নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলার চোখ দুটো যেন সেকথা শুনে একটু ছলছল করে উঠেছিল। অনেকক্ষণ কিছু কথা বলেনি। মরালী বলেছিল–আপনি শুয়ে পড়ুন আলি জাঁহা–
নবাব বলেছিল–না, আমি ঘুমোব না–তুমি যাও, চলে যাও এখান থেকে
মরালী তবু বলেছিল–অমন করে রাগ করতে নেই আলি জাঁহা, বাংলার নবাবের রাগ করলে চলে না–সামান্য একটা মেয়েমানুষের ওপর রাগ করা তার মানায় না–
তবু নবাব শুতে যায়নি। বলেছিল–তুমি যাও, আমার যা খুশি তাই করব, আমি কালই মঁসিয়ে ল’কে ডেকে কাশিমবাজার থেকে তাড়িয়ে দেব আমি বলব ফরাসিরা আমার কেউ নয়, ইংরেজরাই আমার বন্ধু, ইংরেজরাই আমার সব! আমি তোমার কোনও কথা শুনব না–তুমি যাও
হায় রে! সব পুরুষমানুষই কি একরকমের হতে হয়। ও নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলাও যা, ওই কান্তও তাই। ওই উদ্ধব দাসও তাই, ওই কর্নেল ক্লাইভও তাই। একবার তুমি মুসলমান করে নেবে, একবার তুমি খ্রিস্টান করে নেবে, আবার একবার হিন্দুর মেয়ের মতো পতি-ভক্তি চাইবে, তা কী করে হয়! তোমরা তোমাদের নিজেদের দিকটাই দেখলে শুধু, আমার কথা তো তোমরা কেউই ভাবলে না! আমার যেন মনের বালাই থাকতে নেই। আমার যেন নিজের বাছবিচার বলে কিছু থাকা অপরাধ! আমি যেন পাথর, আমি যেন পাহাড়, আমি যেন মেয়েমানুষ নই!
মতিঝিল তখন অন্ধকার নিঝুম। মরালী রোজকার মতো নবাবকে ঘুম পাড়িয়ে মতিঝিল থেকে চেহেল্-সুতুনে যাচ্ছিল। বাদিটা আগে আগে যাচ্ছিল। পেছনে মরালী। নীচেয় চবুতরে তাঞ্জাম তৈরি।
হঠাৎ গলার আওয়াজে একেবারে চমকে উঠেছে মরালী।
কে? কৌন হ্যায়?
বাঁদিটা পেছন ফিরতেই দেখলে মরিয়ম বিবি থমকে দাঁড়িয়েছে। কান্ত এতক্ষণ এই সুযোগটুকুর জন্যে বাইরে অপেক্ষা করছিল।
সামনে এসে বসলে তোমার বাঁদিটাকে একটু সরে যেতে বলল, একটা কথা আছে–
বাঁদিটা আড়ালে সরে গেল।
মরালী বললে–এবার বলো কী কথা? তাকে পেলে?
কাকে?
কাকে মনে নেই? তোমাকে অত করে বলে দিলুম–নবাব তার গান শুনতে চেয়েছে, তবু তোমার মনে থাকে না।
কান্ত বললে–তাকে খুঁজতেই তো গিয়েছিলুম মরালী। কিন্তু পাওয়া কি অত সোজা। এই তো এখন অনেক খুঁজে ফিরছি!
তা হলে পাওয়া যাবে না?
আবার যাব। কিন্তু একটা খবর শুনে তোমাকে বলতে এলুম। এই একটু আগে কাশিমবাজারের ওয়াট সাহেব আমাদের মনসবদার ইয়ার লুৎফ খা’র বাড়িতে গিয়ে ঢুকল।
ঢুকল তা কী?
না, এত রাত্তিরে পালকি চড়ে একজন বোরখা পরে ঢুকল দেখে খুব সন্দেহ হল। ভাবলাম মনসবদার সাহেবের বাড়িতে এই অসময়ে কে ঢোকে। আমিও ভাব করলাম সেপাইটার সঙ্গে। সেপাইটা বশির মিঞার খুব বন্ধু। শুনে বড় ভয় হল মরালী। শুনলাম তোমাকে খুন করবার জন্যে নাকি ওরা ষড়যন্ত্র করছে। কী হবে?
