ছোটমশাই কথাটা শুনে অবাক হয়ে গেল।
হ্যাঁ ছোটমশাই, তবে শুনুন গল্পটা। কেউ জানে না, আপনাকেই বলি। আপনি তো জানেন, আমি দ্বিতীয়বার বিবাহ করেছি, এবং যার পাণিগ্রহণ করেছি, সে উচ্চকুলের মেয়ে। আমার সঙ্গে সে-কন্যার বিবাহ দিতে ইচ্ছে ছিল না আমার শ্বশুরের। কিন্তু আমার অর্থ প্রতিভা প্রতিপত্তি দেখে পর্যন্ত লোভও সংবরণ করতে পারেনি। আমি ফুলশয্যার রাত্রে আমার বউকে জিজ্ঞেস করলাম–কেমন লাগছে বলো? আমার সঙ্গে বিয়ে না হলে কি এইরকম রুপোর খাটে শুতে পারতে? তা শুনে আমার গৃহিণী কী বললে–জানেন? বললে–আর কয়েকশো বিঘে দূরে বিয়ে হলে আমি সোনার খাটে শুতে পারতাম।
বলে মহারাজ হোহো করে হাসতে লাগলেন।
তার মানে নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলার সঙ্গে শুলে সোনার খাটে শুতে পারত, এইটেই বলতে চাইলে আর কী! উত্তরটা শুনে মনে প্রথমে একটু কষ্ট হয়েছিল বই কী। সেরাত্রে ভাল করে ঘুম হল না। ভাবলাম, সারা বাংলাদেশের মহারাজ হয়েও আমি আমার সহধর্মিণীকে সুখী করতে পারিনি, আমার কীসের অহংকার? আমার কীসের গর্ব?
তারপর? তারপর কী করলেন?
তারপর আর কী করব? স্ত্রীর সামনে হাসিমুখে অপমানটা হজম করে নিলাম। কিন্তু মনের মধ্যে খচখচ করে কাটা বিধতে লাগল। আমার এত অগাধ সম্পত্তিও তো আমার গৃহিণীকে আকর্ষণ করতে পারলে না। মনে হতে লাগল–তা হলে আমার এই সিংহাসনও তো আমার গৃহিণীর কাছে তুচ্ছ। তা সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেও মনের অশান্তি ঘুচল না। ডেকে পাঠালুম গোপাল ভাঁড়কে। ভাবলাম, ওকে পরখ করে দেখি। ওর বন্দোবস্তি জমি কেড়ে নিলুম, ওর মাসোহারা কমিয়ে দিলাম। ওর একমাত্র ছেলে একদিন মারা গেল। আমার কানে সে-খবরও এল। ওকে আমি কিছুই বললুম না। কিন্তু তখনও দেখলম-ও সেই রকমই হেসে কথা কইতে লাগল, ঘুণাক্ষরেও নিজের ছেলের মৃত্যুর খবরটা বললে–না। রোজ যেমন হেসে ভাঁড়ামি করে যায়, সেদিনও তাই করে গেল। ভাবলাম–গোপালবাবু সত্যিই মহাপুরুষ! দুঃখ তো এ-সংসারে আছেই ছোটমশাই, কিন্তু সেই দুঃখকে এড়িয়ে গিয়ে যে তার উর্ধ্বে উঠতে পারে, যে শ্মশানে বসে জীবনের জয়গান গাইতে পারে, তাকেই তো লোকে বলে গোপাল ভাড়। লোকে গোপালবাবুকে ভাড় বলেই জানে, ভাড় বলেই চিরকাল জানবে। কিন্তু আমি জানি ও মহাপুরুষ। ওই বাচস্পতি মিশ্র, রায়গুণাকর, ওঁদের মতোই গোপালবাবু একজন সিদ্ধ মহাপুরুষ।
তারপর?
