কান্ত বললে–আচ্ছা দাসমশাই, তোমার বউয়ের কথা তোমার মনে পড়ে?
উদ্ধব দাস চলতে চলতে অবাক হয়ে গেল কথাটা শুনে। বললে–বউকে নিয়ে একটা কাব্য লিখছি, তা জানো না?
কান্ত বললে–ওসব কথা থাক, তুমিও তো মানুষ, তোমারও তো রক্ত-মাংস আছে, রক্ত-মাংসের খিদে আছে, তুমি তো আর পাথর নও। বউয়ের জন্যে তোমার মনকেমন করে না বলতে চাও?
উদ্ধব দাস সজাগ হয়ে উঠল। বললে–তুমি যে এত কথা বলছ, তুমি বিয়ে করেছ?
কান্ত বললে–আমার বিয়ে হয়ে গেছে দাসমশাই
বিয়ে হয়ে গেছে? তা বউ কোথায়?
কান্ত বললে–আমার কথা থাক, তোমার কথা বলো। তোমার নিজের বউ কোথায় আছে, তা জানো তুমি?
উদ্ধব দাস বললে–আমার বউ তো ক্লাইভসাহেবের বাগানবাড়িতে
তোমার বউ সেখানে পড়ে থাকে কেন? তুমি জোর করে তাকে নিজের কাছে নিয়ে আসতে পারো না?
উদ্ধব দাস হাসল। বললে–তুমি বিয়ে করেছ আর এই কথাটা জানো না? হরি আর বউ দুজনেই একরকম। ডাকলে কেউই আসে না। কত লোক তো মন্দিরে গিয়ে গলা ফাটিয়ে হরিনাম করছে, কত লোক মসজিদে গিয়ে নমাজ পড়ছে, তাতে হরি আসছে? বলো না গো, চুপ করে রইলে কেন? হরি আসছে তাদের কাছে?
কান্ত বললে–তা হলে কী করলে হরি আসে?
উদ্ধব দাস বললে–হরিকে ডাকলে হরি আসে না। হরির নাম করে জীবন ভাসিয়ে দিতে হয়—
কী রকম?
উদ্ধব দাস বললে–তবে শোনো ভায়া একটা ছড়া বলি
বলে ছড়া আরম্ভ করতে যাচ্ছিল, কিন্তু কান্ত বাধা দিয়ে বললে–ছড়া বলতে হবে না, তোমার গান আর ছড়া এখন দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে গেছে। সবাই গায় তোমার গান। নবাবের কানেও গেছে। তাই তো নবাব তোমার গান শুনবে বলে ডেকে পাঠিয়েছে।
তা তুমি বুঝি নবাবের চাকরি করো?
কান্ত বললে–দেখো, নবাবকে যদি খুশি করতে পারো তো তুমি খেলাত পাবে, জায়গির পাবে, টাকা পাবে
উদ্ধব দাস বললে–সে-লোভ দেখাও গে তুমি রায়গুণাকরকে, নবাবের নামে পুঁথি লিখে দেবে! আমি পুঁথি লিখব আমার বউকে নিয়ে। আমার বউকে তুমি চেনো না। হাতিয়াগড়ের রাজাবাবু ছোটমশাইয়ের নফর শোভারাম বিশ্বাসের মেয়ে, খুব উঁদরেল মেয়ে। আমাকে পছন্দ হয়নি বলে রাগ করে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে।
তা যেবউ পালিয়ে গেছে, তাকে নিয়ে কী লিখবে?
