ছোটমশাই বললে–তা বলে পরের বউ নিয়ে থাকাটা কি ভাল মহারাজ?
আরে মেয়েটাও যে খারাপ জাতের। সে সোয়ামির কাছেই যাবে না। সোয়ামিকে দেখতেই পারে । সোয়ামির নাম পর্যন্ত শুনতে পারে না। এ কী রকম স্বভাব?
আজ্ঞে, লোকটা যে বাউন্ডুলে। অমন স্বামীটার সঙ্গে থাকেই বা কী করে?
মহারাজ বললেন–যাক গে, ওসব নিয়ে আমাদের দরকারটা কী? যারযার স্বভাব নিয়ে লোকে পৃথিবীতে আসে। লোকটার জ্বালা-যন্ত্রণা আছে, ওই নিয়েই ভুলে থাকতে চাইছে। আসলে কী জানেন? দু’রকম তন্ত্রসাধক আছে পৃথিবীতে–এক রকম বীরাচারী, আর-এক রকম পশ্বাচারী, ক্লাইভসাহেব হল পশ্বাচারী সাধক
তারপর বললেন–আর এই দেখুন না আমাদের সেনমশাইকে সেই যে নাটমন্দিরে গিয়ে গান গাওয়া ধরেছে, আর ছাড়ছে না যে যাতে আনন্দ পায়
হঠাৎ হালদারবাড়ির এক পাণ্ডা ঘরে ঢুকল।
কী খবর হালদারমশাই?
একজন আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে
মহারাজ বুঝতে পারলেন। বললেন–ছোটমশাই, এবার আপনি একটু ও-ঘরে বসুন গিয়ে
ছোটমশাই উঠে যেতেই শশী ঘরে এল। মহারাজ বললেন–কী খবর, শশী?
খবর সব নিয়ে এসেছি মহারাজ
আগে মুর্শিদাবাদের খবর বলল। সেই মরিয়ম বেগমের খবর কিছু আছে?
তারই খবর এনেছি। বেগমসাহেবা নবাবকে একেবারে হাতের মুঠোয় করে ফেলেছে মহারাজ। আমি তো আরও অনেক খবর আনতে পারতাম, কিন্তু বেগমসাহেবা কান্তকে আমার সঙ্গে কথা বলতে বারণ করে দিয়েছে যে
কেন?
আমাকে সন্দেহ করছে কেবল। বলেছে–ওর সঙ্গে কথা বোলো না। আমি প্রথম প্রথম তার কাছ থেকেই তো খবর আদায় করতুম। বলতুম আমি গরিব লোক, ফৌজের দল থেকে নাম কাটা গেলে উপোস করব, এই বলে খুব পটিয়েছিলুম, কিন্তু তারপর আর কথা বলত না আমার সঙ্গে এখন অন্য পথ ধরেছি
কী পথ?
এখন ফকির সেজে মুর্শিদাবাদের রাস্তায় ঘুরে বেড়াই। আর সারাফত আলি বলে এক খুশবু-তেলওয়ালা আছে, তার একটা চাকর আছে, তার নাম বাদশা। সেই বাদশার সঙ্গে থাকি আর খবর আদায় করি। খুশবু-তেলওয়ালা আমাকে খেতে দেয়। সে-ই আমাকে মরিয়ম বেগমের খবর দিলে।
কী খবর?
বললে, মরিয়ম বেগমসাহেবাকে খুন করবার চেষ্টা করছে ওরা।
কারা?
ওই উমিচাঁদ, নন্দকুমার আর ক্লাইভসাহেবের মুনশি নবকৃষ্ণ। ওদের সবাইকে যখন মরিয়ম বেগমসাহেবা ধরে নিয়ে গিয়েছিল, তখন ওখানে একজন লুকিয়ে লুকিয়ে ওদের কথা শুনেছিল।
মহারাজ সব শুনলেন মন দিয়ে। তারপর জিজ্ঞেস করলেন–আর এদিকের খবর কী? হুগলির?
আজ্ঞে, ওদিককার ছাউনি উঠিয়ে দিয়ে ক্লাইভসাহেব কলকাতায় আসছে—
আসছে?
হ্যাঁ, সেপাইরা একদল তাবুর খুঁটি খুলছে দেখে এলুম। দেখে আমি আর দাঁড়াইনি সেখানে। সোজা চলে এসেছি।
মহারাজ জিজ্ঞেস করলেন–ঠিক জানো তো?
আজ্ঞে হ্যাঁ মহারাজ, ঠিক জানি।
মহারাজ বললেন–ঠিক আছে, তুমি যাও, মুর্শিদাবাদে গিয়ে কতদূর কী হল খবর পাঠিয়ো
শশী চলে যেতেই মহারাজ ছোটমশাইকে ডেকে পাঠালেন। বললেন–চলুন ছোটমশাই, এবার যা হোক কিছু একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যাবে, ক্লাইভসাহেব কলকাতায় এসে গেছে।
ছোটমশাইয়ের তবু যেন সন্দেহ গেল না। বললে–খবর পেয়ে গেছেন? কে খবর দিলে?
আমার লোক আছে ছোটমশাই। তার জন্যেই এতদিন অপেক্ষা করছিলাম এখানে, চলুন।
আমি যাব?
