লোকে ঘাটে গিয়ে মাঝিমাল্লা দেখলেই জিজ্ঞেস করে–ফরাসডাঙার খবর কিছু জানো নাকি গো তোমরা?
আসলে কে কার খবর রাখে? আর খবর রেখেই বা লাভ কী? ততক্ষণ গাঁয়ের হরিসভায় গিয়ে হরিনাম শুনলেই পরকালের কাজ হয়। তুমি আমি খবর রেখে তো কিছু উপকার করতে পারব না হে কারও। নিজেরও উপকার করতে পারব না, পরেরও নয়। তার চেয়ে এই-ই ভাল। এই চাষবাস করে, গান গেয়ে আর কাঁসি বাজিয়ে। কাশিমবাজারে ফরাসডাঙা থেকে দলে দলে সব ফরাসিরা এসে উঠেছে। কুঠিতে। সঁসিয়ে ল’ তাদের কাছে সব গল্প শোনে। পুরো ফরাসডাঙাটাই নাকি একেবারে গুঁড়িয়ে ধুলো হয়ে গেছে। অত বড় কেল্লা ফোর্ট ডি’অরলিনস–তার একখানা ইটও নাকি আর আস্ত নেই।
ওয়াটস এসে উঠেছিল নিজেদের কুঠিতে; ইংরেজদের কুঠি থেকে খুব বেশি দূর নয় ফরাসিদের কুঠি। ওয়াটস চুরোট খায় নিজের কুঠিতে বসে আর খবরগুলো শোনে। কিন্তু পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা। রাখে দিনরাত। ফিরিঙ্গি সেপাইরা দিনরাত বন্দুক নিয়ে পাহারা দেয় কুঠির সামনে! মঁসিয়ে ল’কে বিশ্বাস নেই। কবে কী মতিগতি হয় কে জানে?
রাত্তিরবেলা সব চুপচাপ থাকে। গঙ্গায় এদিক-ওদিক থেকে নৌকো বজরা-বোট যাতায়াত করে। সেদিকে ওয়াটস সাহেবের পাহাদারদের কড়া নজর থাকে। কোন দিক থেকে কখন কে এসে অ্যাটাক করে ঠিক নেই। চন্দননগরের পালিয়ে আসা ফরাসিদের নবাব শেলটার দিয়েছে, এটা ভাল কাজ হয়নি।
সেদিন অনেক রাত্রে কুঠিতে এসে হাজির হল ফ্লেচার।
ফ্লেচার কর্নেলের লোক। এখানে-ওখানে খবর নিয়ে আসা-যাওয়া করে। অনেক দূর থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে এনেছে। কুঠিতে ঢুকেই হাঁপাতে লাগল।
কিন্তু ওয়াটস্ সাহেবের সামনে এসে বেশ খুশি হয়ে কথা বলতে লাগল।
কী খবর ফ্লেচার? কর্নেলের খবর কী?
সব ভাল খবর স্যার। চন্দননগর কার করে ফেলেছি আমরা।
কর্নেল ক্লাইভের ম্যাড্রাস ফিরে যাবার কথা ছিল। ওয়াটও সেই কথা জানত। বেচারি রাইটার হয়ে এসেছিল ইন্ডিয়ায়। অনেক দিন আছে। গড়গড় করে বাংলা বলে, ফারসি বলে। হিন্দুস্থানিও বলে। গোড়া থেকে ইন্ডিয়ায় থেকে থেকে অনেক কিছু শিখেছে। তাই ওয়াটসের ওপর লন্ডনের অনেক আস্থা। বাংলার নবাবের নাড়িনক্ষত্র জেনে ওয়াটস্ এইটুকু বুঝেছে যে নবাবের যারা আমির-ওমরাহ, যারা নবাবের মিনিস্টার, তারা কেউ নবাবের ফেবারে নয়। ওই আড়াই হাজারি মনসবদার ইয়ার লুৎফ খা, কিংবা মিরজাফর আলি খাঁ, কিংবা জগৎশেঠ, উমিচাঁদ, সবাই নবাবকে হটিয়ে নবাব হতে চায়। আসল কাজ যখন হয়ে গেছে, যখন চন্দননগরের ফোর্ট অকুপাই করা হয়ে গেছে, তখন কর্নেলের আর বেঙ্গলে না-থাকলেও ক্ষতি নেই। এখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সেফ। এখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আস্তে আস্তে নবাবকে হাতের মুঠোর মধ্যে পুরে ফেলতে পারবে! ফ্রেঞ্চ নেই, ডেনরা নেই, ডাচরা নেই, পর্তুগিজরাও নেই। থাকলেও তাদের কোনও পাওয়ার নেই।
কিন্তু ফ্লেচার যা বললে–তা উলটো কথা।
কর্নেল ক্লাইভ আর্মি নিয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে এগিয়ে হুগলির মাঠে ক্যাম্প করে রয়েছে।
কেন?
