শুনলে ভাববে নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা শুধু নবাবই নয়, নবাব মানুষও বটে!
তা শুনলে আপনার লোকসান হবে আলি জাঁহা! লোকে আপনাকে আর ভয় করবে না!
নবাব বললে–ভয় না করুক, ভাল তো বাসবে। আমি তো এখন থেকে ভালবাসাই চাই বেগমসাহেবা!
তারপর একটু থেমে বললে–কিন্তু তুমি আমার কথাটা এড়িয়ে যাচ্ছ বেগমসাহেবা, বলল, কী করলে তুমি খুশি হবে বেগমসাহেবা।
মরালী বললে–আমাকে খুশি করা আলি জাঁহার সাধ্য নয়।
কী বলছ তুমি বেগমসাহেবা? জানো, আমি বাংলার নবাব, আমি হুকুম করলে বাংলার এক প্রান্ত থেকে আর-এক প্রান্ত এখনই কেঁপে উঠবে!
তা হোক, আমি তাতে খুশি হব না আলি জাঁহা। খোদাতালারও সাধ্য নেই আমাকে খুশি করে!
কী বলছ তুমি বেগমসাহেবা? তোমার এত কষ্ট?
মরালী বললে–হ্যাঁ আলি জাঁহা
নবাব কিছুক্ষণ চেয়ে রইল মরালীর দিকে। তারপর বললে–তা হলে আমি তোমার এত বড় ক্ষতি করেছি বেগমসাহেবা–আমি তোমাকে এত কষ্ট দিয়েছি?
মরালীর চোখ দিয়ে তখন ঝরঝর করে জল পড়ছে। নবাব তাড়াতাড়ি মরালীর ওড়নি দিয়ে তার চোখ দুটো মুছিয়ে দিতে যেতেই মরালী মুখটা ঘুরিয়ে নিজেই নিজের চোখ দুটো মুছতে লাগল।
নবাব উঠে বসে মরালীর সামনে ঝুঁকে পড়ল।
বললে–জানো, বেগমসাহেবা, তুমিই আমার সামনে প্রথম কাঁদতে পেলে? এই প্রথম কেবল তোমাকেই আমার সামনে কাঁদতে দিলুম–
আমার কসুর মাফ করুন আলি জাঁহা! আমি আর কখনও কঁদব না, এই আমি হাসছি–এই হাসছি–
নবাব বলতে লাগল–এতদিন তোমার সব কথা শুনে এসেছি বেগমসাহেবা। তুমি যা বলেছ তাই করেছি। তোমার কথাতে আমি রাজা দুর্লভরামকে দিয়ে ফৌজ পাঠিয়েছি পলাশিতে তোমার কথাতেই আমি কাশিমবাজারের ফরাসি কুঠি রাখতে দিয়েছি। কারণ তুমিই প্রথম আমাকে ঘুম পাড়িয়েছ! কিন্তু কেন আবার আমার মন খারাপ করে দিলে? কেন আমার সামনে তুমি কাদলে? আজ কি আর আমার ঘুম আসবে?
মরালী বললে–আপনি নিজের ঘুমের কথাই ভাবছেন, কিন্তু আর কেউ ঘুমোয় কিনা তা কি কখনও ভেবেছেন? কখনও কি জানতে চেষ্টা করেছেন আপনার চেয়েও আরও বড় দুঃখ কারও আছে কিনা?
নবাব বললে–আমি তো তাই বলছি আমি প্রায়শ্চিত্ত করব। তোমার ওপর যত অত্যাচার হয়েছে আমি তা দূর করব! বলল, আমি কী করলে তুমি খুশি হবে!
মরালী বললে–আমি তো বলেছি আলি জাঁহা, আমাকে খুশি করা আপনার সাধ্য নয়
কিন্তু আমিই তো তোমাকে তোমার স্বামীর কাছ থেকে চুরি করে এনে চেহেল্-সুতুনে পুরেছি!
চেহেল্-সুতুনে এনে আপনি আমাকে বাঁচিয়েছেন আলি জাঁহা!
নবাব অবাক হয়ে গেল। সেকী?