হ্যাঁ, আপনিও থাকবেন আমার সঙ্গে, আপনি সব কথা খুলে বলবেন।
সেবার তো বলেছিলাম সব। কিন্তু হঠাৎ গোলাগুলি চলতে লাগল, আমি ভয়ে চলে গেলাম। কিন্তু আপনার সঙ্গে গেলে কিছু ভাববে না তো?
মহারাজ বললেন–আমার রায়গুণাকর লিখেছে দেখেননি, বড়র পিরিতি বালির বাঁধ, ক্ষণে হাতে দড়ি ক্ষণেকে চাঁদ।তা সে হতে পারে কর্নেল ক্লাইভ, আমিও তো মহারাজা। দেখা যাক না কী হয়–চলুন, তৈরি হয়ে নিন
*
পেরিনসাহেবের বাগানে এসেই ক্লাইভসাহেব খোঁজ নিয়েছে। দিদি রয়েছে সেখানে, দিদির বউ রয়েছে। মনটা ছটফট করছিল কয়েকদিন ধরেই।
দিদি!
দুর্গারও প্রাণটা যেন হাঁফিয়ে উঠছিল। দেখা সাক্ষাৎ নেই কিছু নেই, কেমন করে দিন কাটে। হরিচরণকেও যানয়-তাই বলে বকাঝকা করেছে।
বলেছে–তোমার সাহেব কী রকম লোক বাছা? আমাদের বলে গেল ক’দিন পরেই আসবে, আর আজ একমাস হয়ে গেল একেবারে আসার নামগন্ধও নেই, একটা খবর পর্যন্ত দেয় না ।
হরিচরণ বলেছে–যুদ্ধ করতে গেলে কি কিছু জ্ঞান থাকে দিদি, কোনও দিকেই খেয়াল থাকে–
তা খেয়াল যদি না থাকে তো আমাদের কেন কথা দেওয়া? তুমি বাপু আমাদের বাড়িতে পৌঁছিয়ে দিয়ে এসো আমরা এখানে আর থাকতে নারব না
আর ঠিক সেইদিনই দলবল নিয়ে সাহেব এসে হাজির।
বললে–খুব রাগ করেছ তো আমার ওপর?
দুর্গা বললে–তা রাগ করব না? তোমার নাহয় মাগ-ছেলে সাত-সুমুদ্র পারে রয়েছে, আমাদের জন্যে তোমার ভেবে লাভ কী? আমরা তোমার কে বলো না যে, আমাদের কথা ভাবতে যাবে তুমি?
ক্লাইভ বললে–সেকী? আমি তোমাদের কথা ভাবছি না কে বললে?
হঠাৎ ওদিক থেকে হরিচরণ এসে খবর দিলে, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র এসেছে সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে
সাহেব একটু অবাক হয়ে গেল। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র! মহারাজ অব নদিয়া?
অলরাইট, ডাকো তাকে, আমার ড্রয়িংরুমে বসাও
হরিচরণ বললে–সঙ্গে আর একজন ভদ্রলোক রয়েছেন
তাকেও ডাকো, দু’জনকেই বসাও, আমি যাচ্ছি দিদির সঙ্গে কথা বলে হরিচরণ চলে গেল।
.
দুর্গা ক্লাইভ সাহেবের মুখের দিকে ভাল করে চেয়ে দেখলে আবার। যখন তার সঙ্গে কথা বলে তখন এক রকম চেহারা, আবার যখন অন্য লোকের সঙ্গে কথা বলে তখন সে চেহারা একেবারে বদলে যায়। কিন্তু দূর্গা তো জানে না কাকে বলে রাজনীতি। তোমরা তো বেশ আছ দিদি, কোথা থেকে চাল-ডাল-তেল-নুন-ঘি আসছে কিছুই জানতে চাইছ না। তোমাদের নিজেদের বাড়িতেও তোমরা তার খবর রাখে না। খবর রাখে তোমাদের মেন-ফোক। আমাদের দেশে আমার ওয়াইফ পেগিও তোমাদের সেই আসল আমিটার খবর রাখে না। এই যে আমি এখানে কত কষ্ট করে কোম্পানির এম্পায়ার তৈরি করতে চেষ্টা করছি, আমার সিলেক্ট কমিটিও তার কোনও খবর রাখে না। নবাবের বেগমরাই কি খবর রাখে নবাবের মনের কথার? যদি রাখত তা হলে যে পৃথিবী চলত না। তাই তোমাদের সামনে আমি হাসি, তোমাদের সঙ্গে আমি গল্প করি। নবাবরাও তাই বাইরে গান বাজনাফুর্তি করে, শিকার করে, আর ভেতরে তারাও ঠিক আমার মতন। তারাও আমার মতো বাইরে এক রকম, ভেতরে আর-এক রকম। তোমরা তো রাত্রে ঘুমোও। আমি কতদিন দেখেছি তোমরা আরাম করে রাত্রে ঘুমোচ্ছ। কিন্তু আমি? তোমরা জানতেও পারোনি যে, আমার ঘুম নেই রাত্রে। আমি যদি ঘুমিয়ে পড়ি তা হলে যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও ঘুমিয়ে পড়বে। আর নবাব? গিয়ে দেখে এসো মুর্শিদাবাদের মতিঝিলে। ঘুমের জন্যে নবাবকে কত কসরত করতে হচ্ছে তা বেঙ্গলের মানুষ জানতেও পারছে না।
