চন্দননগর থেকে ফিরে এসেই ক্লাইভের যেন আর শান্তিতে থাকা চলছিল না। কোথায় যেন সব গোলমাল পাকিয়ে উঠছিল। কাউকে তো বিশ্বাস করবার উপায় নেই ইন্ডিয়াতে। হুগলির ফৌজদার নন্দকুমার একটা স্কাউড্রেল। উমিচাঁদটা একটা বিস্ট। অথচ তাদের কাছ থেকেই হেল্প নিতে হবে। তাদের ডিসরিগার্ড করা চলে না। খবরটা ঠিক সময়েই ফ্লেচার দিয়ে গিয়েছিল যে, নবাবের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে গেছে তিনজনে। মুনশি নবকৃষ্ণ তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়েসি।
ক্লাইভ তাকে জিজ্ঞেস করেছিল–নবাব তোমাদের হঠাৎ ছেড়ে দিলেই বা কেন? হোয়াই?
নবকৃষ্ণ মুর্শিদাবাদ থেকে একেবারে সোজা সাহেবের কাছে এসে হাজির।
বললে–হুজুর, আসলে শয়তানি
শয়তানি মানে? নবাব তোমাদের সঙ্গে শয়তানি করেছে বলতে চাও?
হুজুর, উমিচাঁদসাহেব বললে–এরকম খেয়াল নবাব বাদশাদের হয় মাঝে মাঝে। কেউ কেউ মক্কায় চলে যাবার ভয় দেখায়। বাদশা আওরঙ্গজেব তাই করত। ও শুনে আপনি আশ্বস্ত হবেন না। ভেতরে ভেতরে নবাব আপনাদের হিন্দুস্থান থেকে তাড়াবার মতলব করেছে
সেকী? কে বললে–তোমাকে?
আজ্ঞে, আমি নিজেই মুর্শিদাবাদ থেকে সব শুনে এলুম। সকলের সঙ্গেই যে দেখা করে এলুম। জগৎশেঠের সঙ্গে দেখা করলুম, দোহাজারি মনসবদার ইয়ার লুৎফ খাঁ’র সঙ্গে দেখা করলুম, আমি সবাইয়ের সঙ্গে দেখা করেছি হুজুর আপনার জন্যে।
কিন্তু সেই চিঠিটা? যে-চিঠিটা মরিয়ম বেগম স্মাগল করে নিয়ে গিয়েছিল? সেটা আদায় করতে পারলে?
তা আপনিই বা কী রকম ল্যালাখ্যাপা লোক হুজুর। অত ভাল লোক হলে সংসারে চলে? আপনি একটু ঘুঘু হোন না যেমন কুকুর তেমনই মুগুর। ভাল মানুষের আর কাল নেই তা জানেন? এই যে আমি। আমাকে দেখছেন তো! আমি ভালমানুষ বলেই এতদিন বসে বসে ভুগছি–এত হেনস্থা আমার
তুমি যে বলেছিলে মরিয়ম বেগমের কাছ থেকে তুমি চিঠিটা আদায় করবে যেমন করে হোক?
সেই তো বলেছিলাম, আর সেই জন্যেই তো তোড়জোড় চলছে। উমিচাঁদসাহেব খুব খেপে গেছে হুজুর। খ্যাপবার তো কথাই। কোথাকার কোন মেয়েছেলে নবাবের বেগম হয়েছে বলে একেবারে ধরাকে সরা জ্ঞান করছে, আমাদের কাউকে একেবারে মানুষ বলেই মনে করে না। মনে হয়েছে চিরকাল বুঝি ওর এমনিই যাবে!
ক্লাইভ বললে–কিন্তু মুনশি, শুনেছি ওই মরিয়ম বেগম নাকি হাতিয়াগড়ের রাজার সেকেন্ড ওয়াইফ? হাতিয়াগড়ের রাজা একবার এসেছিল আমার কাছে, তার কাছেই শুনেছি
মুনশি বললে–তা যখন ছিল তখন ছিল, এখন যে আজ্ঞে, নবাবের সঙ্গে শুচ্ছে—
শুচ্ছে মানে?
শুচ্ছে মানে শুচ্ছে, স্লিপিং। সেম বেড!
সত্যি?
