বললে–রাগ করছ কেন মিঞাসাহেব? রাগের বাত আমি বলেছি?
বেশ করব রাগ করব, তোর বাপের কী?
বশির মিঞা তবু হাসতে লাগল। বললে–আমার বাপকে গালাগালি দিচ্ছ মিসাহেব, কিন্তু আমার বাপ কবে মরে ভূত হয়ে গেছে–শালা বাপও মরেছে আমার, আমাকেও পথে বসিয়ে গিয়েছে–
ভাগ, ভাগ এখান থেকে ভাগ তুই!
বশির মিঞা ভেতরে চেয়ে দেখলে মতিঝিলের ঝুল বারান্দার নীচে বেগমসাহেবার তাঞ্জাম নেই। তবে কোথায় গেল? চলে গেল? কিন্তু চেহেল সুতুনে যাবার তো আর কোনও রাস্তা নেই।
সেই রাত্রেই হাঁটতে হাঁটতে একেবারে ফুপার বাড়িতে গেল।
ডাকলে-ফুপাজি, ফুপাজি–
মোহরার মনসুর আলি মেহের সাহেব প্রথম রাত্রে ঘুমোয় না। দফতরের পর যেতে হয় মেহেদি নেসার সাহেবের বাড়িতে। সেখানে গিয়ে নোকরির খাতিরে একটু তদবির করতে হয়। মেহেদি নেসার। সাহেব বাড়িতে না থাকলেও তার গদি ফরাশে একটু বসতে হয়। পান-তামাক খেতে হয়। সাহেব। বাড়িতে থাকলে আরও বেশিক্ষণ জি হ’ বলতে হয় সব কথায়। তারপর পাঁচ বিবি মনসুর আলি সাহেবের আজ এর সঙ্গে শুলে, কাল ওর সঙ্গে শুতে হবে। বিবিদের মর্জি-মেজাজ বজায় রেখে তখন সরাবে চুমুক দিয়ে গড়গড়া টানতে টানতে বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতে ঘুম আসতে মাঝরাত পুইয়ে যায়।
বশির মিঞার ডাক শুনে কাঁচা ঘুম ভেঙে গেল মোহরার সাহেবের।
শালা, শুয়ারকা বাচ্ছা কহিকা চিল্লাচ্ছিস কেন?
ফুপাজি, তাঞ্জাম তো মিলল না!
কার তাঞ্জাম? কোন হারামজাদির তাঞ্জাম?
ঘুমের ঘোরে সব ভুলে গিয়েছিল মোহরার সাহেব।
তারপর ভাল করে জ্ঞান হতে আরও রেগে গেল। বললে–বেত্তমিজ, বেওকুফ, বেআদব কাহিকা, তাঞ্জাম মিলল না তার আমি কী জানি? খুঁজে দেখ কোথায় গেল! তাঞ্জাম কি আসমানে উড়ে যাবে? মুর্শিদাবাদ শহর খুঁজে দেখ! দেখতে না পেলে তোর নোকরি খতম করে দেব বেল্লিক কহিকা
এর পর আর সাহস হয়নি বশির মিঞার। ফুপার তাড়া খেয়ে আবার দেখতে বেরোল।
জগৎশেঠজির দরবার-ঘরের ভেতরে তখন মিরজাফর সাহেবের সন্ধিপত্র পড়া হচ্ছে। ৪৯০
জগৎশেঠজি বললেন–তারপর?
উমিচাঁদ সাহেব পড়তে লাগল কলিকাতার ইংরেজ অধিবাসীদের যে সমস্ত দ্রব্যাদি লুণ্ঠিত হইয়াছে তাহার ক্ষতিপূরণের জন্য পঞ্চাশ লক্ষ টাকা দিতে স্বীকার করিতেছি এবং দেশীয়গণের লুষ্ঠিত দ্রব্যের ক্ষতিপূরণের জন্য কুড়ি লক্ষটাকা…
হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল।
জগৎশেঠজি নিজেই উঠে দরজা খুলে দিলেন। এসব সময়ে বাইরের লোকদের ঘরে ঢুকতে দেওয়া উচিত নয়।
সামনেই দাঁড়িয়ে ভিখু শেখ।
একটা তাঞ্জাম এসেছে হুজুর।
এত রাত্তিরে কার তাঞ্জাম?
