ক্লাইভ বললে–আমি আর তোমার.কী করতে পারব মুনশি, আমার টাকা কোথায়?
মুনশি বললে–এখন টাকা নেই, কিন্তু পরে তো টাকা হবে, তখন যেন দাসানুদাসকে মনে রাখেন
ক্লাইভ বললে–পরে কী করে টাকা হবে? আমি তো কোম্পানির চাকরি করি, কোম্পানি আমাকে মাইনে দেয়
আপনার টাকা হবে হুজুর, আমি বলছি আপনার টাকা হবে। ভগবান আপনাকে দেবে। আমি তো আমার গডেস সিংহবাহিনীর কাছে তাই প্রে করি হুজুর যে, সাহেবকে আমার অনেক টাকা পাইয়ে দাও–আপনার টাকা হলেই আমার টাকা হবে!
কিন্তু টাকা আমার কী করে হবে, তাই বলো না?
মুনশি বললে–মুর্শিদাবাদের নবাবের কি কম টাকা আছে ভেবেছেন?
মুর্শিদাবাদের নবাবের টাকা আমি কী করে পাব? নবাব আমাকে দেবে কেন?
মুনশি বললে–টাকা কি কেউ কাউকে দেয় হুজুর? আপনি চাইলেই পেয়ে যাবেন।
চাইলে পাব কেন?
ভয় পেয়ে আপনাকে নবাব দিয়ে দেবে।
নবাব আমাকে ভয় পাবে কেন?
ভয় না পেলে আমাদের তিনজনকে ছেড়ে দিলে কেন তাই বলুন? সবাই তো আমাকে বললে, নবাব ক্লাইভসাহেবকে ভয় পায় বলে আপনাদের ছেড়ে দিলে। ইয়ার লুৎফ খাঁ সাহেব তাই বললে, মিরজাফরসাহেব তাই বললে, জগৎশেঠজিও তাই-ই বললেন।
সবাই নবাবের এগেনস্টে?
হ্যাঁ সায়েব, সব্বাই। এতদিন অন্য লোকের মুখে শুনে এসেছেন, এবার আমার মুখে শুনলেন। আমি তো আর আপনাকে মিথ্যে কথা বলব না। মিথ্যে কথা বলা বড় পাপ হুজুর, যে মিথ্যে কথা বলে সে নরকে যায় হুজুর, সে রৌরব নরকে গিয়ে পচে মরে–
ক্লাইভ সাহেব মুনশির কথা শুনে খানিকক্ষণ ভাবতে লাগল। মুনশি তখনও বলছে–এই যে আপনি চন্দননগর দখল করলেন, আগে কত ভয় পেয়েছিলেন, আগে কত সন্দেহ করছিলেন, কিন্তু কিছু হল? নবাব কিছু করতে পারলে? পারবে কী করে? ওদিকে দিল্লি থেকে পাঠান আহমদ শা আবদালি বাংলাদেশের দিকে তো আসছে, তখন কত দিকে যুদ্ধ করবে? কে মদত দেবে? নবাবের দলে তো কেউ নেই।
কেন, ফরাসিরা? জেনারেল বুশি? মঁসিয়ে ল?
আজ্ঞে, ফরাসিরা আর আপনারা? আপনার বুদ্ধির কাছে ফরাসির বুদ্ধি? নবাব কি ভাবছেন জানে না আপনার বুদ্ধির কথা?
ক্লাইভ বললে–বুদ্ধির কথা বলছ বটে, কিন্তু মরিয়ম বেগমের তো আরও বুদ্ধি–আমার চেয়েও বুদ্ধি, নইলে আমাকে ঠকিয়ে যায়?
মুনশি বললে–তার কথাই তো হচ্ছে, এবার দেখুন না কী হয়, তাকে কী করি–
কী করবে? মার্ডার?
মুনশি বললে–সে যখন হবে, তখনই শুনতে পাবেন–
এসব কথা আগেই হয়ে গিয়েছিল। সেই হুগলিতে ক্যাম্প করে থাকবার সময়। তারপর সেখান থেকে ওয়াটসের চিঠি এসেছে। ফ্রেঞ্চদের সঙ্গে ঝগড়া বাধবার কথাও জানিয়েছে। রাত্রে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে তখন ক্লাইভ আবার বিছানা থেকে উঠল। নবকৃষ্ণকে ডাকালে।
নবকৃষ্ণ সামনে আসতেই ক্লাইভ বললে–মুনশি, নবাবের খাজাঞ্চিখানায় কত টাকা আছে?
