কিন্তু খিদমদগার নকলচিকে নিয়ে ফিরে আসবার আগেই আর এক খবর নিয়ে এল খিদমদগার।
খোদাবন্দ, মিরবকশি মোহনলাল দরবারে হাজির।
ক্যা?
দু’বার করে জবাব দিতে হল তবে যেন নবাবের কানে গেল কথাটা। বললে–দরবারে নিয়ে এসো
তারপর মোহনলাল যে-খবর নিয়ে এল তা যেমন মর্মান্তিক তেমনই উত্তেজক। ইংরেজ ফৌজ হামলা করেছে চন্দননগরে। লড়াই ফতে হয়ে গিয়েছে। কর্নেল ক্লাইভ ফরাসডাঙার কেল্লার নিশেন নামিয়ে দিয়ে তার ওপর ইউনিয়ন জ্যাক উড়িয়ে দিয়েছে।
সঙ্গে সঙ্গে নবাব লাফিয়ে উঠেছে। সাতাশ বছরের পাঠানি রক্ত যেন টগবগ করে উঠল। তা হলে হুগলির ফৌজদার কোথায়? উমিচাঁদ কোথায়? মুনশি নবকৃষ্ণ কোথায়? তাদের কে যেতে দিলে মুর্শিদাবাদ ছেড়ে? মিরজাফর আলি সাহেব কোথায়? ডাকো তাকে আমার সামনে। আমি সকলকে কোতল করব। দিল্লির বাদশার সনদ পাওয়া নবাব আমি, মেরা হুকুম কেঁউ বদল কিয়া উস লোগে নে? আর, কাশিমবাজার কুঠির ওয়াটস? মঁসিয়ে ল? উন লোগে কো ভি আবভি বোলাও
চেহেলসূতুনেও খবরটা পৌঁছোল। মরালী একটু নিশ্চিন্ত ছিল। কিন্তু খবরটা পেয়েই পিরালি খাঁ-কে ডেকে পাঠাল–মেরা তাঞ্জাম তৈয়ার করো, ম্যায় মতিঝিল যাডঙ্গি–আবভি
মরালীর বাঁদিও হঠাৎ হুকুম পেয়ে বেগমসাহেবার পেশোয়াজ বার করে দিলে, ওড়নি বার করে দিলে, কঁচুলি, ঘাগরা পৈজেঁড় বার করে দিলে। হুলস্থুল পড়ে গেল চেহেল্-সুতুনেআবার মরিয়ম বেগমসাহেবা নবাবের কাছে যাবে। রাত্রে একসঙ্গে কাটিয়েও তার গরম কাটেনি বুঝি রে!
*
হালিসহরের কবির গান শুনতে শুনতে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র যখন ত্রিবেণীর ঘাটে গিয়ে পৌঁছোল, তখন খবর এসে পৌঁছোল ইংরেজ ফৌজ ফরাসডাঙার কেল্লা দখল করে নিয়েছে।
ছোটমশাই অনেক আশা করেছিল কলকাতায় গিয়ে এবার মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে নিয়ে ক্লাইভ সাহেবের কাছে যাবে। ক্লাইভ সাহেব চেষ্টা করলেই নবাবের হারেম থেকে ছোট বউরানিকে উদ্ধার করে দিতে পারে।
মহারাজ বলেছিল কিন্তু এর পরেও কি বউমাকে ঘরে ফিরিয়ে নিতে পারবেন আপনি ছোটমশাই!
ছোটমশাই বলেছিল–সে লোকে যা বলে বলুক, না-হয় প্রায়শ্চিত্তই করব, ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ডেকে যা বিধান দেন তারা তাই-ই না-হয় করব!
মহারাজ সব শুনে বলেছিল–যা শুনছি তাতে তো মনে হয় বউমাকে মোল্লারা একেবারে জাদু করেছে
কী রকম?
