তখন থেকেই রাগটা ছিল মরালীর। নবাবদের কথা মনে পড়লেই একটা ছবি কেবল চোখের সামনে ভেসে উঠত। যখন সত্যি সত্যিই সেই নবাবি হারেমে আসা অবধারিত হল, তখনও মনে মনে খুব রাগ। হয়েছিল তার। লুকিয়ে লুকিয়ে পেট কাপড়ের তলায় একটা হাতিয়াগড়ের কামারের তৈরি ছুরি। এনেছিল সঙ্গে করে। ভেবেছিল তেমনই যদি কিছু ঘটে তো হয় নিজের বুকে বসাবে নয়তো নবাবের। কিন্তু হারেমের ভেতরে ঢুকে তাজ্জব হয়ে গেল। কই; এরা তো তাকে কিছু বলছে না। নানিবেগমকে দেখে আরও অবাক হয়ে গেল। ঠিক যেন নয়ানপিসির মতন। নবাবকেও একদিন দেখলে। কই, নবাব তো হারেমে আসে না। নবাব তো কই মদ খায় না!
তারপর যত দিন যেতে লাগল ততই অবাক অবাক ঘটনা ঘটতে লাগল। অতি সাধারণ একটি গ্রামের মেয়ের জীবনে এর চেয়ে বেশি আর কী ঘটতে পারে! একদিন বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়ি চলে গেলে এতদিন। হয়তো একটা ছেলেমেয়ে হয়ে যেত। রোজ রাত্রে শুতে হত স্বামীর সঙ্গে, আর চেঁকিশালে ধান ভেঙে সেই চাল রান্না করতে হত সংসারের জন্যে। সে উদ্ধব দাসের সংসার করলেও যা করত, ওই কান্তর সঙ্গে বিয়ে হলেও তাই-ই করতে হত। কোনও তফাত হত না।
উদ্ধব দাসকে নিয়ে ভাবনা ছিল না, কিন্তু ওর জন্যে কষ্ট হত। ওই কান্ত!
ও চুপ করে থাকে, কিছু বলে না, কিছু চায়ও না। যা হুকুম করে তাই-ই তামিল করতে পারলে যেন কৃতার্থ হয়। তার জন্যেই কান্ত ছায়ার মতো নবাবের পাশে পাশে থেকেছে, তার জন্যেই কোথায় কোথায় ঘুরে মরছে। তার একটু ক্ষতি হলে ও যেন ভয়ে কেঁপে ওঠে।
ও বলে–তোমাকে সবাই খুন করবার মতলব করছে মরালী
যেন মরালী খুন হয়ে গেলে কান্তর সর্বনাশটাই সবচেয়ে বেশি।
ইয়ার লুৎফ খাঁ সাহেবের বাড়ির দিকে যেতে যেতে সেই কথাটাই বারবার মনে পড়েছিল। পালকি বেহারারা জানে কোন দিকে কোন বাড়িটা মনসবদার সাহেবের। রাত তখন অনেক। সমস্ত মুর্শিদাবাদ শহরটা ঘুমিয়ে পড়েছে। আরও ওদিকে জগৎশেঠজির বাড়ি। মরালী পালকির ফাঁক দিয়ে চেয়ে দেখলে বাইরের দিকে। ঝাঝা করছে অন্ধকার।
একটা বাড়ির সামনে এসে থামল তাঞ্জাম। থামতেই মরালী নিজের পেট কাপড়ের তলায় ছুরিটা সামলে নিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল। তারপর বোরখা দিয়ে সর্বাঙ্গ ঢেকে দিলে নিজেকে।
কিন্তু চকবাজারের রাস্তার একটা অন্ধকার কোণ বেছে নিয়ে বশির মিঞা চুপ করে বসে ছিল তখন। দূর থেকে রাস্তাটার যতদূর নজরে পড়ে চেয়ে চেয়ে দেখছিল। শাহিসড়কের নকশা সোজা সাদাসিধে। দিনেরবেলা যত ভিড়ই থাক, রাত্রে সে রাস্তায় নোক হাঁটে না। কোতোয়ালির পাহারাদাররা অন্য সময় পাহারা দেয় বটে, কিন্তু চারদিকে যখন সব শান্ত, কোথাও কোনও ঝামেলা নেই তখন একটু ঢিলে দেয়।
