মরালী বললে–আপনি আমার সব করতে পারেন জগৎশেঠজি! আমি এতকাল আছি। চেহেল্-সুতুনে, আমি কেবল ভাবছি কী করে পালাব সেখান থেকে। কতদিন নবাব আমাকে নিয়ে তার পাশে শুতে চেয়েছে, আমি তাকে আরক খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে পালিয়ে গিয়েছি–
আরক? কীসের আরক?
মরালী বললে–চকবাজারে সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকান আছে, সে লুকিয়ে লুকিয়ে বেগমদের জন্যে আরক বিক্রি করে। আমি তাই খাওয়াই নবাবকে। এক-একদিন ভেবেছি নবাবকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলব, কিন্তু নেয়ামতের জন্যে তা পারিনি।
নেয়ামত? নেয়ামত কে?
মতিঝিলের খিদমদগার। সে কড়া নজর রাখে। মতিঝিলে নেয়ামত আর চেহেল্-সুতুনেনানিবেগম।
জগৎশেঠজি বললেন–লোকে যে বলে মুর্শিদাবাদের মসনদ চালাচ্ছ তুমি। সেকথা কি তা হলে মিথ্যে?
তবে দেখবেন?
বলে মরালী পট করে নিজের পেশোয়জ খুলে ফেললে। কঁচুলির আধখানা বার হতেই জগৎশেঠজি বললেন–কী দেখাচ্ছ?
না দেখালে আপনি বিশ্বাস করবেন না, ওরা আমাকে লোহার শিক পুড়িয়ে কী করে সেঁকা দিয়েছে–
জগৎশেঠজি বললেন–আমি বিশ্বাস করেছি, থাক—
কিন্তু আমি আর ফিরে যাব না জগৎশেঠজি ওখানে। আপনি আমাকে এখানে লুকিয়ে রাখুন। যেমন করে থোক আমাকে হাতিয়াগড়ে পাঠিয়ে দিন! আপনি এত বড় মানী লোক, আপনি একজন অবলা মেয়েমানুষকে বাঁচাতে পারবেন না, তার ইজ্জত রক্ষে করতে…
কথা বলতে বলতে মরালী হঠাৎ থেমে গেল।
বললে–পাশের ঘরে কাদের গলা শুনছি, ওখানে কেউ আছে নাকি?
হ্যাঁ!
মরালী চমকে উঠল।
তা হলে কী হবে? আমার কথা তো ওরা শুনতে পেয়েছে? কে ওরা?
জগৎশেঠজি বললেন–না, ওরা আমারই দলের। উমিচাঁদ আর ওয়াটস। তোমার কোনও ভয় নেই। তুমি এখানে বোস, আমি ও-ঘরে একটু যাচ্ছি, ভেবে দেখি আমি তোমার কী করতে পারি
বলে জগৎশেঠজি পাশের ঘরে চলে গেলেন।
বশির মিঞা যা ভেবেছে তাই। ফুপার বাড়ি থেকে বেরিয়ে মনসবদার সাহেবের বাড়িতে গিয়েছিল। সেখানে গিয়ে শুনলে তাঞ্জামটা সেখানে গিয়েছিল কিন্তু ফিরে চলে গিয়েছে। তারপর মহিমাপুরে আসতেই দেখলে, জগৎশেঠজির বাড়ির ফটকে তাঞ্জামটা রয়েছে।
ভাগ শালা, কুত্তিকা বাচ্চা কাহিকা, ভাগ হিয়াসে।
বশির মিঞা বললে–একটা বিড়ি দাও না মিাসাহেব, অত চটছ কেন? আমি কী করেছি?
এবার ভিখু শেখ বন্দুকটা নিয়ে তাক করে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। বশির মিঞা তাড়াতাড়ি দূরে একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে রইল।
শালা, কুত্তিকা বাচ্চা, উল্ল কা পাঠঠা!
পাঠান ভিখু শেখ ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে রাগে আপন মনেই গজগজ করতে লাগল।
*
ভোরবেলা সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকানের পেছন দিকে কান্ত এসে ডাকলে–বাদশা, ও বাদশা
সারাফত আলির মতন বাদশার ঘুমও বড় গাঢ়। এক ডাকে ঘুম ভাঙে না। অনেক ডাকাডাকিতে তবে উঠল। ভেতর থেকে বললে–কে?
