ক্লাইভ বললে–দেখছি, আপনাদের ইন্ডিয়াতে মহারাজা থেকে আরম্ভ করে পথের ভিখিরি পর্যন্ত সব্বাই ফিলজফার মহারাজা
এ আমাদের বোধহয় মাটির গুণ সায়েব।
ক্লাইভ বললে–ফিলজফারদের রাজনীতি করতে না-আসাই ভাল মহারাজ। ফিলজফারদের বিয়ে করাই উচিত নয়
মহারাজ বললেন–তা তো বটেই! সেই জন্যেই তো আমি আমার রাজসভায় সবরকম লোক পুষেছি। কেউ আমার পাঁজি লেখে, কেউ কুস্তি শেখায়, কেউ কাব্য লেখে, কেউ যুদ্ধ করে, কেউ আবার শুধু ভাড়ামি করে
সাহেব বললে–আমার এই বাগানের কুঠিতে একটা হিন্দু বউ আছে মহারাজা, তার হাজব্যান্ডটা ফিলজফার। সে বলে সমস্ত পৃথিবীটাই নাকি তার দেশ–সে পোয়েট, সে গান লেখে–
মহারাজ বললেন কিন্তু তাকে আপনি কেন রেখেছেন এখানে?
সাহেব বললে–কী করব? সে যে হাজব্যান্ডের কাছে যাবে না।
তা হলে কে আছে তার বাপের বাড়িতে? সেখানে পাঠিয়ে দিন।
সাহেব বললে–কী করে পাঠাব? আপনি তো জানেন নবাবকে। পাঠাতে গিয়ে যদি নবাবের স্পাইদের নজরে পড়ে যায়। মরিয়ম বেগমকে তো ওইভাবেই নবাব নিজের হারেমে নিয়ে গিয়ে তুলেছে।
এই তো, মরিয়ম বেগম তো এঁরই স্ত্রী সায়েব। এঁর কথা বলতেই তো আপনার কাছে এসেছি।
ক্লাইভ বললে–আমি জানি। জানেন, আপনার ওয়াইফ খুব ক্লেভার লেডি!
ছোটমশাই বললে–চালাক? কিন্তু তেমন চালাক তো নয়।
না না, ভেরি ক্লেভার।
কিন্তু আমার কাছে যতদিন ছিল ততদিন স্বভাব ভাল ছিল। খুব মিষ্টি স্বভাবের স্ত্রী। একটুতেই কেঁদে ফেলত, একটুতেই অভিমান করত। অনেক ভাগ্য করলে তবে অমন স্ত্রী হয় মানুষের, সাহেব। আপনি আমার স্ত্রীকে যেমন করে তোক উদ্ধার করে দিন
ক্লাইভ বললে–কিন্তু জানেন, আপনার স্ত্রী আমার এখান থেকে ইম্পর্ট্যান্ট লেটার চুরি করে নিয়ে গেছে! আপনার স্ত্রী আমাকে ব্ল্যাকমেল করেছে? মিলিটারি সিক্রেট চুরি করলে তার কী শাস্তি হয়, তা আপনি নিশ্চয় জানেন?
ছোটমশাই বললে–আপনি ভুল করছেন সাহেব, আমার স্ত্রী তেমন কাজ করতেই পারে না। আমার স্ত্রী সতী
আপনার স্ত্রী নবাবের সঙ্গে চেহেলসূতুনে রাত কাটায়, তবু বলছেন আপনার স্ত্রী সতী?
