এরপর সেই চিঠিও লেখা হয়েছিল। মুনশি নবকৃষ্ণের যা কাজ তা সে করেছিল। এখন তোমার হাত-যশ আর আমার ভাগ্য। নিজের দেশের লোকেরা যা করেনি আমার, তা-ই তুমি করে দেবে। এতদিন তোমাকে ডেকেছি মা, তুমি শোনোনি। এবার হিরের কানবালা গড়িয়ে দেব মা তোমার কানে, জড়োয়া গয়না দিয়ে মুড়ে দেব তোমার সর্বাঙ্গ, তুমি সদয় থাকলে এই মুনশি নবকৃষ্ণ তোমার জন্যে সবকিছু করবে। আমার ওপর একটু দৃষ্টি দিয়ো মা
তা তার পরদিনই বাগানে এসে পৌঁছেছিল ক্লাইভ সাহেব। কতদিন পরে আবার আসা।
দুর্গা বললে–তোমার সঙ্গে যে একটু কথা বলব ধীরে-সুস্থে বাবা, তারও উপায় নেই–ও কারা এল তোমার সঙ্গে দেখা করতে
ওদের তুমি চিনবে না দিদি। ওরা নিজের নিজের মতলব হাসিল করতে আসে আমার কাছে।
যাকে-তাকে তুমি আমল দাও কেন বাবা? তোমারও কাজকর্মের ক্ষেতি, ওদেরও ক্ষেতি–
ক্লাইভ বললে–তা বললে–কি চলে দিদি! আমরা এখেনে পরের দেশে এসেছি, সকলের সঙ্গে আমাদের ভাব রাখতে হয়, নইলে কোনদিন তাড়িয়ে দেবে যে
দুর্গা বুঝতে পারত না এসব কথা। বলত–তা যাকেই আসতে দাও বাপু, সেই পাগলটাকে যেন আসতে দিয়ো না–আমার বউকে নিয়ে হয়েছে এক জ্বালা। এ সোয়ামির কাছেও যাবে না, নিজের বাড়িতেও যেতে পারবে না তোমাদের যুদ্ধ কি আর থামবে না বাপু? আমরা কাজকম্ম আর করতে পারব না?
ক্লাইভ বললে–এই তো সবে এলুম দিদি ফরাসডাঙা থেকে। এইবার যেখানে বলবে সেখানেই পাঠিয়ে দেব।
দূর্গা বললে–তা নবাব শায়েস্তা হল? না, এখনও তেমনই পরের মেয়েমানুষের দিকে নজর দিয়ে দিয়ে বেড়াচ্ছে?
ক্লাইভ বললে–এখন নবাব মরিয়ম বেগমের কথায় উঠছে বসছে দিদি
সে কে? সে কোন বেগম?
হাতিয়াগড়ের রাজার সেকেন্ড ওয়াইফ–দ্বিতীয়পক্ষের বউ। তার নাম এখন হয়েছে মরিয়ম
দুর্গার পা থেকে মাথা পর্যন্ত শিউরে উঠল। সেই মরালী নাকি? সেই মরালীই মরিয়ম বেগম হয়েছে? তার এত ক্ষমতা হয়েছে। তার এত প্রতিপত্তি হয়েছে?
ক্লাইভ সাহেব বললে–আমি তা হলে আসি দিদি, ওরা বসে আছে অনেকক্ষণ
সাহেব চলে যেতেই দুর্গা ভেতরে গিয়ে ডাকলে ও বউরানি, মুখপুড়ির কাণ্ড শুনেছ? মুখপুড়ি ভাতারকে ছেড়ে চেহেল্-সুতুনে গিয়ে নবাবকে হাত করে ফেলেছে গো!
সব শুনে ছোট বউরানিও অবাক।
দুর্গা বললে–আমি এতদিন তাই ভাবছি, সে মুখপুড়ি সেখানে গিয়ে কী করছে! আমি তার জন্যে ভেবে ভেবে মরছি। ভাবছি, শোভারামের মা-মরা মেয়েটাকে আমরা জলে ফেলে দিলাম গো। আর সে মেয়ে কিনা সেখানে পায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে আরাম করে নবাবের সেবা করছে?
ছোট বউরানি বললে–তা এক কাজ করলে হয় না দুগ্যা? একবার খবর পাঠালে হয় না মরালীকে যে, আমরা এখানে কষ্ট করে পড়ে আছি, আমাদের যাতে নবাব আর কিছু না করে?
