সিং-দরজার সামনেই মাধব ঢালি পাহারা দেয়।
উদ্ধব দাসকে নিয়ে হরিপদ আর শোভারাম সেখানে এসে দাঁড়াতেই অবাক হয়ে গেল। নবাবের ফৌজি সেপাই দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। আর মাধব ঢালির সঙ্গে কী যেন কথা বলছে।
কী হল? এখানে কী?
কথাটা জিজ্ঞেস করেই কিন্তু হরিপদ শিউরে উঠেছে। ছোটমশাইকে খুঁজতে এসেছে ফৌজি সেপাই।
মাধব ঢালি বললে–ছোটমশাই তো এখন শুয়ে পড়েছেন হুজুর
তা নায়েব, নায়েব কোথায়? হাতিয়াগড়ের নায়েব-নাজিম?
আজ্ঞে হুজুর, নায়েবমশাই তো বাড়িতে আছেন।
কোথায় তার বাড়ি?
কাছারি বাড়ির পাশে। ওই দিকে, ওই দিকে সোজা নাক বরাবর চলে যান হুজুর।
ফৌজি সেপাই দুটো আর বাক্যব্যয় না করে সোজা সেই দিকে চলে গেল।
হরিপদর এতক্ষণে সাহস হল। জিজ্ঞেস করলে সেপাই এসছিল কেন গো মাধব?
মাধব ঢালি ডাকাতি করত এককালে। বড়মশাই যাবার আগে ওকে এই পাহারাদারির চাকরি দিয়ে গিয়েছিলেন। বললে–পরোয়ানা আছে বোধহয়
কীসের পরোয়ানা?
নবাব-নিজামতের পরোয়ানা, আবার কার?
তা বলে এত রাত্তিরে?
শোভারাম বাধা দিয়ে বললে–ওসব নবাবি ব্যাপারের কথা এখন থাক হরিপদ, ওদিকে সময় বয়ে যাচ্ছে, তুই চল
বিয়েবাড়ির ভেতরে তখনও গোলমাল চলছে। যারা খেতে বসেছে, তারা তখনও কিছু টের পায়নি। সিদ্ধান্তবারিধি মশাই একবার ঘরের মধ্যে এসেছিলেন। কনে দেখে বলেছিলেন বেশ হয়েছে। শোভারাম, তোর মেয়ে সুখে থাক, সতীলক্ষ্মী হয়ে স্বামীর সংসার আলো করে থাকুক।
শোভারাম বলেছিল–সবই ছোটমশাইয়ের দয়াতে হল ঠাকুরমশাই।
শেষকালে একবার সিদ্ধান্তবারিধি মশাই মরালীর মাথায় হাত দিয়ে কী সব শ্লোক বলে আশীর্বাদ করে গিয়েছিলেন। আয়োজনের ত্রুটি কিছুই হয়নি। বড় বড় কলাপাতা এসেছিল ছোটমশাইয়ের বাগান থেকে। হরিপদ মাছ এনে দিয়েছিল ছোটমশাইয়ের পুকুর থেকে। নয়ানপিসি রাঁধতে বসেছে সকাল থেকে। একা মানুষ। পাড়ার সকলেরই পিসি। কাজেকর্মে শূদ্রদের বাড়ি রাঁধবার সময় তার ডাক পড়বেই। আর শুধু কি রান্না! কনে সাজানো, জামাইষষ্ঠীর তত্ত্ব সাজানো সবই তার কাজ।
নয়ানপিসি বলে গিয়েছিল চুপ করে বসে থাক মেয়ে, আমি অম্বলটা সাঁতলে আসি—
পাড়ার মেয়েরা তখন পাশেই বসে ছিল। মরালীর জানাশোনা সব মেয়েদেরই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। অনন্তদিদি বলেছিল–বর কী দ্রব্য তা আর জীবনে জানতে পারলুম না
মরালী জিজ্ঞেস করেছিল বরের সঙ্গে প্রথমে কী কথা বলব অনন্তদিদি?
অনন্তদিদি বলেছিল আমার আবার বর, আমার আবার বিয়ে, সেই বিয়ের পর আর তো দেখিনি বরকে–
অনন্তবালার বিয়ে, সে-এক ঘটনা বটে। বর এল গ্রামে। সবাই করুণাময়ীর ঘাটে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অনন্তবালার বর দেখতে। বোশেখ মাসের সকাল। যে-যার ব্রত সেরে সকাল থেকে ঘাটে গিয়ে পৌঁছেছে। যখন বর এল, দেখা গেল কাঁধে পুঁটলি, হাতে খড়ম। নৌকো থেকে বর নামল।
অনন্তবালার বাবা জগদীশ বাঁড়ুজ্জেমশাই খাতির করে বরকে নামিয়ে নিতে গেলেন।
বর বললে–নৌকোর ভাড়াটা মিটিয়ে দিন
হন্তদন্ত হয়ে জগদীশ বাঁড়ুজ্জে বললেন–কত?
