদিন চাকরি নিয়েছিল বেভারিজ সাহেবের সোরার গদিতে। সেখান থেকে চাকরি যাওয়ায় ওই পেটের তাগিদেই চাকরি নিতে হয়েছিল নিজামত কাছারিতে। আর তারপর কোথা থেকে কেমন করে জড়িয়ে গেল মরালীর সঙ্গে। মরালীর জীবনের সঙ্গে একবার জড়িয়ে যাবার পর আর তার কোথাও গতি হবে না, কোথাও তার শান্তি হবে না। সে একেবারে একাত্ম হয়ে গেছে এখানে, এই মরিয়ম বেগমের সঙ্গে।
ওপরে উঠতে গিয়ে নেয়ামতের সঙ্গে দেখা।
নেয়ামত বললে–মরিয়ম বেগমসাহেবা এখানে তো নেই হুজুর
এখানে নেই তো কোথায় গেলেন তিনি?
তা জানিনে, আপনি চেহেল্-সুতুনে গিয়ে খোঁজ নিন!
কান্ত বললে–কিন্তু, নজর মহম্মদ যে বললে–চেহে-সুতুনে নেই।
চেহেল-সুতুনে থাকবেন না তো কোথায় আবার যাবেন হুজুর! নিশ্চয় চেহেল-সুতুনে আছেন। ভোররাত্তিরে তো রোজ চলে যান চেহেল্-সুতুনে, আজও চলে গেলেন।
আশ্চর্য। সত্যিই আশ্চর্য হয়ে গেল কান্ত। কোথায় গেল মরালী! কোথায়ই বা যেতে পারে? আর গেলে তো তাঞ্জামে করেই যাবে। একলা তো আর রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে যেতে পারবে না।
মতিঝিল থেকে চকবাজারের রাস্তায় পড়তেই দেখল মহিমাপুরের দিক থেকে একটা তাঞ্জাম আসছে। একী, মরালী শেষরাত্রে মহিমাপুরে কোথায় গিয়েছিল? জগৎশেঠজির বাড়িতে নাকি? তাঞ্জামটা কাছে আসতেই ভাল করে চেয়ে দেখলে কান্ত। ঝালরদার তাঞ্জাম। চারদিক ঢাকা। তাঞ্জামের ভেতরে কে আছে বোঝা যায় না।
হঠাৎ পেছন থেকে একটা হাত গায়ে পড়তেই কান্ত মুখ ফিরিয়ে দেখলে, বশির মিঞা।
কী রে, তুই? তুই অ্যাদ্দিন কোথায় ছিলি?
বশির মিঞা সে-কথার উত্তর না দিয়ে বললে–কী দেখছিস? ভেতরে মরিয়ম বিবি!
কান্ত জিজ্ঞেস করলে–তুই কী করে জানলি?
বশির মিঞা বললে–তুই তো বেগমসাহেবাকে একেবারে হাতের মুঠোয় করে ফেলেছিস,কী করে এমন করলি রে?
কান্ত বললে–সে কথা থাক, বেগমসাহেবা মহিমাপুরে কোথায় গিয়েছিল রে?
আবার কোথায়, জগৎশেঠজির কোঠিতে! শালা দুশমনি শুরু হয়েছে, তাই খবর আনতে গিয়েছিল শায়েদ।
কার সঙ্গে কার দুশমনি?
বশির মিঞা বললে–সে তোকে এখন বলব না। তুই তো মরিয়ম বেগমসাহেবার লোক। তোকে আমি মোকরি দিলাম নিজামতে, আর তুই কিনা নবাবের লোক হয়ে গেলি! এখন তুই কিনা আমার সঙ্গে দুশমনি করিস?
আমি তোর সঙ্গে দুশমনি করি? কী বলছিস তুই?
দুশমনি না করলে মরিয়ম বেগমসাহেবা কেন জাসুসি করছে আমাদের ওপর? বেগমসাহেবা কি মনে করেছে আমাদের সঙ্গে পারবে? আমাদের দলে কে কে আছে জানিস?
কে কে?
সবাই আছে, মনসুর আলি মেহের সাহেব, মিরজাফর খাঁ সাহেব, উমিচাঁদসাহেব, হুগলির ফৌজদারসাহেব, জগৎশেঠজি, সবাই আছে। তুই কি আমাদের সঙ্গে দুশমনি করে পারবি ভেবেছিস? তোর মরিয়ম বেগমসাহেবা পারবে?
তাঞ্জামটা ততক্ষণে চেহেল্-সুতুনের দিকে চলে গেছে। কান্ত সেই দিকে চেয়ে দেখেই বললে–আমি যাই ভাই, আমার খুব জরুরি কাজ আছে, তোর সঙ্গে পরে দেখা করব
বলে কান্ত চলে গেল।
বশির মিঞাও আর দাঁড়াল না। শালা কাফেরটা বেইমান! দাঁড়াও, আমিও জানি বেইমানির জবাব কী করে দিতে হয়। বলে সোজা আবার মোহরার মনসুর আলি মেহের সাহেবের হাবেলির দিকে চলতে লাগল।
*
সেরাত্রে সত্যিই মরিয়ম বেগমসাহেবার বড় ভয় হয়েছিল। একেবারে বাঘের ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল সে। কোথায় জগৎশেঠজির বাড়ি তাও জানত না। সে বাড়ির ভেতরেও কখনও ঢোকেনি, তবু যেন কোথা থেকে বুক-জোড়া সাহস এসে তার বিচারবুদ্ধি সব একেবারে কানা করে দিয়েছিল।
জগৎশেঠজি ঘরের ভেতরে আসতেই উমিচাঁদ জিজ্ঞেস করলে–কে? কে এসেছে জগৎশেঠজি, কে?
ওয়াটস্ সাহেব কী একটা সন্দেহ করেছিল। তাড়াতাড়ি কাগজপত্র সব গুটিয়ে লুকিয়ে ফেলেছিল।
জিজ্ঞেস করেছিল–হু? হু ইজ ইট? কে এসেছে?
জগৎশেঠ বললেন–চুপ, আস্তে কথা বলুন, মরিয়ম বেগমসাহেবা–
উমিচাঁদ ওয়াটস দু’জনেই চমকে উঠল। বললে–এখানে কী করতে?
জগৎশেঠজি বললেন–না, আপনাদের ভয় পাবার দরকার নেই, চেহেল্-সুতুন থেকে মরিয়ম বেগমসাহেবা পালিয়ে এসেছে
পালিয়ে এসেছে মানে?
পালিয়ে এসেছে মানে, আমাকে বলছে ওর হিন্দু স্বামীর কাছে পাঠিয়ে দিতে।
উমিচাঁদ বললে–সত্যি?
হ্যাঁ, পিঠের দাগ দেখালে আমাকে। বললে–চেহেল্-সুতুনে নাকি লোহার শিক পুড়িয়ে ওর পিঠে সেঁকা দিয়েছে, তাই দেখাচ্ছিল।
আপনি পিঠ দেখলেন? পেশোয়াজ খুলেছিল আপনার সামনে?