কী করে খবর পাঠাই বউরানি? সায়েবকে বললে–সায়েব যদি কোনওরকমে খবরটা পাঠাতে পারে।
আর নয় তো খুলে বললে–হয় সায়েবকে সমস্ত। বললে–হয় যে, আমরা আসলে কে! খুলে বললেই হয় যে, আমি হাতিয়াগড়ের ছোটমশাইয়ের বউ?
দুর্গা ভাবতে লাগল। বললে–দাঁড়াও বাপু, অত তাড়াহুড়ো কোরো না, শেষকালে কী করতে কী হয়ে যাবে, অনখ কাণ্ড বাধবে তখন। তখন তোমাকে আমি আর সামলাতে পারব না। আমাকে একটু ভাবতে দাও
ছোট বউরানি রেগে গেল। বললে–ভাবতে ভাবতেই যে তোর বছর কাবার হয়ে গেল দুগ্যা, আর কত ভাববি? এদিকে আমি তো আর থাকতে পারছিনে–
দুর্গা বললে–না বউরানি, আর একটু ধৈর্য ধরে থাকো বাপু, শেষকালে কোনদিন জানাজানি হয়ে গেলে নাকালের একশেষ হয়ে যাবে
হঠাৎ ওদিক থেকে হরিচরণ আসতেই কথা বন্ধ হয়ে গেল দুর্গার।
*
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র বললেন–এই বাংলাদেশের কপালে অনেক দুঃখভোগ গেছে সাহেব। দিল্লির কথা ছেড়ে দিন, দক্ষিণাপথের কথাও ছেড়ে দিন। সে অনেক দূরের দেশ। তবু যেটুকু কানে আসে তাতে বুঝতে পারি, দিল্লির বাদশার ক্ষমতা সব দক্ষিণাপথে চলে গেছে। হিন্দুস্থানের ক্ষমতার কেন্দ্র এখন দক্ষিণাপথ। বাদশা আওরঙ্গজেব তা বুঝেছিলেন বলেই শেষজীবনে আবার নিজের ক্ষমতা ফিরে পেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যা হবার নয়, তা কেমন করে হবে? এখন আবার হিন্দু রাজত্ব ফিরে আসছে। বাজিরাও, সিন্ধিয়া, হোলকার, গাইকোয়াড়, তাদের ওপরেই আমাদের এতদিন ভরসা ছিল। এখন এসেছে বালাজি রাও
ক্লাইভ সব শুনছিল মন দিয়ে। জীবনে এই প্রথম দেখলে এই কিংটাকে। সঙ্গের লোকটা চুপ করে বসে ছিল।
বললে–দেখুন মহারাজ, আমরা এসেছি ব্যাবসা করতে।
তা তো জানি সায়েব। আপনারা তো আর থাকতে আসেননি এখানে
আর আমরা তো চলেই যাচ্ছিলাম ইন্ডিয়া ছেড়ে। তিন হাজার টাকা ইয়ার্লি পেশকস দিয়ে আমরা ব্যাবসা করবার সনদ পাই এখানে, কিন্তু কোম্পানির কিছুই প্রফিট থাকে না তাতে–সেসব পুরনো। ইতিহাস। আজকে যখন লাভ হতে শুরু করেছে তখন নবাব আমাদের চলে যেতে বলছে
কৃষ্ণচন্দ্র বললেন–আপনারা যাবেন না, মোগল বাদশার দিন শেষ হয়ে গেছে, মারাঠারাও নিজেদের মধ্যে ঝগড়া লাগিয়েছে। আসলে পাপের রাজ্য থাকে না সাহেব। পাপ করলে তার প্রতিফল পেতেই হয়। আমরা হিন্দুরা জন্ম থেকেই তা বিশ্বাস করি। নইলে বাদশা আওরঙ্গজেব মরবার সময় কী বলেছিলেন জানেন তো?
না। কী বলেছিলেন?
মহারাজ বললেন–অত বড় বাদশা, মরবার সময় তার হয়তো হুশ হয়েছিল। বলে গেছেন–আমি সংসারে আসবার সময় কিছুই সঙ্গে করে আনিনি, কিন্তু যাবার সময় পাপের বোঝা সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি। ভগবানের দয়ার ওপর বিশ্বাস আমার রয়েছে, কিন্তু আমি যা পাপ করেছি তার কথা ভেবে। মন আমার অস্থির। এখন যা হয় হোক, আমি অকূল সমুদ্রে জীবনতরী ভাসিয়ে দিলাম
