তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে উঠল নানিবেগম। উঠে ডাকলে–পিরালি খাঁ
চেহেল্-সুতুনে এক বোধহয় পিরালি খাঁ’রই ঘুম নেই। সেই মুর্শিদকুলি খাঁ’র আমল থেকে সে জেগে আছে। জেগে জেগে সে এই চেহেল্-সুতুনের উত্থান আর পতন, অভ্যুত্থান আর অবনতি দেখে আসছে। সপ্তদশ শতাব্দী থেকে যে-অবক্ষয় শুরু হয়েছে তার নিঃশব্দ সাক্ষী বুঝি সে একলাই। সে মুর্শিদকুলি খা-কে দেখেছে, সুজাউদ্দিন খাঁ-কে দেখেছে, দেখেছে সরফরাজ খাঁ-কে, দেখেছে আলিবর্দি খাঁ-কে। এখন আবার দেখছে আর এক নবাবকে। এনবাব আবার ঘুমোতে ভালবাসে, এনবাব আবার কোরান পড়তেও ভালবাসে। এও এক তাজ্জব নবাব! এ দেখবার জন্যেও পিরালি খাঁ-কে এত বছর বেঁচে থাকতে হল।
নানিবেগমসাহেবার ডাক শুনেই হাজির হয়েছে সামনে।
কুর্নিশ করে বললে–বন্দেগি বেগমসাহেবা
হ্যাঁরে, মরিয়ম বিবি ফিরেছে?
জি নেহি!
নানিবেগমের মনটা ছটফট করতে লাগল। এত দেরি তো করে না মেয়ে কখনও। নবাবকে ঘুম পাড়িয়ে সোজা চলে আসে চেহেল্-সুতুনে। তবে কি মির্জা তাকে আটকে রেখেছে মতিঝিলে? তবে কি আবার মির্জার রাত্রে ঘুম আসেনি? তবে কি…
নানিবেগমসাহেবা আস্তে আস্তে গোসলখানার দিকে চলে গেল।
এইসব রাত্রেই কাশিমবাজার কুঠির দফতরে ওয়াটস সাহেব বসে বসে কনফিডেনশিয়াল ডেসপ্যাঁচ লেখে কলকাতার কাউন্সিলে। নিজামতের সব কনফিডেনশিয়াল খবর। কোথায় কে কে কনস্পিরেসিতে হেলপ করবে। জগৎশেঠ কোন দিকে হেলছে। ফ্রেঞ্চ কুঠির দিকে না ব্রিটিশ কুঠির দিকে। আর জগৎশেঠ যদি একবার আমাদের দিকে থাকে তো আর কাকে কেয়ার করব?
আর এইসব রাত্রেই জগৎশেঠজির বাড়িতে লুকিয়ে লুকিয়ে কুঠির মেসেঞ্জার আসে। এইসব রাত্রেই মহিমাপুরের বাজবাড়ির সদরে পাঠান ভিখু শেখ কড়া নজর রাখে বাইরের দিকে।
ছায়া দেখলেই ভিখু শেখ চিৎকার করে ওঠে–ভাগ শালা কুত্তাকে বাচ্চা
যেদিন উমিচাঁদ আসে সেদিন আরও কড়া নজর রাখবার হুকুম আসে মালিকের কাছ থেকে। সেদিন ভিখু শেখের তেজ দেখে কে!
ভাগো শালা ইধারসে!