সেকী হুজুর? আপনি অবাক হয়ে যাচ্ছেন? এরকম কত মেয়েমানুষের সঙ্গে নবাব শোয়! নবাবের কি মেয়েমানুষের অভাব আছে ভেবেছেন? আমার পয়সা নেই তাই অত বিয়ে করতে পারি না। আমাদের হিন্দুদের মধ্যে হুজুর যারা কুলীন তারা দেড়শোদুশো মেয়েমানুষের সঙ্গে স্লিপ করে। সেসব আপনি বুঝবেন না। মরিয়ম বেগম নবাবের সঙ্গে শুয়ে শুয়ে খুব মজা পেয়েছে তো, গায়ে ভাল ভাল জড়োয়া গয়না পেয়েছে, বাঁদি-ঝি পেয়েছে, তাই সোয়ামিকে একেবারে ভুলে গিয়েছে। মেয়েজাতের যে মজাই ওই৷ যখন যেখেন, তখন সেখেনে৷ তাই তো বলি আজ্ঞে, তুই এত নেমকহারাম মাগি রে? একবার সোয়ামির কথা ভাবলিনে?
ছেলেমেয়ে আছে নাকি মুনশি?
নেই, তবে ছেলে থাকলেও অমনি করত। কত মেয়েমানুষ যে ছেলেমেয়ে ফেলে রেখে চেহেলসূতুনে গিয়ে রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই হুজুর। একদিকে যেমন দেখবেন বিধবা মেয়েরা সোয়ামির চিতার ওপর আগুনে পুড়ে মরছে, তেমনই আবার সোয়ামিকে ছেড়ে পরপুরুষের ঘর করছে, তাও দেখতে পাবেন! সেই জন্যেই তো হুজুর আমাদের হিন্দুশাস্ত্রে মেয়েমানুষকে নরকের দ্বার বলেছে। মনু বলেছেন, মেয়েদের দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘরে শেকল দিয়ে রাখবে। একটু ঢিলে দিয়েছ কি পুরুষের কাছে পালাবে।
ক্লাইভ শুনছিল। মুনশির কথাটা শুনে একটু ভাবল। তারপর বললে–কিন্তু দেশে আমারও তো ওয়াইফ আছে, সে তো আমাকে ছেড়ে কোথাও যায় না। আমি তো তাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখিনি–আমি তো তাদের সেখানে রেখে দিয়ে এত দূরে পড়ে আছি–
মুনশি বললে–কী বলছেন আপনি হুজুর? আপনার সঙ্গে আমাদের তুলনা? আপনারা হলেন গিয়ে দেবতার জাত। হিন্দু শাস্ত্রে আপনাদের বলেছে শ্বেতদ্বীপের মানুষ। আমরা যে আপনাদের চেয়ে নিচু জাত হুজুর
কিন্তু
ক্লাইভ বললে–কিন্তু আমার এই বাগানবাড়িতে দু’জন হিন্দু লেডি আছে মুনশি, তারা তো খুব ভাল। একজন উইডো আর একজন ম্যারেড। তারা তো খুব ভাল লোক মুনশি! তারা ড্রিঙ্ক করে না, বিফ খায় না, ফাউল খায় না।
মুনশি বললে–তা তো হল, কিন্তু তার হাজব্যান্ডের কাছে যায় না কেন, সেইটে আগে বলুন
তার হাজব্যান্ডটা খুব বড় পোয়েট মুনশি! খুব ভাল পোয়েট্রি বানায় কিছুতেই তার কাছে যাবে এরা।
তবেই বুঝুন! কেন যায় না?
ক্লাইভ বললে–সত্যি বলো না মুনশি, যায় না কেন?
মুনশি বললে–যায় না কেন, বলব?
বলো!
মুনশি বললে–যায় না, শুধু লোকটা বাউন্ডুলে বলে! পোয়েট্রি দিয়ে তো পেট ভরবে না হুজুর। পেপায়েট্রি শুনতে ভাল, পোয়েট্রি সুর করে গাইতেও ভাল, কিন্তু পোয়েট্রি দিয়ে তো গয়না হয় না, পোয়েট্রি দিয়ে তো শাড়ি হয় না, ভাত হয় না। অমন জিনিস নিয়ে কী হবে হুজুর? সেই জন্যেই তো হুজুর আপনার পায়ের তলায় পড়ে আছি যে, প্রাণ ভরে আপনাকে সেবা করব।