তারপর তো আজ শুনলেন। রামপ্রসাদ সেন মশাইকে ডেকে তাই তো আজ এমন করে গান শুনছি। হাহুতাশ করে লাভ কী? নবাবের হাহুতাশ নেই? আপনার সহধর্মিণীকে নিয়ে নব যে চেহেসতুনে তুলেছে, ভাবছেন নবাবই কি সুখী? নইলে রামপ্রসাদের গান শুনতে নবাব কখনও আমার বজরায় আসে? আর ওই যে ক্লাইভ। ওই ফিরিঙ্গিবেটার কথাই ধরুন না কেন। নিজের দেশে বউ ছেলেমেয়ে ফেলে রেখে এখানে এই বন-জঙ্গল, মশা-মাছির মধ্যে পড়ে আছে। পড়ে আছে কেন? আপনি কি ভাবছেন লড়াই করে বাংলাদেশ লুঠ করবার জন্যে? তা না-ও হতে পারে? হয়তো আপনার আমার মতো ওর মনের কোনও জ্বালা আছে, কোনও যন্ত্রণা আছে। লোকে যা-ই বলুক, কিন্তু আমি বুঝতে পারি, আমাদের মতো বেটার মনে কিছু কাটা বিধছে, নইলে এইরকম করে ওই ক’টা সেপাই নিয়ে নবাবের সঙ্গে কেউ লড়াই করতে পারে? কেউ কেউ বলবে দৈব ক্ষমতা। কিন্তু আমি বলব, ওই জ্বালা-যন্ত্রণা, ওইটেই হল দৈব ক্ষমতা। ওই দৈব ক্ষমতাটাই মানুষকে মহামানুষ করে। ওটা কাউকে করে বীর, কাউকে করে কবি, কাউকে আবার ভড়। ওরা সবাই-ই মহাপুরুষ! আমি নিজে মহাপুরুষ নই, কিন্তু মহাপুরুষ চিনতে পারি। মহাপুরুষদের চিনতে পারাটাও একটা ক্ষমতা। আমার সে-ক্ষমতা আছে ছোটমশাই! আমার তো অন্য কোনও গুণ নেই, আমার শুধু টাকা আছে। আমি টাকা দিয়ে তাই মহাপুরুষ পুষেছি। ওই রায়গুণাকরকেও যেমন পুষেছি, তেমনই আবার গোপাল ভাঁড়কেও পুষেছি। উপায় থাকলে আমি ওই ক্লাইভটাকেও পুষতুম–ও-ও একটা মহাপুরুষ!
ছোটমশাই এতক্ষণ চুপ করে সব শুনছিল।
খানিকক্ষণ থেমে বললে–তা হলে আমি কী করব বলুন? আমি অনেকদিন হাতিয়াগড় ছেড়ে রয়েছি, আমার বড় গৃহিণী একলা আছেন, তিনিও তো চিন্তিত হয়ে আছেন। ৪৭২
মহারাজ বললেন–আর কিছুদিন সবুর করুন ছোটমশাই, আমি এবার এসেছি ক্লাইভের সঙ্গে দেখা করতে, সে তো আপনি জানেন লোকের কাছে শুধু বলেছি, কালীঘাটে মাকে দর্শন করতে এসেছি ঠিক তা তো নয়।
ছোটমশাই বললে–কিন্তু আর কতদিন এখানে থাকব?
মহারাজ বললেন–আপনার জন্যেই তো আমি এখানে রয়েছি, ক্লাইভসাহেব রয়েছে হুগলিতে ছাউনি করে। ওদিকে দুর্লভরামও পলাশির মাঠে সেপাই-সামন্ত নিয়ে ঘাটি আগলে বসে আছে
তা হলে?
আমি হুগলি যেতে পারতুম। কিন্তু সেখানে আমি গিয়ে ক্লাইভসাহেবের সঙ্গে দেখা করলে আবার নবাবের চরের নজরে পড়ব, সেই ভয়ে যাচ্ছি না। শুনছি আজকালের মধ্যেই নাকি সাহেব ছাউনি তুলে দিয়ে পেরিন সাহেবের বাগানে আসবে
পেরিন সাহেবের বাগানে কেন?
মহারাজ বললেন–তা বুঝি জানেন না? ওখানে যে আবার সাহেব একটা এদিশি মেয়েমানুষ পুষেছে–
সে তো শুনেছিলাম। সে সেই পাগলাটার বউ। যে-পাগলাটা ছড়া লেখে
মহারাজ বললেন–বেটারা গোরু-শুয়োর খায় তো, তাই বেটাদের গায়ে গরম খুব। মেয়েমানুষ না থাকলে ওরা রাত কাটাতে পারে না।
