বলে যেমন আসছিলেন তেমনই আবার চলে গেলেন।
গরান কাঠের খুঁটি আর গোলপাতার ছাউনি দেওয়া ঘরের ভেতর মরালী তখনও চুপ করে বসে ছিল। পাটের শাড়িতে ঘেমে নেয়ে চান করে উঠেছিল। কাল সকালবেলার সেই সব কথাই মনে পড়ছিল। বাইরে লোকজনের গলা শোনা যাচ্ছে। ঘরের মধ্যে এতক্ষণ নয়ানপিসি ছিল, অনন্তদিদি ছিল, পাড়ার সবাই ছিল। তারা সবাই বাইরে চলে গেছে। বর আসেনি লগ্ন বয়ে যাচ্ছে। বর যদি না আসে তো কী হবে?
হঠাৎ কানে এল–বর এসেছে, বর এসেছে—
*
তা বিপদ কি শুধু শোভারামের মেয়ের একলার। বিপদ সকলের। রাজবাড়িতে তখন সব অন্ধকার। অতিথিশালার ভেতরে সেদিন তেমন লোক ছিল না। যা দু-একজন এসেছিল তারা দিনমানে-দিনমানে চলে গেছে। রেড়ির তেলের পিদিমটা নিভে গিয়েছিল প্রথম রাত্রেই। কাছারির লোক কিছু কিছু এপাশে-ওপাশে শুয়ে ছিল। তাদের পাশ কাটিয়ে উদ্ধব দাস, হরিপদ আর শোভারাম দরজার কাছ পর্যন্ত এল।
উদ্ধব দাস আবার জিজ্ঞেস করলে–সত্যি বলো না গো, নতুন কাপড় কী হবে?
হরিপদ বললে–হবে আবার কী ছাই, যা বলছি করো–আর সময় নেই–
সেদিন হরিপদ যে কী বিপদেই ফেলেছিল। সন্ধেবেলাও কিছু বলেনি হরিপদ। উদ্ধব দাস নেচেছে, গেয়েছে। কড়াইয়ের ডাল দিয়ে ভাত খেয়েছে কলাপাতায়। ছড়া কেটেও শুনিয়েছে।
সেদিনও হরিপদ জিজ্ঞেস করেছিল–নতুন রসের গান বানিয়েছ নাকি দাসমশাই?
উদ্ধব দাস জিজ্ঞেস করেছিল–কেন, তোমাদের দুগগা জানে নাকি আমি এইচি?
তা আর জানে না? তবে আজকে আর গান শুনবে না
কেন? আজ কী হল?
আজ এ-পাড়ায় আমাদের শোভারামের মেয়ের বিয়ে, সেখানে নেমন্তন্ন খেতে যাবে
তা সে তো রাত্তিরে?
তারপর হরিপদ বলেছিল–আচ্ছা দাঁড়াও, দেখি, দুগগাকে জিজ্ঞেস করে আসি গান শুনবে কিনা। আমাকে বলে রেখেছিল, তুমি এলে খবর দিতে। ভারী দেমাক কিনা দুগার। আগে জিজ্ঞেস না করলে যদি আবার খোয়ার করে–
উদ্ধব দাস বলেছিল-ঝিউড়ির আবার অত খোয়ার কেন গা?
ওমা, খোয়ার হবে না? ছোট বউরানির আদর পেয়ে পেয়ে দুগগার খোয়ার যদি একবার দেখো তো তুমিই অবাক হয়ে যাবে দাসমশাই–তুমি বোসো, আমি দেখে আসি ভেতরে
এ-সব বিকেলবেলার ঘটনা। বিকেলও হয়নি ভাল করে। ভেতর বাড়ির প্রথম দরজা পেরিয়ে বড়
বউরানির মহল। তার পাশের বারান্দা দিয়ে গিয়ে তবে ছোট বউরানির মহল পড়বে। কেমন যেন। ভয়-ভয় করতে লাগল হরিপদর। পাশে ছোটমশাইয়ের খেউরি হবার জলচৌকি। সকালবেলা সেখানে বসে খেউরি করে বিশু পরামানিক। জলচৌকিটার পাশে দাঁড়ালে ছোট বউরানির ঘরের বারান্দাটা দেখা যায়। ঘরের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। আশেপাশে দুগাকে কোথাও দেখতে পাওয়া গেল না। এইসময় ছোট বউরানির জন্যে খাবার নিতে আসে দুগগা। রান্নাবাড়িতে গিয়ে খাবার ফরমাজ দিয়ে আসে। সেদিন যা খেতে ইচ্ছে হবে তা আগে থেকে বলে আসতে হয়। বড় আয়েশি মানুষ। ছোট বউরানির ঘুম বড় গাঢ়। সকালবেলা ছোটমশাই উঠবার পরও বিছানায় শুয়ে পড়ে থাকে। তখন দুগগা গিয়ে গা-হাত-পা টিপে দেয়, মাথায় সুড়সুড়ি দেয়। দুগগা না হলে ছোট বউরানির চলে না। সন্ধেবেলা হয়তো ঘি দিয়ে চিড়েভাজা খেতে ইচ্ছে হয়। বাগানের সেরা সেরা আম আসে ছোট বউরানির জন্যে। ভাড়ার ঘরে গিয়ে দুগগা ঝগড়া করে আদায় করে নিয়ে আসে।
দুর্গা বলে খেতে পরতে দেবার মালিক যে, তার যদি একটু তোমোদ করি, তাতে কী এমন অন্যায় করি মা
তরঙ্গিনী ভাঁড়ারের লোক। বলে–বড় বউরানির জন্যে আমের আচার করেছিলুম তাও নিয়ে গেলি
দুর্গা বলে নিজের জন্যে নিইনি গো, নিজের জন্যে নিইনি। খেতে পরতে দেবার মালিকের জন্যেই নিয়েছি। ছোট বউরানির জন্যে জিনিস নিলে তোমাদের এত চোক টাটায় কেন গা?