আমি কান্তবাবু, দরজা খোলো।
বাদশা দরজাটা খুলে দিলে। কান্তবাবুর পাশে আর একজনকে দেখে জিজ্ঞেস করলে–এ কৌন হ্যায়?
এর নাম উদ্ধব দাস গো। যার গান রাস্তার ভিখিরিরা গায়। সেই উদ্ধব দাস। সেই যে আমি রব না ভব-ভবনে
উদ্ধব দাস বললে–আমার আর একটা নাম আছে, ভক্ত হরিদাস–
তারপর কান্তর দিকে ফিরে বললে–এইখানেই থাকো বুঝি তুমি? বেশ ঘর পেয়েছ তো! বেশ ঘর। এর নাম বাদশা? বাদশাই বটেক তুমি। দিল্লির বাদশা না দুনিয়ার বাদশা, কী তুমি?
উদ্ধব দাস তখন যেন বেশ মজা পেয়েছে। বাদশা অবাক হয়ে গেল। বললে–ইনি কে কান্তবাবু? কাকে ধরে নিয়ে এলে?
উদ্ধব দাস বললে–আমি হরির দাস গো—
হরি কে?
আরে, এ যে হরিকেই চেনে না দেখছি! হরির নাম শোনোনি তুমি? তবে শোনোতবে শোনো তার কথা–
বলে উদ্ধব দাস গাইতে শুরু দিলে–
হরির নামে যায় না দুঃখ
কার এমন দুর্ভাগ্য!
কান কাটিলে করে না রাগ
কার এমন বৈরাগ্য ॥
কার এমন সামগ্রী আছে
দামোদরের ক্ষুধা হরে।
কার এমন ওষধি আছে।
ব্রহ্মশাপে মুক্ত করে ।
শ্যামের বাঁশির নিন্দা করে।
কার এমন সুরব।
দেহ-ধারণে দুঃখ পায় না।
কার এত গৌরব।
সুমেরুকে ক্ষুদ্র করে
কার বা এমন বুদ্ধি।
ব্রহ্ম নিরূপণ করে
কার বা এত সাধ্যি।
গর্ভের কথা মনে পড়ে
কার বা এমন মন।
কার বা হেন শক্তি।
খণ্ডে কপালের লিখন ॥
বাদশা অতশত বোঝে না। লোকটার হঠাৎ গান গেয়ে ওঠা দেখে থতমত খেয়ে গিয়েছিল। কান্তই থামিয়ে দিলে। বললে–তুমি থামো, এমন যখন-তখন গান গাইলে লোকে ভাববে কী বললো তো
বলে টানতে টানতে নিজের ঘরখানার ভেতরে নিয়ে এল।
তারপর বললে–যাকে-তাকে কেন অমন করে গান শোনাও বলো তো দাসমশাই? সবাই কি তোমার মর্ম বুঝবে? তোমার মর্ম বুঝতে পারে নবাব। নবাবের কাছে গান শোনালে তুমি বাহবা পাবে!
উদ্ধব দাস হাসতে লাগল কথাটা শুনে।
বললে–না গো, আমি নবাবের বাহবা চাইনে, নবাব তো দু’দিনের, নবাবের বাহবাও দু’দিনের। আমি চাষাভুষোর বাহবা চাই
উদ্ধব দাসের সেই কথাটা কান্তর বহুদিন মনে ছিল। উদ্ধব দাস হয়তো চেয়েছিল একদিন সে রামপ্রসাদ হবে। রামপ্রসাদের মতোই তার গান চাষাভুষো সবাই গাইবে। হয়েছিলও তাই। উদ্ধব দাস সারা মুলুক ঘুরে ঘুরে বেড়াত পুঁথি বগলে করে, আর যেখানে-সেখানে গান গাইত। সেই গান মুলুকের লোকের মুখে মুখে ফিরত। লোকে বলত–উদ্ধব দাসের গান। উদ্ধব দাসের গান হলেই লোকে নড়েচড়ে বসত। মন দিয়ে শুনত। বলত–উদ্ধব দাসের গান আর একটা গাও