হ্যাঁ, আলি জাঁহা। আপনি না নিয়ে এলে আমার আরও কষ্ট হত। এখানে এনে আপনি আমাকে বাঁচিয়েছেন!
কিন্তু এ কথা তো এতদিন আমাকে বলোনি? আমি তা হলে তোমার ক্ষতি করিনি?
মরালী বললে–না
তা হলে কি তোমার উপকার করেছি?
হ্যাঁ!
নবাব আরও অবাক হয়ে গেল। মরালী বললে–আপনি আমাকে এখানে না নিয়ে এলে আমার সর্বনাশ হয়ে যেত আলি জাঁহা। আপনি আমাকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন বলেই আমি বেঁচে গিয়েছি। নইলে হয়তো এতদিনে আমায় গলায় দড়ি দিতে হত। আমাকে কেউ দেখতে পেত না আর! আমি তো ভেবেছিলুম গলায় পাথর বেঁধে নদীতে ঝাঁপ দেব, নয়তো আগুনে পুড়ে মরব–
সেকী? তা হলে তুমি কি তোমার স্বামীকে ভালবাসতে না?
মরালী বললে–আমার পোড়া কপালে আরও অনেক দুঃখ আছে আলি জাঁহা—
সত্যিই তুমি ভালবাসতে না তোমার স্বামীকে?
মরালী বলে–ভালবাসতে পারলে তো বেঁচে যেতুম আলি জাঁহা! কিন্তু আমার যে পোড়া কপাল। আমার কপালে যে ছাই লেখা আছে–
কী বলছ তুমি বেগমসাহেবা! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না—
মরালী বললে–আমার কথা কেউই বুঝবে না আলি জাঁহা। বিয়ে হয়েও আমি স্বামী পেলুম না, স্বামী পেয়েও আমি তার বউ হতে পারলুম না–
নবাব বললে–তুমি আমাকে অবাক করলে বেগমসাহেবা, আমি তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না–
শুধু আপনি কেন আলি জাঁহা, কেউ আমার কথা বুঝতে পারবে না। আমার বিয়ে হয়েছে তবু আমি কারও স্ত্রী হতে পারিনি, আমি স্ত্রী হয়েছি তবু কেউ আমার স্বামী হতে পারেনি
নবাব অনেকক্ষণ পরে বললে–তুমি কি জাদু জানো বেগমসাহেবা?
কেন অমন করে বলছেন আলি জাঁহা!
নইলে কেন এমন করে আমাকে ভুলিয়ে দাও? কেন এমন করে লোভ দেখাও? আমি তো সকলের সব কথাতেই রাজি হচ্ছি, আমি তো সকলের সব অপরাধই ক্ষমা করছি। উমিচাঁদকেও ক্ষমা করেছি, নন্দকুমারকেও ক্ষমা করেছি। তাদের সব অপরাধ ভুলে গিয়ে আমি তাদের ছেড়ে দিয়েছি। ভেবেছিলাম এবার থেকে ভালবেসে দেখব কেউ আমাকে ভালবাসে কিনা। কিন্তু তুমি তো আমার সব গোলমাল করে দিলে বেগমসাহেবা!
মরালী বললে–কেন আলি জাঁহা? আমি আপনার কী করলাম?
তুমি? তুমিই তো আমাকে রামপ্রসাদ সেনের গান শোনালে! তুমিই তো আমাকে কোরান পড়ালে! আমি যে তোমাকে ভালবাসতে আরম্ভ করেছিলাম।
মরালী বললে–আমার ভয় হচ্ছে আলি জাঁহা, আজকে বোধহয় আপনার আর ঘুম আসবে না–
না আসুক, ঘুম না-আসা আমার নতুন নয়।
মরালী বললেন আলি জাঁহা, আপনার ঘুম না এলে যে আমার ঘুম আসবে না।
নবাব বললে–তুমি যাও বেগমসাহেবা। চেহেল্-সুতুনে চলে যাও, সারাফত আলির আরক খেয়ে ঘুমোও গে, যাও। আর তা ছাড়া তোমার ঘুম না এলে আমার কী! তুমি তো আমাকে ভালবাসোনা
মরালী বললে–মেয়েমানুষ কি দু’বার ভালবাসে আলি জাঁহা? দুবার ভালবাসতে পারে?
