তা মরিয়ম বেগম কি লড়াই চায় কোম্পানির সঙ্গে?
চায় বলেই তো মনে হচ্ছে।
তা হলে তো কর্নেল ঠিকই করেছেন। এখন তো কর্নেলের ম্যাড্রাস যাওয়া চলে না।
ওয়াটস চুরোটের ধোঁয়া ছেড়ে বললে–না, সে-ভয় নেই
কেন?
কর্নেল বোধহয় জানে না। মরিয়ম বেগম আর বেশি দিন নেই।
তার মানে?
ওয়াটস্ বললে–আমি সেই জন্যেই আজ সব বন্দোবস্ত করতে যাচ্ছি। আজ মিডনাইটে আমি আড়াই হাজারি মনসবদার ইয়ার লুৎফ খাঁ’র বাড়িতে যাচ্ছি–
ইয়ার লুৎফ খাঁ সাহেব কি আমাদের ফেবারে?
ওয়াটস্ সাহেব বললে–টাকা দিলে সব ইন্ডিয়ান আমাদের ফেবারে। সবাই টাকা চায়–টাকা দিলে সবাই আমাদের জন্যে সবকিছু করতে পারে। নন্দকুমার যেমন আমাদের চন্দননগরের ব্যাপারে নিউট্রাল থেকেছে, তেমনই আরও বেশি টাকা দিলে যে-কেউ মরিয়ম বেগমকে মার্ডার পর্যন্ত করতে পারে!
ফ্লেচার চমকে উঠল-ইয়ার লুৎফ খাঁ কি নিজেই মার্ডার করবে বেগমসাহেবাকে?
সে-সব কথা এখন বলব না ফ্লেচার। আজ নাইটটা তুমি কুঠিতে থাকো, কাল আর্লি মর্নিংয়ে তোমায় বলব। কর্নেলের চিঠিও তোমার হাতে দিয়ে দেব সেই সঙ্গে
*
ওদিকে তখন মতিঝিলের ভেতর গোলাপি আতরের গন্ধে নবাবের মেজাজ অনেকদিন পরে খুশ হয়েছে। মরিয়ম বেগমসাহেবা নিজের হাতে ধূপ জ্বেলে দিয়েছে দরবার-ঘরে। বড় ভাল লাগছে গন্ধটা।
নবাব বললে–ভাল করেছ বেগমসাহেবা, ধূপের গন্ধটা আমার খুব ভাল লাগে
তা জানি আলি জাঁহা দেখবেন আজকেও আপনার ঘুম আসবে
নবাব বললে–আজ কদিন ধরেই তো খুব ঘুমোচ্ছি বেগমসাহেবা। অনেক দিন পরে এমন করে রাত্রে ঘুমোতে পাচ্ছি–তুমি আমার কাছে থাকলেই আমার ঘুম আসে–
আমি রোজ ধূপ জ্বেলে দিতে বলব খিদমদগারকে।
নবাব বললে–ধূপ জ্বেলে দিক, কিন্তু তোমাকে আমার সঙ্গে এখানে থাকতে হবে বেগমসাহেবা।
মরালী এক-পা পিছিয়ে এল। বললে–ছিঃ, আলি জাঁহা কি অত ছোট?
কেন বেগমসাহেবা? আমি ছোট নই একথা তোমাকে কে বললে? আমি তো লম্পট
লম্পট আর যে বলে বলুক, আমার কাছে আপনি অনেক বড় আলি জাঁহা
নবাব চোখ দুটো বড় করে বললে–বেগমসাহেবা, তুমি দেখছি আমাকে ভালবাসছ? তুমি যে আমাকে অবাক করে দিলে গো!
কেন, আপনি কি কারও ভালবাসা পাননি আলি জাঁহা?
নবাব বললে–ভালবাসা? হয়তো পেয়েছি হয়তো পাইনি। কিংবা হয়তো পেলেও তা জানতে পারিনি। ভেবেছি, আমার টাকার জন্যেই হয়তো সবাই আমায় ভালবাসে!
মরালী বললে–আর আমি? আমি বুঝি আপনার টাকা চাই না?
তুমি?