আমার স্ত্রীকে আমি চিনি না সাহেব! আপনি চেনেন? আমার স্ত্রী প্রাণ দেবে, তবু নবাবের সঙ্গে চেহেল্-সুতুনে রাত কাটাবে না।
ক্লাইভ বললে–আমি ইন্ডিয়ান নই, আমি ইংলিশম্যান, আমি আপনাদের হিন্দু ম্যারেড লাইফ সম্বন্ধে কিছু জানি না। তবে আমার ধারণা ছিল হিন্দু ওয়াইফরা খুব ভাল। আমার এখানে যে লেডি আছে তাকে তো দেখছি, শি ইজ ভেরি গুড। ড্রিঙ্ক করে না, বিফ খায় না, ফাউল খায় না
ছোটমশাই বললে–আমার স্ত্রীও ওসব কিছুই খায় না–
ক্লাইভ বললে–কিন্তু উমিচাঁদসাহেব আমাকে বলেছে আপনার স্ত্রী ওসব খায়, আরক খায়, নেশা। করে
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র বললেন–যাক গে, ওসব নিয়ে তর্ক করে লাভ কী! নবাবের হারেমে ঢুকলে ওসব খেতেই হবে-না খেয়ে থাকতে পারবে না–
ছোটমশাই বললে–যদি খায়ও তাতেও আমার কোনও আপত্তি নেই, এখনও যদি আমার স্ত্রীকে আমি পাই, আমি তাকে ঘরে তুলে নেব।
কিন্তু সে তো মুসলমান হয়ে গেছে, তাকে আপনি নেবেন কী করে? আপনার জাত যাবে না?
ছোটমশাই মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের দিকে চাইলে। বললে–তা হলে কী হবে মহারাজ? আপনি বিধান দিন আমাকে। বলুন আমি কী করব?
মহারাজ সে কথার উত্তর না দিয়ে ক্লাইভের দিয়ে চেয়ে বললেন–আপনি বোধহয় এবার কিছু বিধান দিতে পারবেন সাহেব
ক্লাইভের হাসি এল। বললে–আপনাদের দেশ বেঙ্গল, আপনি নিজে একজন মহারাজা, আপনি বিধান চাইছেন আমার কাছে? আমরা তো ব্যাবসা করতে এসেছি এখানে।
মহারাজ বললেন–দেশ আমাদের, কিন্তু দেশের মানুষ তো সে কথা ভাবে না। আপনারা কোম্পানির স্বার্থ দেখছেন এখানে এসে, আর আমরা দেখছি নিজের স্বার্থ দেশটা যে কাদের সেটাই এখনও ঠিক হয়নি যে!
কিন্তু এ-দেশ তো আপনাদের ব্যর্থপ্লেস! আমরা তো ফরেনার
মহারাজ বললেন–আসলে আমরাও যা আপনারাও তাই। এ আমারও নিজের দেশ নয়, নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলারও নিজের দেশ নয়, এমনকী দিল্লির বাদশারও নিজের দেশ নয়, বাদশা। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর থেকে আমরা সবাই একাকার হয়ে গেছি আমরা, আপনারা, ফরাসিরা, পাঠানরা, মোগলরা, হিন্দুরা, সবাই
ক্লাইভ সব শুনে কিছুক্ষণ ভাবলে। তারপর বললে–আমি কোম্পানির চাকর, কোম্পানির মত না নিয়ে আমি কিছু করতে পারি না, কোম্পানিকে আমি চিঠি লিখব। তখন আপনারা আমাকে সাহায্য করবেন?
ছোটমশাই বললে–আমি আপনাকে সাহায্য করব, আমার যা কিছু আছে সব দিয়ে কোম্পানিকে সাহায্য করব।
ক্লাইভ মহারাজকে জিজ্ঞেস করলে–আজ যদি নবাবকে আমরা ফাইট করে হারিয়ে দিই, তখন কাকে মসনদে বসাব আপনি বলতে পারেন?
ছোটমশাই বললে–নবাব হবার লোকের অভাব হবে না সাহেব।
কিন্তু যাকে-তাকে তো নবাবি করতে দেওয়া যায় না। আপনি হবেন?
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র চমকে উঠলেন–আমি?
হ্যাঁ, আপনি!
কিন্তু আমি যে হিন্দু!
হিন্দু হলে কী হয়েছে? মারাঠারাও তো হিন্দু
ভেতরের ঘরে ছটফট করছিল দুর্গা। মরালীটার যদি নবাব-দরবারে এত ক্ষমতা তো তাকে একবার খরবটা দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। খবরটা কাকে দিয়েই বা তাকে দেওয়া যায়!হরিচরণকে ডাকলে দুর্গা। বললোগা, বলি তোমার সায়েব কাদের সঙ্গে এতক্ষণ কথা বলছে? কে ওরা? হিন্দু, না মোছলমান?