তরঙ্গিনীও কম নয়। বলে ছোট বউরানি তোর সগ্যে বাতি দেবে লা, তোর পরকালের গতি করবে, ভাল করে পা টিপিস বাপু
এর পর আর ধৈর্য থাকে না দুর্গার। বলে আমার সগ্যে কেন বাতি দেবে না, দেবে তোর সগ্যে। তুই বউরানির খাতির করিস, বাঁজা মেয়েমানুষের পায়ে তেল দিস, মুদ্দোফরাসেও তোর গতি করবে না, করুণাময়ীর ঘাটে তোকে শ্যাল-কুকুরে খাবে! তুই কবে মরবি লা, আমি ঘাটে বসে দেখব
তারপরেই ঝগড়া বেধে যায়। তুমুল ঝগড়া। রান্নাবাড়ি থেকে লোক জড়ো হয় ভাঁড়ারের উঠোনে। সধবা বিধবা কেউ বাকি থাকে না। গালে হাত দিয়ে ক্ষেন্তির মা বলে–অবাক করলি মা। দুগগা, তোর না মাসি হয় তরি। তরিকে তুই ওই কথা বললি?
তরঙ্গিনী তখন সত্যিই কাঁদতে শুরু করেছে।
বলে–তোমরা পাঁচজনে দেখো মা, এই অ্যাটুকু বয়েসে রাড় হল যখন, তখন আমি এনে ঢোকালুম ওকে চাকরিতে, সেই চাকরিতে ঢুকে বড় বউরানির সঙ্গে রাজবাড়িতে এল; ভাবলুম ভাতার যায় যাক, মুখপুড়ি দু’বেলা দু’মুঠো খেতে তো পাবে পেট ভরে। এখন আমার কপাল মা, আমার কপাল–আপন বোনঝি আমার, সেও আমায় কিনা খোয়ার করে
এসব রাজবাড়ির ভেতরকার ব্যাপার। অন্দরমহলের ঘটনা। কিন্তু বাইরে কাছারি, কানুনগো কাছারি, চণ্ডীমণ্ডপ, খাজাঞ্চিখানাতে অন্য চেহারা। হাতিয়াগড়ের রাজবংশের সে ইতিহাস সবাই জানে। পাঠান আমলের শেষ দফায় সুলেমান কররানির সময়ে কালাপাহাড়ের অত্যাচারে সমস্ত ভূভাগ যখন জর্জর হয়ে আছে, তখনকার কথা। এক-একজন সর্দার এক-একটা এলাকায় প্রধান হয়ে উঠেছে। কেবল মদিপুর, চট্টগ্রাম আর এই সুন্দরবনের প্রত্যন্ত প্রদেশ তখনও বিবাদী স্বরূপ স্বাধীন সত্তায় বিরাজ করছে। তখন বাইরে থেকে বারবার অত্যাচার আর আঘাতের ঢেউ এসেছে। কখনও অর্থলোভে, কখনও ভূমির লোভে, কখনও নারীর লোভে সে অত্যাচার দুর্দম আকার নিয়েছে। অত্যাচারের পর অত্যাচারে হয়তো অনেক সময়ে ভূমির অংশ ছেড়ে দিতে হয়েছে, অর্থ দিয়ে অত্যাচারীকে বশীভূত করতে হয়েছে। দেশও পুরনো, এ-দেশের অতীতও পুরনো। সেই সপ্তম-অষ্টম শতাব্দী থেকেই মুসলমানদের অত্যাচার শুরু হয়েছে। মহম্মদ বিন কাশিম আর দ্বিতীয় খলিফ ওমরের সময় থেকেই এর সূত্রপাত। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল এ-দেশের মেয়েমানুষ। আরবের মরুভূমির দেশের চোখে এ-দেশের মেয়েমানুষেরা ছিল স্বপ্ন। তারপর যুগের পর যুগ কেটে গেছে। লুঠতরাজের শেষ হয়নি কোনওদিন। মহম্মদ বিন কাশিম থেকে সবক্তজিন। সবজিন থেকে সুলতান মামুদ পর্যন্ত তার জের চলল। সঙ্গে সঙ্গে মন্দির ভাঙল, বিগ্রহ ভাঙল। দেশের ক্ষাত্রশক্তির আর তখন জাগবার কথা নয়। পুবে বারানসী আর দক্ষিণে সোমনাথ পর্যন্ত অত্যাচারের উত্তাল ঢেউ চলল গড়িয়ে গড়িয়ে। লুঠের পর লুঠ, রক্তপাতের পর রক্তপাত। কান্নায় ভারী হয়ে উঠল বাতাস, রক্তে পঙ্কিল হয়ে উঠল পৃথিবী। সুলতান মামুদ অত্যাচার করতে করতে একদিন নিজের অত্যাচারের বীভৎসতায় নিজেই দু’হাতে নিজের দু’চোখ বুজে ফেললেন। কিন্তু নবাব বাদশাদের মেয়েমানুষের লোভ তবু গেল না।
