একজন বলে এবারেও অনখ কাণ্ড বাধত মহারাজ, লড়াই করতে করতে নবাবের ফৌজ একেবারে ওই ঢাকুরে পর্যন্ত হটে গিয়েছিল
মহারাজ জিজ্ঞেস করলেন–তারপর?
তারপর এই মা-ই আমাদের বাঁচিয়ে দিলেন। আমরা সব হালদাররা মিলে মা মা বলে ভ্রাহিম্বরে ডাকতে লাগলাম। বললাম–মা, এবার তুমি ঠেকাও তোমার ছেলেদের মা আর থাকতে পারলেন না, আমাদের ডাক শুনে মায়ের ত্রিনয়ন দিয়ে আগুন ঠিকরে বেরোতে লাগল
একজন ভক্ত বললে–তা তো বেরোবেই, ওদুটোই তো যবন, ওই কোম্পানির ফিরিঙ্গিরাও যবন, ওই নবাবও যবন। দুটো দলের একটাও হিন্দু হলে তবু কথা ছিল
কদিন মহা ধুমধামেই কাটল মহারাজের। ছোটমশাই কিন্তু ছটফট করছিলেন প্রথম থেকেই। বহুদিন পরে এবার সবাই একসঙ্গে কালীক্ষেত্রে এসেছেন। রায়গুণাকর রামপ্রসাদের গান শোনেন আর বলেন–মা, মা
গোপালবাবু বললে–এবার প্রসাদের সন্দেশে চিনির ভাগটা বেশি মহারাজ
মহারাজ বললেন–কী করে বুঝলে?
গোপালবাবু বললে–দেখছেন না পিঁপড়েগুলো সেবারে কত মোটা ছিল, এবারে কত রোগা হয়ে গেছে
তা চিনি বেশি থাকলে কি পিঁপড়েরা রোগা হয়ে যাবে?
গোপালবাবুবললে–তা রোগা হবে না? আপনি গুড়-খাওয়া পিঁপড়ের সঙ্গে ছানা-খাওয়া পিঁপড়ের লড়াই লাগিয়ে দিন, দেখবেন গুড়-খাওয়া পিঁপড়ে হেরে যাবে, ওদের তাকত কম–
রায়গুণাকর শুনছিলেন। বললেন–গোপালবাবুর যেমন কথা
গোপালবাবু বললে–আমারও তো মহারাজ প্রথমে বিশ্বাস হত না। আমার নিজের বাড়িতে পিঁপড়েগুলো আগে খুব মোটা মোটা ছিল, খুব কামড়াত। আমি তখন রাবড়ি খেতাম, ছানা খেতাম, দুধ খেতাম
মহারাজ হাসছিলেন। জিজ্ঞেস করলেন–তারপর?
গোপালবাবু বললে–তারপর আপনি যখন আমার জমি দখল করে নিলেন, মাসোহারা কমিয়ে দিলেন, তখন হঠাৎ দেখি, পিঁপড়েগুলো রোগা হয়ে গেছে সব
কেন? তোমার মাসোহারা কমানোতে পিঁপড়েগুলো রোগা হয়ে গেল কী করে?
আজ্ঞে, গুড় খেয়ে খেয়ে। তখন আর আমার রাবড়ি খাবার পয়সা নেই। গাই-গোরু বেচে দিতে হল, শুধু গুড় খাই। ঘরে গুড়ের নাগরি ছিল, সেই নাগরির গুড় খেয়ে খেয়ে পিঁপড়েগুলো সব রোগা হয়ে গেল
মহারাজ বললেন–তা তুমি নিজে রোগা না হয়ে পিঁপড়েগুলো রোগা হল কেন?
গোপালবাবু বললেন–আজ্ঞে, পিঁপড়ের জান আর আমার জান? আমি পিঁপড়ে হলে আমিও রোগা হয়ে যেতুম–
কালীকৃষ্ণ সিংহী মশাই বললে–মহারাজ, গোপালবাবু কী বলছে বুঝতে পারলেন তো?
মহারাজ বললেন–গোপালবাবু, তোমার জমির বন্দোবস্ত করে দিলে আবার দুধ-ঘি খাবে তো,না কেবল নেশা-ভাঙ করবে
নেশা-ভাঙ করতে গেলেও তো দুধ-ঘি লাগে মহারাজ, দুধ-ঘি না হলে কি নেশা জমে?