নবাব কী যেন ভাবলে। তারপর বললে–তা-ও তো বটে! সবাই-ই যখন আমাকে আমার টাকার জন্যে ভালবাসে তখন তুমিই বা অন্যরকম হতে যাবে কেন! তুমিই বা আমায় কী দেখে ভালবাসবে? আমার তো কোনও গুণ নেই। আমি লম্পট, আমি নীচ, আমি গোঁয়ারগোবিন্দ! একমাত্র টাকা ছাড়া আমার দেবার মতো আর কী-ই বা আছে বলো?
মরালী এবার আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসল। নবাবের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললে–আলি জাঁহা যদি সত্যিই ভালবাসার এত কাঙাল তো এটা কি জানেন না যে, ভালবাসা পেতে গেলে ভালবাসা দিতেও হয়?
নবাব বললে–তা হলে তোমাকে সত্যি কথাই বলি বেগমসাহেবা, ভালবাসা যে কী জিনিস তা আমি জানি না। ছোটবেলা থেকে ভালবাসা কেউ আমাকে শেখায়নি। তুমি বিয়ে করেছ, তুমি তোমার স্বামীকে ভালবেসেছ, তোমার স্বামীও তোমাকে নিশ্চয় ভালবেসেছে–ভালবাসার ব্যাপারটা তুমি আমার চেয়ে হয়তো বেশি জানো। বলো তো, ভালবাসা কাকে বলে!
মরালী বললে–একটা কথা বলুন তো আলি জাঁহা, আপনি আপনার মসনদকে ভালবাসেন তো?
তা বাসি। কিন্তু সে তো অন্যরকম।
যে রকম ভালবাসাই হোক, মসনদ ছাড়তে তো আপনার কষ্ট হয়। কেউ যদি আপনার মসনদ কেড়ে নেয় তো আপনার মনে তো দুঃখ হয়। হয় না?
নবাব বললে–তা হয়।
তা হলে আপনি যত মেয়েকে কেড়ে নিয়ে এসে চেহেল-সুতুনে পুরেছেন, সেই মেয়েদেরও যে স্বামীকে ছেড়ে আসতে কষ্ট হয়, তা তো বোঝেন?
নবাব চাইলে মরালীর দিকে। বললে–তা হলে তোমাকেও কি খুব কষ্ট দিয়েছি বেগমসাহেবা? তুমি কি এখনও তোমার খসমকে ভুলতে পারোনি হলে?
মরালী বললে–আপনি সে বুঝবেন না আলি জাঁহা।
কেন বুঝব না বেগমসাহেবা? তুমি বলো না, তুমি বুঝিয়ে দিলেই আমি বুঝব!
মরালী বললে–সে-সব-শুনলে আজ রাত্তিরে তা হলে আর আপনার ঘুম আসবে না।
না না, তুমি বলো বেগমসাহেবা, বলো তুমি! আমি শুনব।
মরালী বললে–আমরা মেয়েমানুষ, আমরা দু’বার ভালবাসতে পারি না।
নবাব খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বললে–আমায় ক্ষমা করো বেগমসাহেবা, আমি তোমার ওপর খুব জুলুম করেছি। আমাকে তুমি মাফ করো।
মরালী বললে–ছিঃ আলি জাঁহা, আপনি না বাংলার নবাব—
তোমার কাছে আমি নবাব নই বেগমসাহেবা, এই এখন আমি আর নবাব নই।
তা হোক, আপনার মসনদ সকলের আগে, তারপর আমি।
না না বেগমসাহেবা, মসনদ টসনদের কথা এখন আর আমাকে মনে করিয়ে দিয়ো না। এখন আর ওসব কথা শুনতে ভাল লাগছে না। এখন শুধু তুমি তোমার কথা বলল। আমি আর কোনও কথা শুনব না। বলো, আমি তোমার জন্যে কী করব? কী করলে তুমি আবার খুশি হবে?
মরালী বললে–কেন আলি জাঁহা ওসব কথা তুলছেন?
কেন তুলবনা বেগমসাহেবা? আমি যদি অন্যায় করে থাকি তো সেকথা তুলতে দোষটা কী? আমি যদি পাপ করে থাকি তো সে-পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে আপত্তি কী?
মরালী বললে–কেউ যদি আপনার কথা এখন এই সময়ে শুনতে পায় আলি জাঁহা?