একবার মনে হয় যেন তাঞ্জামটা আসছে। অন্ধকারের মধ্যে ঝাপসা ছায়ার মতো চেহেল সুতুনের দিকে এগিয়ে আসছে। আবার মনে হয়, না, মনের ভুল।
একলা বশির মিঞার ওপর ভার নয়। খানিক দূরেই আরও চারজন লুকিয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে।
বশির মিঞা কখনও কাঁচা কাজ করে না।
বসে থাকতে থাকতে বশির মিঞার কোমর ব্যথা হয়ে গেল। পকেট থেকে একটা বিড়ি বার করে ধরালে। মুঠোর মধ্যে আগুনটা লুকিয়ে ধোঁয়া টানতে লাগল। শালার ঝকমারির কাজ এই জাসুসিগিরি। দিন নেই রাত নেই, কেবল ছায়ার পেছনে ঘোররা। হুকুম করতে তো কড়ি খরচ লাগে না। মোহরার মনসুর আলি মেহের সাহেব তো হুকুম করে দিয়ে আরামে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে এখন। যদি হুকুম হাসিল না হয় তো তখন বশির মিঞার ওপর তম্বি হবে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর রাতগুলো বড় বিশ্রী রাত। এইসব রাত্রের অন্ধকারেই সরীসৃপের মতো ষড়যন্ত্রীরা দিল্লি থেকে শুরু করে তামাম হিন্দুস্থানের অলিতে গলিতে চরতে বেরোত। কোথায় কে কার রাজ্য কেড়ে নেবে, কখন কে কার বিরুদ্ধে চর লাগিয়ে দেবে, কে একদিন নিঃশব্দে দুনিয়া থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে, তারই ফুসমন্তর আওড়ানো হত এইসব রাতগুলোতে। এমনি এক রাত্রেই হাতিয়াগড়ের রাজবাড়ি থেকে একদিন ঐশ্বর্য লক্ষ্মী নিরুদ্দেশের পথে যাত্রা করেছিল। এমনই এক রাত্রেই মরালী চেহেসতুনে এসে ভাগ্যলক্ষ্মীর পায়ে লাথি মেরেছিল। এমনই এক রাত্রেই ওয়াট ছদ্মবেশে এসে ঢুকেছিল দো-হাজারি মনসবদার ইয়ার লুৎফ খাঁ’র বাড়িতে।
সেদিন সমস্ত রাত ঘুম হয়নি নানিবেগমসাহেবার।
একবার চোখ দুটো বুজে এসেছে আর ধড়মড় করে জেগে উঠেছে।
অথচ কেউ নয়। চেহেল্-সুতুনের মধ্যে জেগে থাকলে অমন অনেক অদ্ভুত শব্দ শোনা যায়। কত পুরুষ ধরে কত খুনখারাপি চলে আসছে, কত নিঃশব্দ আত্মবিসর্জনের অর্তনাদ এখানকার কুঠুরির মধ্যে চাপা পড়ে আছে, রাত্রের অন্ধকারেই বুঝি সেই সব অদৃশ্য আত্মারা আবার কবর থেকে উঠে আসে। সেই আত্মারা বুঝি আবার ঘাগরা পরে, পেশোয়াজ পরে, কাঁচুলি পরে, আবার পায়ে ঘুঙুর বাঁধে, আবার আরক খায়, আবার হাসতে শুরু করে, কাঁদতে শুরু করে, নাচতে শুরু করে। আবার যেন গুলসন বেগমের মতো গাইতে শুরু করে–যো হোনেকা থি উও তো হো গয়ি, আব উসকি ক্যা পরোয়া’–
নানিবেগমসাহেবা এসব জানে। কিন্তু তবু সন্দেহ যায় না। মরিয়ম বেগম ফিরে এসেছে তো মতিঝিল থেকে? মসজিদে নমাজ পড়বার সময় হল নাকি? ভিস্তিখানায় পানি দেওয়া হয়েছে নাকি?