ফ্লেচার বললে–সেই কথা বলতেই আমি এসেছি স্যার–যদি নবাব ইংরেজদের অ্যাটাক করে তার জন্যে রেডি থাকতে হবে! হিয়ার ইজ দি লেটার ফ্রম কর্নেল
ওয়াট চিঠিটা নিয়ে পড়লে। পড়ে খানিকটা হাসলে মনে মনে।
তারপর বললে–কিন্তু নবাবকে ভয় পাবার এত কী দরকার? কর্নেল কি জানে না যে নবাবের। ওয়ার করবার ইচ্ছেই নেই?
তা হলে স্যার রাজা দুর্লভরাম কেন আর্মি নিয়ে পলাশিতে ওয়েট করছে?
সে তো নবাবের বেগমের পরামর্শে!
নবাবের বেগম?
ওয়াটস বললে–হ্যাঁ, সে আমি খবর পেয়েছি। নবাব যেদিন চন্দননগর অ্যাটাকের খবর পেলে সেই দিনই মরিয়ম বেগম মতিঝিলে গিয়েছিল। আমি সব খবর পেয়েছি। নইলে নবাব তো আমাদের টার্মস অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের কিছু টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে–
তা হলে আপনি ওই কথাটা লিখে দিন স্যার কর্নেলকে। কর্নেল শুনে খুশি হবে!
ওয়াটস বললে–আমি লিখে দিচ্ছি, কিন্তু তুমি মুখে তাকে বোলো এইসব কথা। বোলো, নবাবকে আর আমাদের ভয় করবার দরকার নেই। শুধু মরিয়ম বেগম নবাবকে তাতাচ্ছে–ওই মরিয়ম। বেগমকে শায়েস্তা করলেই কাজ হাসিল হয়ে যাবে এই দেখো না, নবাবের চিঠির কপি তো আমার কাছেও রয়েছে
বলে নবাবের চিঠির কপিটাও দেখালে। কপিতে লেখা আছে–আমি অঙ্গীকৃত টাকা প্রায় শোধ দিয়াছি, সত্বরই অবশিষ্ট প্রদত্ত হইবে। আমি সন্ধির নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে পালন করিতেছি, কিন্তু আপনাদের পক্ষে সেরূপ দেখি না। ইংরেজ সৈন্যের উৎপাতে হুগলি, হিজলি, বর্ধমান ও নদীয়া ত্রস্ত হইয়াছে। কালীঘাট কলিকাতার জমিদারি বলিয়া দাবি করা হইয়াছে। এ সমস্ত যে আপনার জ্ঞাতসারে হইয়াছে, তাহা আমার বিশ্বাস হয় না। যাহা হউক, পরস্পরের মধ্যে যে বন্ধুভাবের অঙ্কুর হইয়াছে তাহার পোষণ করাই কর্তব্য। শুনিলাম ফরাসিরা আপনাদের সহিত যুদ্ধ করিবার জন্য দক্ষিণাপথ হইতে ফৌজ পাঠাইয়াছে। কিন্তু তারা আমার রাজ্যে বিবাদ উপস্থিত করিবার ইচ্ছা করিলে আমাকে লিখিবামাত্র সিপাহি-সৈন্য পাঠাইয়া তাহাদিগকে নিরস্ত করিব।
ফ্লেচার বললে–কিন্তু এই লেটার লেখার পরেও কেন নবাব আর্মি পাঠালে রাজা দুর্লভরামের সঙ্গে?
ওই তো বললুম, মরিয়ম বেগমের পরামর্শে!