পাঠান ভিখু শেখ সেদিন নিজের ক্ষমতার সিংহাসনে একেবারে খোদাতালাহ হয়ে বসে। সে জানে না কে উমিচাঁদ, কে ওয়াটস, কে-ই বা ইয়ার লুক্ত খাঁ। সে শুধু জানে হিন্দুস্থানের মালিক মহতাপচাঁদ জগৎশেঠ বাহাদুরকে। খোদাতালাহ মালিককে বাঁচিয়ে রাখলেই তবে বরাবর তার রুটি মিলবে।
জগৎশেঠজি দেখলেন। বললেন–দেখি
ওয়াটস্ সাহেব খখানা দেখালে৷ ইয়ার লুৎফ খাঁ লিখেছে–নবাব সিরাজউদ্দৌলা শীঘ্রই আহমদ শা আবদালিকে ঠেকাইবার জন্য আজিমাবাদে যাইতেছে। সেই কারণেই ইংরাজদের সঙ্গে তিনি এখন বন্ধুত্ব রাখিবার ভান করিতেছেন। আজিমাবাদ হইতে ফিরিয়া আসিয়াই ইংরাজদের হিন্দুস্থান হইতে তাড়াইয়া দিবার প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন। পাত্র-মিত্র আমির-ওমরাহ সকলেই নবাবকে অন্তরের সহিত ঘৃণা করে। একজন উপযুক্ত নেতা পাইলেই সকলেনবাবের বিরুদ্ধে যাইতে প্রস্তুত। নবাবের অনুপস্থিতি ইংরেজ পক্ষের মুর্শিদাবাদ আক্রমণের প্রকৃত সুযোগ আমাকে নবাব করিলে রায় দুর্লভরাম, জগৎশেঠ প্রভৃতি সকলেই যোগ দিবেন। লক্কাবাগ হইতে সৈন্যসামন্ত সরাইয়া আনিয়া নবাব আপনাদের বিশ্বাসভাজন হইতে চান। আসলে ইহা ধাপ্পাবাজি মাত্র। এই অবস্থায় আপনারা যা চান আমি তাহাই করিতে প্রস্তুত।
ওয়াটস্ জিজ্ঞেস করলে-মনসবদার সাহেব যা লিখেছে সব সত্যি?
জগৎশেঠজি বললেন–আর মিরজাফর সাহেব?
ওয়াটস্ সাহেব বললে–মিরজাফর সাহেব লিখে দেয়নি কিছু মুখে বলেছে
কী বলেছে?
পাশেই উমিচাঁদ সাহেব বসে ছিল। উমিচাঁদ সাহেব বললে–আমাকে লিখে দিয়েছেন মিরজাফরসাহেব। এই চিঠি আমার কাছে রয়েছে। আমি এই চিঠি নিয়ে নিজে কর্নেল ক্লাইভসাহেবের কাছে যাব–
জগৎশেঠজি জিজ্ঞেস করলেন–আমাকে দেখাতে আপত্তি আছে?
উমিচাঁদ সাহেব বললে–আপনাকে দেখাতে কী আপত্তি থাকবে জগৎশেঠজি! আপনি তো আমাদের দলে। এই শুনুন
বলে উমিচাঁদ সাহেব পড়তে লাগল:
ঈশ্বর এবং পয়গম্বরের নামে শপথ করিয়া প্রতিজ্ঞা করিতেছি; যতদিন আমি জীবিত থাকিব ততদিন এই সন্ধিপত্রের নিয়ম পালন করিব
(১) নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলার সহিত ইংরাজদের যে সন্ধিপত্র স্থিরীকৃত হইয়াছে তাহার সমস্ত শর্ত পালন করিতে আমি সম্মত।
(২) হিন্দুস্থানের বা ইয়োরাপের যে-কেহ ইংরাজদের শত্রু, সে আমারও শত্রু বলিয়া বিবেচনা করিব।
(৩) জিন্নেৎ-উল-বেলাৎ এই বঙ্গভূমিতে এবং বিহার ও উড়িষ্যার মধ্যে ফরাসিগণের যে সমস্ত কুঠি আছে তাহা ইংরাজদের অধিকারে আসিবে। ফরাসিদের আর এ-দেশে বাস করিতে দিব না।
.
বশির মিঞা অনেকক্ষণ ধরে চকবাজারের রাস্তায় বসে ছিল। টেনে টেনে চারটে বিড়ি শেষ করে ফেললে। তখনও মরিয়ম বেগমসাহেবার তাঞ্জামের দেখা নেই। আস্তে আস্তে আর একজন ইয়ারের কাছে গেল। বললে–তোরা দাঁড়া রে, আমি তালাস করে আসি
আবার গেল মতিঝিলের সদর ফটকে।
ফটক-পাহারাদার তখনও পাহারা দিচ্ছে। বশির মিঞা জিজ্ঞেস করলে কী মিঞাসাহেব, বেগমসাহেবার তাঞ্জাম এখনও বেরোয়নি?
পাহারাদার বললে–কেন, তোর এত বেগমসাহেবার খোঁজ কেন?
না, এমনি পুছছি, বেগমসাহেবা বুঝি আজকাল নবাবের সঙ্গেই শুচ্ছে মিঞাসাহেব?
মিঞাসাহেব রেগে গেল। বললে–নবাব যার সঙ্গে খুশি শোবে, তাতে তোর বাপের কী রে?
বশির মিঞা হো হো করে হেসে উঠল। রাগ করলে তো বশির মিঞার চলবে না। কাজ হাসিল করতে হবে।
