তোমার জীবন বলি দিতে হবে।
হঠাৎ চোখের সামনে একটা ধারালো ছোরা চকচক করে উঠল। আর সঙ্গে সঙ্গে একটা নিষ্ঠুর আর্তনাদে নবাব মির্জা মহম্মদের ঘুম ভেঙে গেল। ইনসাফ মিঞা তখন ভৈঁরো ঠাটের আলাপ ধরেছে। নহবতে। মীড় আর মূৰ্ছনা, গমক আর তান সমস্ত কিছু মিলিয়ে একটা কথাই হেলেদুলে বলতে চাইছে ভোর হল, এবার ওঠো নবাব, পুবের আসমানে আপতা তুলু হয়েছে, এবার ধুপ উঠবে, নতুন দিনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে তোমার কিসমত পরীক্ষা হবে। দেখব কেমন করে তুমি নতুন সর্বনাশের মুখোমুখি হও। দেখব রামপ্রসাদের গান শুনে তুমি যে শিক্ষা পেলে কেমন করে তুমি তা কাজে লাগাও!
মতিঝিলের দরবারে সবাই সেদিন নবাবের চেহারা দেখে অবাক হয়ে গেল। এমন মর্জি এমন মেজাজ বহুদিন কেউ দেখতে পায়নি। মুনশি নবকৃষ্ণ, উমিচাঁদ, হুগলির ফৌজদার নন্দকুমার, তারা হাজির।
নবাব তাদের তিনজনকে লক্ষ্য করেই বললে–তোমাদের সবাইকে ছেড়ে দিলাম উমিচাঁদ-
-তিনজনেই মাথা নুইয়ে মনের কৃতজ্ঞতা জানালে।
ভেবো না তোমাদের অপরাধের বদলা আমি নিতে পারতাম না। কিন্তু কসুর আমিও করেছি–
সবাই নবাবের আত্মদোষ স্বীকার শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল।
হ্যাঁ, কসুর আমিও করেছি। শুধু আমি একলা করিনি। আমার পিতা, আমার পিতামহ, আমার প্রপিতামহ, আমার বৃদ্ধ-প্রপিতামহ, সবাই কসুর করেছি। শাস্তি যদি কাউকে নিতেই হয় তো সে-শাস্তি তোমাদের সঙ্গে আমাকেও নিতে হবে। আমিও সেই শাস্তির হকদার। সে শাস্তি আমি নেবই। যেদিন তোমাদের শাস্তি দেব, সেদিন তোমাদের সকলের সঙ্গে আমিও সে-শান্তি নেব। ঐশ্বর্য-বিলাস-আড়ম্বর ওসব কিছু নয় উমিচাঁদ। একদিন যেমন নবাব সুজাউদ্দিন চলে গেছে, তেমনই আমিও চলে যাব। একদিন যেমন নবাব আলিবর্দি চলে গেছে, তেমনই একদিন আমিও যাব। মাঝখানের এই কটা দিনের যন্ত্রণা নিয়ে যেমন তোমাদের সকলের জীবন, তেমনই আমারও জীবন। অহংকার করতে নেই, অত্যাচার করতে নেই, অনিয়ম করতে নেই। রিপুর কুমন্ত্রণা শুনোনা উমিচাঁদ, ও তোমায় অনিদ্রা দেবে, অশান্তি দেবে, অন্তরায় দেবে। এই যা দেখছ, এ সবকিছুই অনিত্য, এ সবকিছুই অসার। সার যদি কিছু থাকে তো সে মুহব্বত। এই দুনিয়ার সমস্ত কিছুকে মুহব্বত করতে শেখো উমিচাঁদ, তাতেই তোমার শান্তি আসবে, তাতেই তোমার নিদ্রা আসবে–
বাইরে বেরিয়ে ফৌজদার সাহেব উমিচাঁদের দিকে তাকাইলে।
নবাব হঠাৎ তাজ্জব বাত বলতে লাগল কেন আজ?
মুনশি নবকৃষ্ণও অবাক হয়ে গেছে। বললে–নবাব লোকটা তো তেমন বদ মানুষ নয় ফৌজদারসাহেব!
উমিচাঁদ হাসল।
বললে—নবাব-বাদশাদের অমন পাগলামি হয় মাঝে মাঝে। ও-সব শয়তানি। বাদশা ওরঙ্গজেবের ওইরকম হত। শয়তানি করে আমির-ওমরাওদের সামনে মক্কায় চলে যাবে বলে ভয় দেখাত
শুধু উমিচাঁদ নয়, নন্দকুমার, নবকৃষ্ণই নয়–মতিঝিলের সমস্ত কর্মচারীও ভাবতে শুরু করেছিল–নবাবের আজ এ কী হল? নবাব তো কোনওদিন এমন করে হাসে না। হেসে কথা কয় না! এমন করে মতিঝিলে এসে ঘুমোয়ও না। এ কী হল নবাবের?