মরালী বললে–আমাকে খুন করবে?
হ্যাঁ মরালী, সেপাইটা ভেতরে গিয়ে চুপি চুপি শুনে এসে তাই বললে!
কিন্তু আমি কী করেছি যে আমাকে ওরা খুন করবে?
কান্ত বললে–তুমি যে সেদিন ক্লাইভ সাহেবের বাড়ি থেকে চিঠি চুরি করেছিলে! তোমার ওপর যে তাই ওদের রাগ। তোমার কথাতেই তো নবাব পলাশিতে রাজা দুর্লভরামকে দিয়ে ফৌজ পাঠিয়েছে। তোমার কথাতেই তো কাশিমবাজারের ফরাসিদের কুঠিতে নবাব সব ফরাসি উদ্বাস্তুদের থাকতে দিয়েছে। তোমার জন্যেই তো সকলের এত হেনস্থা! সব যে জানে সবাই!
মরালী আবার জিজ্ঞেস করলে–কী করে খুন করবে আমাকে? বিষ খাইয়ে?
কান্ত বললে–তা জানি না। মনসবদার সাহেব টাকা পেলে সব করতে পারে মরালী, ও সব করতে পারে! তুমি রোজ যে মতিঝিল থেকে রাত্তিরবেলা চেহেল্-সুতুনে যাও তা সবাই জানে। রাস্তায় যদি কোনওদিন কেউ কিছু করে ফেলে? আমার বড় ভয় করছে মরালী, তাই তোমাকে বলতে এলুম
ওয়াটস্ সাহেব কি এখনও মনসবদার সাহেবের বাড়িতে আছে?
কান্ত বললে–হ্যাঁ, বোধহয় আছে, আমি তো এই সেখান থেকেই আসছি
মরালী বললে–ঠিক আছে, তুমি যাও
বলে মরালী এগিয়ে গেল! কান্ত বললে–কোথায় যাচ্ছ?
মরালী বললে–মনসবদার সাহেবের বাড়িতে
বলে বাঁদির সঙ্গে মরালী তাঞ্জামে গিয়ে উঠল। কান্ত সেইখানেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। চেয়ে দেখলে তাঞ্জামটা ফটক দিয়ে বেরিয়ে ডান দিকে না গিয়ে বাঁ দিক বরাবর চলতে লাগল।
*
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের এই-ই প্রথম কালীঘাটে আসা নয়। তিনি কালীক্ষেত্রে এলে হালদারবংশে হুড়হুড়ি পড়ে যায়। এবার রামপ্রসাদ সেন সঙ্গে এসেছেন। নাটমন্দিরে একেবারে গানের বন্যা বয়ে গেছে। লোকে গান শুনে কেঁদে আর কুল পায়নি। বলেছে–আরও গান শুনব সেনমশাইয়ের
তা সেনমশাইকে বলতে হয় না কাউকে। তিনি ভক্তির আতিশয্যে গেয়ে গেয়ে বিভোর হয়ে ওঠেন। দূর দূর থেকে লোকে গান শুনে ভিড় জমাতে আসে। শুধু লোক নয়, ভিখিরিদের ভিড় জমে ওঠে। তারা প্রসাদ পায়, ভিক্ষেও পায়। পুজোরি বামুনরা সিধে পায়, দক্ষিণেও পায়। আবার কবে মহারাজ আসবেন, কে বলতে পারে। সে কালীঘাট তো আর নেই এখন। এখন ফিরিঙ্গি কোম্পানি আসার পর থেকে যাত্রী বেড়েছে বটে, আগের চেয়ে আয়ও ভাল হচ্ছে বটে, কিন্তু যে রকম দু’দুটো লড়াই হয়ে গেল, তারপর আর কি কারও বিশ্বাস থাকে! সারা কলকাতাটা তো একবার পুড়ে ছারখার হয়ে গিয়েছিল। আগুনটা আর একটু দক্ষিণ ঘেঁষে লাগলেই একেবারে মায়ের মন্দিরে আঁচ লাগত।
তারা বলে সেবারে মা-ই বাঁচিয়ে দিয়েছেন মহারাজ