পাঁচ টাকা।
পাঁচা টাকা শুনেই চমকে গিয়েছেন বাঁড়ুজ্জেমশাই। কুলীন জামাইয়ের জন্যে গুনে চারশো টাকা আগাম দিতে হয়েছে, আবার পাঁচ টাকা তার ওপর। অথচ জামাইয়ের নিজেরই নৌকো।
বললেন–নৌকোভাড়াটা পরে দিলে হবে না বাবাজি?
বর বললে–পরে আর কখন দেবেন। আমি তো আজই চলে যাব পলাশপুরে, সেখানে আর একটি কন্যার পাণিগ্রহণ করে তারপর যাব ঘুষুটি। সেখানেও একটি কন্যা আছে। বোশেখ মাসে লগনসার বাজারে কি আমাদের কোথাও বেশি তিষ্ঠুবার সময় আছে?
সেই পাঁচ টাকাই শুধু নয়, আরও পঞ্চাশটি টাকা চাদরে বেঁধে দানের সামগ্রী ঘড়া থালা পিলসুজ সমস্ত কাঁধে তুলে নিয়ে উঠল নৌকোতে। নৌকো সারা দিনই ঘাটে দাঁড়িয়ে ছিল।
বাঁড়ুজ্জেমশাই বলেছিলেন–একটা রাত কন্যার সঙ্গে এক ঘরে বাস করলে হত না বাবাজি?
অনন্তবালার মা-ও ঘোমটার আড়াল থেকে বলেছিল–অনন্ত আমার বড় আদরের মেয়ে, আমার বড় সাধ ছিল জামাই-মেয়েকে একসঙ্গে দেখে চোখ জুড়োব, তা-ও হল না
বলে কাঁদতে লাগলেন তিনি।
বর বললে–থাকলে আরও হাজার টাকা দিতে হবে, এই আমার নিয়ম করে দিয়েছি
হাজার টাকা! হাজার টাকা দেবার মতো অবস্থা নয় বাঁড়ুজ্জেমশাইয়ের। সামান্য জমিজমা আর ক’ঘর বামুন কায়েত যজমান। তাদেরই ওপর ভরসা। হাজার টাকা তাকে খুঁড়ে ফেললেও আসবে না।
বললেন–এর পর যখন আসবে বাবাজি, তখন না-হয় ধারকর্জ করে যেমন করে তোক
বর বললে–তা তো বুঝতেই পারছি, কিন্তু নগদ-ছাড়া কাজ করব না ঠিক করেছি। বড় ঠকায় সবাই আজকাল। আর তা ছাড়া বোশেখ মাস পড়ে গেছে যে, বড় ক্ষেতি হয়ে যাবে, চারদিক থেকে ডাক আসছে, বয়েসও বাড়ছে, সব কন্যার পাণিগ্রহণ করে উঠতে পারিনে আজকাল
বলে নৌকোয় উঠে পড়েছিল বর। আর বাক্যব্যয় করেনি
বাঁড়ুজ্জেমশাই শেষপর্যন্ত জিজ্ঞেস করেছিলেন–তা হলে আবার কবে আসছ বাবাজি!
বর বলেছিল–পত্র দেবেন রাহা-খরচ দেবেন, সময় করে যদি আসতে পারি দেখব
অনন্তবালার পর নন্দরানি। দুই মেয়ে জগদীশ বাঁড়ুজ্জের, নন্দরানির কপালে বরই জোটেনি। নন্দরানিও এসেছিল মরালীর বিয়েতে। শেষপর্যন্ত নন্দরানির বিয়ে হয়েছিল কলাগাছের সঙ্গে। এয়োতির মতো মাথার সিঁথিতে সিঁদুর দিত। পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর বয়েস হয়েছে। তবু ছেলেমানুষের মতো বাসর জাগতে পারে। ফুলশয্যের রাত্রিতে বর কনের শোবার ঘরে আড়ি পাতে। পুকুরঘাটে গিয়ে পরের বর। নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করে। বর ঠকাতে নন্দরানির ডাক পড়ে সব বাড়িতে।