হুজুর, এক জেনানা?
জেনানা! জগৎশেঠজি অবাক হয়ে গেলেন। একটু কৌতূহলও হল। এত রাত্রে কে জেনানা তার বাড়িতে আসবে! দরজাটা বন্ধ করে দরবার-ঘরের পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। প্রথমটা বুঝতে পারেননি। বোরখা-পরা চেহারা দেখে আরও অবাক হয়ে গিয়েছিলেন।
জিজ্ঞেস করলেন–কৌন হ্যায় আপ?
বোরখা-পরা মূর্তিটা সামনে এগিয়ে এল। তারপর চারদিক ভাল করে পরীক্ষা করে নিয়ে মুখখানা বার করলে। তবু চিনতে পারলেন না জগৎশেঠজি। তখন মেয়েটি বোরখা খুলে ফেলে বললে–আমাকে আপনি চিনতে পারবেন না জগৎশেঠজি! আমিও আপনার মতো হিন্দু। আমি হিন্দু মেয়ে। আমি হাতিয়াগড়ের রাজার দ্বিতীয় পক্ষের বউ
সত্যিই অবাক হয়ে গেছেন জগৎশেঠজি!
আমাকে এখানে চেহেল্-সুতুনে সবাই মরিয়ম বেগম বলে ডাকে। কিন্তু আসলে আমার নাম অন্য। আমি খুব বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি জগৎশেঠজি। আমাকে আপনি বাঁচান!
বোসো বোসো, আমি শুনেছি তোমার কথা। তোমার কী বিপদ?
জগৎশেঠজি নিজে বসলেন। কিন্তু মরালী বসল না।
মরালী বললে–সে অনেক দুঃখের জীবন আমার। সব কথা বলতেই আপনার কাছে এসেছি। আমার সংসার ছিল, আমার সব ছিল। আপনাদের এই নবাব একদিন আমাকে জোর করে এনে নিজের হারেমে পুরেছে।
জগৎশেঠজি বললেন আমি শুনেছি; তোমার স্বামী একদিন এসে আমাকে সব বলে গেছেন।
আমি ক’দিন থেকে আপনার এখানে আসব বলে ভাবছি। ইয়ার লুফ খাঁ সাহেবের বাড়িতেও যাব ভেবেছিলাম, কিন্তু সেখানে গিয়েও যেতে পারিনি। রোজ রাত্তিরে বেরোই, আপনার পাঠান পাহারাদার দেখে ভয় করে। কিন্তু আজ আর থাকতে পারলাম না। সাহস করে ঢুকে পড়লাম।
জগৎশেঠজি বললেন, তুমি তো কলকাতায় ক্লাইভসাহেবের কাছেও গিয়েছিলে?
মরালী বললে–যখন যার কাছে সুবিধে পাচ্ছি তার কাছেই যাচ্ছি–কী করব বলুন! আমি মেয়েমানুষ আমার কতটুকু ক্ষমতা?
শুনেছিলাম ক্লাইভসাহেবের দফতর থেকে তুমি নাকি কী একটা চিঠি চুরি করেছিলে?
আমি? চুরি করব? ক্লাইভসাহেবের দফতর থেকে চিঠি চুরি করব? কীসের চিঠি? কী জন্যে চুরি করব? ক্লাইভসাহেব আমার কী ক্ষতি করেছেন?
কথা বলতে বলে মরালীর চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়তে লাগল।
জগৎশেঠজি বললেন–কেঁদো না বলো, তুমি কী বলছিলে, বলো
হয়তো আমার কপালে আরও অনেক দুঃখ আছে, নইলে আপনার মতো লোক আমাকে অবিশ্বাস করবে কেন? এতকাল ধরে আমি কেবল চেষ্টা করছি কেমন করে আমি নবাবের প্রতিশোধ নেব, আর আমার নামের এই কলঙ্ক! আমার স্বামীর কানে এসব কথা গেলে তিনি কী ভাববেন বলুন তো? নিশ্চয় আমার কোনও শত্রু এমন কথা বলেছে আপনাকে।
জগৎশেঠজি বললেন–তা হতে পারে। কিন্তু আমি তোমার কী করতে পারি।