মরালী ডেকে পাঠাল কান্তকে। এতদিনের পর আবার কান্ত মুর্শিদাবাদে এসেছে। কিন্তু তবু খুশবু তেলওয়ালা বুড়ো সারাফত আলির সঙ্গে দেখা করতে পারেনি। কখন আবার কীসের জন্যে ডাক পড়ে কে বলতে পারে। নবাব ঘুমোচ্ছে জেনে ভাবছিল একবার খুশবু তেলের দোকানে গিয়ে সারাফত আলির সঙ্গে দেখা করবে। সবে মতিঝিল থেকে বেরিয়েছে, এমন সময় ডাক এল মরিয়ম বেগমসাহেবার কাছ থেকে।
কান্ত দৌড়ে গেল। বললে–কী?
মরালী বললে–তোমাকে একটা কাজ করতে হবে
বলো না কী কাজ?
সেই তাকে একবার ডাকতে হবে।
কাকে? ঠিক বুঝতে পারলে না কান্ত, কার কথা বলছে মরালী!
সেই যে গান বাঁধে, ছড়া বাঁধে! আমার কথা কিন্তু বোলোনা কিছু। বোলো যে নবাব তার গান শুনতে চেয়েছে।
কান্ত অবাক হয়ে গেল। বললে–উদ্ধব দাস? উদ্ধব দাসের কথা বলছ? কিন্তু তাকে আমি কোথায় পাব? সে কি এখন মুর্শিদাবাদে আছে?
তা আমি জানি না। যেখান থেকে পারো তাকে ডেকে আনতে হবে। সারা বাংলাদেশে যেখানে হোক, একজায়গায় না এক-জায়গায় তাকে পাবেই–
হঠাৎ এতদিন বাদে কেন যে মরালী নিজের স্বামীকে ডাকতে বললে–বোঝা গেল না। কিন্তু মরালীর হুকুম না মানলেও চলে না। অবাক হয়ে খানিকক্ষণ চেয়ে রইল মরালীর মুখের দিকে। তারপর। বললে–আচ্ছা যাচ্ছি
কিন্তু সেদিন তখনও কি কান্ত জানত যে মরালীর সে-ইচ্ছে ওলোটপালোট হয়ে যাবে অমন করে? মুর্শিদাবাদের ইতিহাস অমন করে অন্য দিকে মোড় ফিরবে? বাংলা মুলুকের কপালে অমন করে। সর্বনাশ ঘনিয়ে আসবে?
নবাব ঘুম থেকে উঠেই খিদমদগারকে ডাকলে।
খিদমদগার কাছে যেতেই নবাব বললে–নকলচিকো বোলাও
নকলচি! কে নকলচি! কোথাকার নকলচি!
নবাব বললে–যারা দরবারে কোরান নকল করে, তাদের বোলাও
কোরান নকল করে! নবাব অনেকবার অনেক রকম তাজ্জব হুকুম করেছে। কিন্তু কখনও কোরান নকলচিদের ডেকে পাঠায়নি আগে।
ইব্রাহিম খাঁ সরাবখানার মধ্যে চুপ করে বসে ছিল। কখন কোন ওমরাহ আসে, কখন মেহেদি নেসার, ইয়ারজান সাহেব এসে সরাব চেয়ে পাঠায়, তারই অপেক্ষায় হাঁ করে মুহূর্ত গুনছিল, হঠাৎ নবাবের অদ্ভুত খেয়ালের কথা শুনে অবাক হয়ে গেল। কোরান পড়বে নাকি নবাব!
এ এক অবাক ঘটনা মতিঝিলে। সরাবের হুকুম হয়েছে, তওয়ায়িফের হুকুম হয়েছে, ওস্তাদের হুকুম হয়েছে, টাকার হুকুম হয়েছে, পাপের হুকুম হয়েছে। কিন্তু কখনও কোরানের হুকুম হয়েছে বলে কেউ শোনেনি। নবাব কোরান চোখে দেখেছে কিনা সন্দেহ। একবার শুধু নবাব হাত দিয়ে কোরা ছুঁয়েছিল। নবাব আলিবর্দি খাঁর মৃত্যুর সময়ে নবাবকে কোরান ছুঁয়ে শপথ করতে হয়েছিল, জিন্দগিভর কখনও মদ খাবে না। ব্যস, সেই পর্যন্ত। তারপরে কোরানেরও আর কখনও নবাবকে দরকার হয়নি, নবাবেরও আর কখনও কোরানকে দরকার হয়নি।
