জিজ্ঞেস করলে–তা হলে তোর চাকরি থাকবে?
থাকবে ভাই থাকবে। এবার আর ভয় নেই।
কিন্তু কী করে বুঝলি আবার লড়াই হবে? কে বললে–তোকে?
শশী বললে–আমি খবর পেয়েছি। সবাই ক্লাইভসাহেবের কাছে গিয়েছিল।
কে কে গিয়েছিল?
সবাই। আমি লক্কাবাগ থেকে ছুটি নিয়ে একদিন কালীঘাটের মন্দিরে গিয়েছিলাম। আমি গিয়ে মাকে ডালা দিলুম। বললুম–মা, যেন যুদ্ধ হয় মা, আমার চাকরি যেন যায় না মা।
কান্ত বললে–কিন্তু কে কে ক্লাইভ সাহেবের কাছে গিয়েছিল, তাই বল না?
কে কে আবার, সবাই। ইয়ার লুৎফ খাঁ, আমাদের মনসবদার সাহেব থেকে আরম্ভ করে, সব্বাই।
কিন্তু কেন গিয়েছিল?
শশী বললে–সকলেরই তো রাগ আছে বেগমসাহেবার ওপর।
কোন বেগমসাহেবা রে? নানিবেগমসাহেবা?
শশী বললে–আরে না। ওই যে হিন্দু বেগমসাহেবাটা। মরিয়ম বেগমসাহেবা। যে আমাদের হালসিবাগানে এসেছিল। তার ওপরই তো রাগ সকলের। ক্লাইভসাহেবেরও তো খুব রাগ। তুই জানিস না, ওই বেগমই তো ক্লাইভসাহেবের দফতরে ঢুকে উমিচাঁদের চিঠি চুরি করে নিয়েছিল। ওই বেগমসাহেবাই তো এখন সমস্ত মতলব দিচ্ছে নবাবকে। নবাবকে একেবারে হাতের মুঠোয় পুরে ফেলেছে
শশী আবার বললে–তুই কিছু শুনিসনি? সবাই যে জানে–
কথা বলতে বলতে কান্ত ফৌজের সঙ্গে অনেক দূর চলে এসেছিল। কিন্তু এবার ফিরল কান্ত। শশী যেন খুব খুশি হয়েছে মনে হল। যুদ্ধ হবার খবর শুনে এত আনন্দ! আশ্চর্য, মরালীর ওপর সকলের এত রাগ! অথচ মরালী তো সকলের ভালই চায়। মরালী তো চায় নবাব ভাল হোক, নবাব সকলের ভাল করুক। মরালীর কথা শুনেই তো নবাব বদলে গেছে। নবাব এখন রোজ কোরান পড়ে। নবাবকে রোজ মরালী মহাভারত পড়িয়ে শোনায়। কাকে বলে ভাল রাজা, কাছে বলে ভাল নবাব, কেমন করে প্রজা-পালন করতে হয়, সব তো নবাব মন দিয়ে শোনে। মরালীর কথাতেই তো উমিচাঁদ, নন্দকুমার, নবকৃষ্ণকে ছেড়ে দিলে নবাব। তবু সকলের এত রাগ! তা হলে কি সেই আগেকার মতো ব্যবহার করলেই ভাল হত!
কান্তর বুকটা দুরদূর করে কাঁপতে লাগল। যদি সত্যিই মরালীর কিছু হয়! কিছু বিপদ! তখন কান্ত কী করবে! কী করে মরালীকে বাঁচাবে? আর মরালীই যদি না বাঁচে তো কান্তরই বেঁচে থেকে লাভটা কী?