মুর্শিদাবাদের মসনদ তো এখন বউমাই চালাচ্ছে। বউমার কথায় নাকি নবাব ওঠেন বসেন! দেখলেন তো নবাবের শ্যামাসংগীত শোনবার বহরটা। দেখেছিলেন, রামপ্রসাদের গান শুনতে শুনতে নবাবের চোখ দিয়ে কেমন ঝরঝর করে জল পড়ছিল? একটা উর্দু গজল পর্যন্ত শুনতে চাইলে না, শুধু শ্যামাসংগীত! বউমা না হলে এ আর কারও সাধ্যি ছিল।
গোপালবাবু বললে–তা হলে মোল্লারা আর কী করে জাদু করলে মহারাজ, আমাদের ছোট বউরানিই তো মোল্লাদের জাদু করেছে মনে হচ্ছে
মহারাজ বললে–না গোপালবাবু, মনে হচ্ছে মোল্লারাই বউমাকে জাদু করেছে। নইলে বউমার কানে তো গিয়েছিল যে তার স্বামী আমার বজরায় আছেন, তবু কেন গান শোনবার ছল করে নবাবের সঙ্গে এলেন না?
ছোটমশাই বললে–না মহারাজ, বেগম হয়ে কী করে আপনার বজরায় আসে সে? আসলে তো জাত গেছে। ভেবেছে আমি বুঝি তাকে আর গ্রহণ করব না
সত্যিই তো, আপনিই বা তাকে গ্রহণ করবেন কী করে?
ছোটমশাই বললে–আপনি পথ বলে দিন আমি তাকে কেমন করে গ্রহণ করব? আপনি হলেন নবদ্বীপের মহারাজ, পণ্ডিতদের বিধানদাতা। আপনি যা বলবেন আমি তাই করতেই রাজি। যদি বলেন তো আমি না-হয় মুসলমানই হব বউয়ের জন্যে
খবরটা ঠিক এই সময়েই এসে পৌঁছোল। ইংরেজরা ফরাসডাঙা দখল করে নিয়ে নিয়েছে।
মহারাজ খবরটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বললে–আচ্ছা, আগে তো কালীঘাটে যাওয়া যাক, তারপর ভেবে দেখা যাবে কী করব—
.
চন্দননগর যখন ফরাসডাঙা ছিল এ সেই তখনকার কথা। একদিন ১৬৬৮ সালে ফরাসিরা জাহাজে করে এসেছিল ওই ফরাসডাঙায়। প্রথমে জলাজমি ছিল, তারপর বসতি হল। পাকা বসতবাড়ি হল, কেল্লা উঠল। ডুপ্লের আমলে সেই চন্দননগরের বাড়বাড়ন্ত দেখে কে! তখন কলকাতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে চন্দননগর। দেখে ইংরেজরা কপালে চোখ তুলেছে। হিন্দুস্থানে অমন ভাল ভাল বাড়ি কোথাও আছে নাকি! ফরাসিদের জাহাজ নানা দেশ থেকে মাল কিনে নিয়ে আসে। জেদ্দা মক্কা, বসোরা, চায়না, পেগু সব জায়গা ঘুরে ঘুরে হুগলি নদীতে এসে থামে জাহাজগুলো।
তা গোলাবারুদ কামান সবকিছু গিয়েছিল জাহাজে। আর হাজার হাজার সেপাই গিয়েছিল হাঁটাপথে। ফোর্ট ডি’অরলিনস্ শুধু কেল্লা নয়, ফরাসি ক্ষমতার প্রতীক ফোর্ট ডি’অরলিন খোঁজা ওয়াজিদ ফরাসিদের সঙ্গে কারবার করে মোটা মোটা টাকা উপায় করছে তখন। জগৎশেঠজি ফরাসিদের সাড়ে সাত লাখ টাকা ধার দিয়ে মোটা সুদ আদায় করছেন। ফরাসিদের সঙ্গে ইংরেজদের লড়াই হলে তাদেরও তো মোটা লোকসান।
কিন্তু যুদ্ধ যখন বেধে গেলই, তখন আর তা হজম করা ছাড়া উপায় নেই।
যতই দিন যেতে লাগল, ততই বড় খারাপ খবর কানে আসতে লাগল। কেউ বলে, ইংরেজদের বোমা লেগে ফরাসিদের কেল্লা একেবারে গঙ্গায় ধসে পড়েছে
কেউ বলে, ইংরেজদের গুলিতে ফরাসিরা মরে গঙ্গায় ভাসছে।
যারা ওদিকে নৌকো নিয়ে মাল বেচা-কেনা করতে যায় তারা যেসব খবর আনে তা শুনে লোকে চমকে ওঠে। তবে কি ইংরেজ আর ফরাসিতে লড়াই মারামারি করে বেটারা কুপোকাত হবে নাকি?