মুনশি বললে–কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা হুজুর।
তবু আন্দাজ কত?
তা আজ্ঞে এত টাকা যে, আপনি এক হাতে বইতে পারবেন না। আপনি আমি দুজনে মিলেও বইতে পারব না–পুরুষানুক্রমে জমে আসছে কিনা। আসলে সে টাকার হিসেব নেই। নবাব নিজেও জানে না কত টাকা আছে। বেগমরাও জানে না
ক্লাইভ বললে–যদি নবাবের সঙ্গে ঝগড়া বাধাতেই হয় তো ভাল করেই বাধুক। এই দেখো, নবাব কী চিঠি লিখেছে পড়ে দেখো
মুনশি পড়তে লাগল–“আমি কোম্পানির কাছে যে টাকা দিবার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, তাহার প্রায় সবটাই শোধ করিয়াছি। আমি সন্ধির শর্তও অক্ষরে অক্ষরে পালন করিতেছি। কিন্তু আপনাদের পক্ষে সেরূপ দেখি না। ইংরেজ সৈন্যর অত্যাচারে হুগলি হিজলি বর্ধমান ও নদিয়া ত্রস্ত হইয়াছে। এসমস্ত যে আপনাদের জ্ঞাতসারে হইতেছে, ইহা আমার বিশ্বাস হয় না। শুনিলাম ফরাসিরা আপনাদের সহিত যুদ্ধ করিবার জন্য দক্ষিণাপথ হইতে ফৌজ পাঠাইয়াছে। তাহারা আমার রাজ্যে বিবাদ উপস্থিত করিবার ইচ্ছা করিলে আমাকে লিখিবামাত্র সিপাহি-সৈন্য পাঠাইয়া তাহাদিগকে নিরস্ত করিব।
ক্লাইভ জিজ্ঞেস করলে–চিঠি পড়ে তোমার কী মনে হয় মুনশি?
মুনশি বললে–মনে হচ্ছে এর পেছনে মরিয়ম বেগমের হাত আছে হুজুর
কেন?
নবাবকে মরিয়ম বেগম বুদ্ধি দিয়েছে। বলেছে, একটু নরম সুরে চিঠি লিখলে কাজ হাসিল হবে। নইলে নবাব তো এরকম নরম সুরে চিঠি লেখবার লোক নয়! আপনি এ-চিঠির উত্তরে কড়া করে জবাব দিন হুজুর বেশ কড়া। আপনি নরম হবেন না
তা হলে কী লিখব বলে দাও
মুনশি কলম নিয়ে বসল। তারপর লিখলে আপনার পত্ৰ পাইয়াছি। কিন্তু কাশিমবাজারের ফরাসিগণকে উচ্ছেদ করিবার সম্মতি না দিলে ইংরেজদের সঙ্গে নবাবের যে সদ্ভাব আছে তাহা প্রমাণ হইবে না। আপনি অবিলম্বে কাশিমবাজারের ফরাসি কুঠি উঠাইয়া দিন।
চিঠিটা পড়ে ক্লাইভ নীচেয় নিজের নাম সই করে দিলে।
সই করার পর মুনশি চিঠিটা নিয়ে মুর্শিদাবাদের দরবারে পাঠানোর বন্দোবস্ত করতে গেল। যাবার আগে বললে–আপনি আর এক কাজ করুন হুজুর, কাশিমবাজারের ওয়াটসাহেবকে লিখে দিন যেন এখনই একবার ইয়ার লুৎফ খাঁ সাহেবের সঙ্গে দেখা করেন–
ক্লাইভ বললে–তাতে তো সবাই জেনে যাবে মুনশি?
আজ্ঞে, জানবে কী করে? মেয়েমানুষের মতো বোরখা পরে অনেক রাত্রে দেখা করতে বলবেন। পালকিতে করে যেতে বলবেন, তা হলে কেউ আর সন্দেহ করবে না। ইয়ার লুৎফ খাঁ-কে যদি নবাব করে দেন হুজুর তো তিনি আপনাদের হয়ে সবকিছু করবেন