রায়গুণাকর বললেন–নেশা-ভাঙ কেন করেন গোপালবাবু? ওতে কী ফায়দা?
গোপালবাবু বললে–সে আপনি বুঝবেন না রায়গুণাকর, আপনি তো কাব্যসরস্বতীর পায়ে মাথা মুড়িয়ে বসে আছেন। আপনার ওসব দরকার নেই। কিন্তু ভাবুন তো আমার কথা। ভাবুন তো আমার পেশার কথা! আমার দুঃখ থাকতে নেই, আমার অসুখবিসুখ থাকতে নেই, আমার চোখে জলও থাকতে নেই। আমার চোখে যদি কোনওদিন মহারাজ জল দেখতে পান তো আমার চাকরি গেল! ভাবতে পারেন আমার ছেলেটা যে-দিন মারা গেল, সেদিনও আমায় মহারাজের সভায় এসে নিয়মমাফিক হাসাতে হয়েছে, নিয়মমাফিক মহারাজার দুর্ভাবনা ভোলাতে হয়েছে… আমার ছেলের মৃত্যুর খবর কেউ জানতে পারেনি দু’দিন, আমি বউকে কাঁদতে বারণ করে এসেছিলাম রায়গুণাকর, পাছে মহারাজের কানে গেলে মহারাজ কষ্ট পান
মহারাজ বললেন–সেই জন্যেই তো তোমাকে এত ভালবাসি গোপালবাবু, তোমার ছেলের মৃত্যুর খবর সেইদিনই আমার কানে এসেছিল, কিন্তু আমি তোমায় বলিনি
আপনি আগেই জানতেন?
গোপালবাবু মহারাজের কথা শুনে অবাক হয়ে গেল!
সাধে কি তোমার চাকরি রয়েছে গোপালবাবু, আমি তোমাকে অনেক পরীক্ষা করেছি। তুমি জানতেও পারোনি। তোমার জমি কেড়ে নিয়ে দেখেছি, তোমার মাইনে কমিয়ে দিয়ে দেখেছি। মানুষকে কি সহজে চেনা যায়! সীতাকে কি বাল্মীকি অত সহজে ছেড়েছিলেন? তাকে অনেক পরীক্ষার মধ্যে ফেলে তবে তাকে সতী করে তুলেছিলেন। বাচস্পতি মশাইকেও তোমার মতো পরীক্ষা করে তবে তাকে সভাপতি করেছিলাম। এই ভারতচন্দ্রকে অনেক পরীক্ষা করে তবেই রায়গুণাকর করেছি–আর তাই-ই যদি না করব তো এতদিন এই রাজত্বে রাজ্য চালাচ্ছি কী করে?
কদিন ধরেই এইরকম আসর বসত। ছোটমশাই থাকত সঙ্গে। সবাই হাসত, গল্প করত। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের এই-ই ছিল নিয়ম। বাইরের কেউ বুঝতে পারত না মহারাজের মনের মধ্যে কী ঝড় চলছে।
একদিন ডেকে বললেন–কী হল? অত মুখভার করে থাকেন কেন হোমশাই?
ছোটমশাই আর থাকতে পারছিলেন না। ক’দিন ধরে দেখছিলেন, মহারাজ হাসি-রসিকতা নিয়েই ব্যস্ত। অথচ চন্দননগর দখল করে ক্লাইভ সাহেবের ফিরে আসার কথাও শোনা হয়ে গেছে। প্রথম দিকে মহারাজের ভয় হয়েছিল হয়তো নবাব আবার ফৌজ নিয়ে ক্লাইভের সঙ্গে লড়াই করতে আসবে। কিন্তু কিছুই হল না। কলকাতা থেকে কিছু লোক পালিয়ে গিয়েছিল গঙ্গার ওপারে। কিছু লোক কালীঘাটের মন্দিরের আশেপাশে এসে উঠেছিল। কয়েক দিনের মধ্যেই কালীঘাটে লোকজনের ভিড় বেড়ে গেল। হালদারদের আয় বেড়ে গেল, ভিখিরিদের তবিল ফুলে উঠল।
মহারাজ আবার বললেন–আমি নবদ্বীপেরও মহারাজা ছোটমশাই, কিন্তু জানেন, আমি আমার নিজের স্ত্রীকেও শায়েস্তা করতে পারিনি, নিজের স্ত্রীকেও বশে আনতে পারিনি