উদ্ধব দাস বললে–সে বউ তো তোমাদের মতো বউ নয় গো। খুব উঁদরেল বউ। তোমাদের বউ কেবল রাঁধে বাড়ে আর ছেলে জন্ম দেয়। আর তো কিছু করে না। আর আমার বউ ঠিক আমার মতো বাউন্ডুলে। একবার এখানে যায়, একবার সেখানে। এখন গিয়ে ক্লাইভসাহেবের বাগানে উঠেছে। কিন্তু সেখানেও কি থাকবে ভেবেছ? সেখানেও থাকবার মেয়ে নয় সে। সেখান থেকেও পালাবে। এই আমি যেমন এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াই, সে-ও তেমনই।
দু’জনে রাস্তা দিয়ে চলছিল। মোল্লাহাটি থেকে বেরিয়েছে সেই কোন সকালে, তারপর আকাশের সূর্যটা একেবারে মাথার ওপর গিয়ে উঠেছে। খেয়াঘাটের কাছে আসতেই কান্ত বসল গাছতলায়। নৌকোটা তখন ওপারে। মাথার ওপর দিয়ে এতক্ষণ চড়া রোদ গিয়েছে। সামনের দিকে চেয়ে চেয়ে কেমন মাথাটা ঘুরে গেল কান্তর। কান্তর নিজের জীবনটাই যেন ঠিক এইরকম কেবল ঘোরাঘুরি করে কেটে গেল। কিন্তু এই উদ্ধব দাসও তো ঘুরে বেড়াচ্ছে সারাজীবন। এর তো ক্লান্তি লাগে না। পাশের দিকে চাইতেই দেখলে, উদ্ধব দাস সেই মাটির উপরেই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। হাতের পোঁটলাটা মাথায় দিয়েছে, আর নাক দিয়ে বড় বড় নিশ্বাস পড়ছে। ওপারের দিকে চেয়ে দেখলে কান্ত। নৌকোটা ওদিক থেকে ছেড়েছে।
হঠাৎ উত্তর দিকে যেন কীসের শব্দ শোনা গেল। কান্ত মাথাটা ফিরিয়ে দেখলে, অনেক দূরে যেন ধুলোর পাহাড় এগিয়ে আসছে সামনের দিকে। কালবোশেখি শুরু হল নাকি? এই তো কালবোশেখির সময়! তাড়াতাড়ি উদ্ধব দাসকে ডাকতে লাগল–দাসমশাই ওঠো, ওঠো, ঝড় আসছে, ওঠো
কিন্তু উদ্ধব দাসের ঘুম বড় কড়া।
কান্ত আবার চেয়ে দেখলে। না, ঝড়বৃষ্টি নয়, কিছু নয়। নবাবের ফৌজ আসছে। নবাবের ফৌজ তো লক্কাবাগে গিয়েছিল। হঠাৎ ফিরে আসছে কেন? হেরে গেল নাকি লড়াইতে!
ততক্ষণে ফৌজের দল কাছে এসে পড়েছে। সামনে হাতির দল। তারপর ঘোড়া। তারপর সেপাইরা কামান টানতে টানতে আসছে। বিরাট সব লম্বা মাপের কামান। কান্ত আড়াল থেকে দেখতে লাগল। এরা সবাই চেনে কান্তকে। এদের অনেকের সঙ্গে কান্ত হালসিবাগানে অনেক দিন একসঙ্গে কাটিয়েছে। ফৌজের দল দেখে আশেপাশের গ্রাম থেকে ছেলে-মেয়ে বুড়োবুড়ির দল খেয়াঘাটে এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের ভিড়ের মধ্যে কান্তকে অতটা কেউ লক্ষ করে দেখলে না। ফৌজের দল যখন সবই চলে গেছে, প্রায় শেষ হব হব, তখন হঠাৎ শশী দেখতে পেয়েছে তাকে।
কী রে, তুই? তুই আবার কবে ঢুকলি ফৌজে?
শশীর মালকোঁচা বাঁধা কাপড়। সে-ও বললে–তুই এখানে কী করছিস?
কান্ত বললে–আমি কাজে এসেছিলুম, কিন্তু তোরা ফিরে আসছিস কেন? লড়াইতে হেরে গেলি?
না, লড়াই হল না। নিজামত থেকে হুকুম এসেছে ফিরে যেতে
তা হলে লড়াই হবে না আর?
শশী একটু মুচকে হাসলে। কান্তকে কাছে ডাকলে। বললে–আয়, আমার কাছে আয় বলছি
তারপর কান্তর কানের কাছে মুখ এনে বললে–লড়াই হবে রে, খুব জবর লড়াই হবে ভেতরে ভেতরে সব ষড়যন্ত্র চলছে
কান্ত কী রকম অবাক হয়ে গেল। এই তো মুর্শিদাবাদে দেখে এল, নবাব বেশ চুপচাপ আছে। বেশ আরাম করে মতিঝিলে ঘুমোচ্ছে, এর মধ্যে হঠাৎ আবার কী হল?