তখনও উদ্ধব দাস অঘোরে ঘুমোচ্ছে।
কান্ত ঠেলতে লাগল ও দাসমশাই, দাসমশাই, ওঠো ওঠো
উদ্ধব দাস উঠল। বললে–উঃ, এত শব্দ হচ্ছিল কীসের গো, একটু আরাম করে ঘুমোচ্ছিলাম, তাও ঘুমোতে দেবে না
কান্ত বললে–খেয়া নৌকো এসে গেছে, চলো—
উদ্ধব দাস অনিচ্ছের সঙ্গে উঠল। তারপর পুঁথিটা বগলে নিয়ে ঘাটের দিকে চলতে লাগল।
*
ইতিহাসের শিক্ষা বড় কঠোর শিক্ষা। সে-শিক্ষা যে গ্রহণ করতে পারে না সে অন্ধ। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করে দিয়েছে যে, ষড়যন্ত্র রাজনীতির ব্রহ্মাস্ত্র। তুমি আলেকজান্ডার হতে পারো, নেপোলিয়ন হতে পারো, কিংবা ক্রমওয়েল হতে পারো, কিন্তু সাম্রাজ্যস্থাপন করতে পারেনি বলে ইতিহাস তোমাদের নাম বড় গলা করে প্রচার করেনি। যদি সাম্রাজ্য রাখতে চাও কি সাম্রাজ্য সৃষ্টি করতে চাও তো ষড়যন্ত্রের ব্রহ্মাস্ত্র ব্যবহার করতে হবে। তোমরা তা পারোনি। নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলাও তা পারেনি। পেরেছে শুধু ফেট (ডভিডের কম্যান্ডার কর্নেল ক্লাইভ।
উদ্ধব দাস বলত–কলিই কলিকালের অধিষ্ঠাতৃ দেবতা–
লোকে জিজ্ঞেস করত–কেন?
উদ্ধব দাস ব্যাখ্যা করত তখন। ক্রোধের ঔরসে তার বোন হিংসার গর্ভে কলির জন্ম। কলিও নিজের বোন দুরুক্তিকে বিয়ে করল। দুটো সন্তান হল। ছেলেটার নাম ভয়, মেয়েটার নাম মৃত্যু। সেই ভয় আর মৃত্যু দিয়েই কলিকাল আরম্ভ হল।
নাদির শা যখন হিন্দুস্থানে হামলা করেছিল, তখন দিল্লির একটা মসজিদের ওপর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিরীহ মানুষের নিষ্ঠুর মৃত্যু দেখে সে আনন্দে উত্তেজনায় ফৌজের লোকদের বারবার। উৎসাহিত করেছিল। সে কাহিনী দিল্লি ছাড়িয়ে মানুষের মুখে মুখে সমস্ত জনপদে ছড়িয়ে গিয়েছিল। ভয় আর মৃত্যুর প্রতাপের যে-চিত্র সেদিন থেকে মানুষের মনে আঁকা ছিল তা তখনও মোছবার অবকাশ পায়নি। খেয়ে সুখ নেই, ঘুমিয়ে শান্তি নেই, কেবল ভয় হত ওই বুঝি মৃত্যু আসে
ছোটবেলায়, খুব ছোটবেলায় মরালী এসব শুনেছে। ঘুমোতে ঘুমোতে হঠাৎ নয়ানপিসি ডেকে দিয়েছে–ওরে ওঠ ওঠ–
ধড়মড় করে ঘুম থেকে উঠেছে সবাই। উঠে বড়মশাইদের রাজবাড়ির ভেতরে গিয়ে ঢুকেছে। শুধু তারা নয়, গ্রামসুদ্ধ লোক এসে জুটেছে সেখানে। অত লোক একখানা রাজবাড়িতে ধরবে কেন। অতিথিশালা, পূজার দালান, শিবের মন্দির, কাছারিবাড়ি সমস্ত গিসগিস করছে লোকে। ছাদের ওপর থেকে মাধব ঢালি কামান দাগত। বড়মশাই দোতলার ওপর উঠে সব দেখতেন। বাড়ির চারদিকের গড়ে জল ভরতি করা হত। তার চারদিকে আগুন লাগিয়ে দিতেন খড়ের গোয়ালে। সে-আগুন দেখে বর্গিরা হয়তো ভয় পেয়ে যেত। সকাল হলে যে-যার বাড়ি চলে যেত আবার।
এই-ই ছিল তখনকার হাতিয়াগড়ের জীবন। মরালী এ-সব দেখেছে। লোকে আলো না করত আটচালায়, চণ্ডীমণ্ডপে, পেঁকিশালে, বারোয়ারিতলায়। সেসব কথা শুনেছে মরালী! কখনও বলত মোগলদের তাড়িয়ে দিয়ে পাঠানরা আসছে, কখনও বলত পাঠানদের তাড়িয়ে দিয়ে বর্গিরা আসছে।
লোকে বলত-মুর্শিদাবাদের নবাব খালি হারেমে বসে বসে মদ খায় আর বেগমদের নিয়ে মহফিল করে–
