গান গাইছিল কে মহারাজ?
এতক্ষণে যেন আশ্বস্ত হল সবাই। টাকা নয়, সম্মান নয়, দণ্ড নয়, শাস্তি নয়, কিছু নয়। নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা মাঝরাত্রে গান শুনতে এসেছে?
আমি আর একটা গান শুনব ওর, মহারাজ!
একজন সাধারণ সাদাসিধে ভদ্রলোক। দাড়ি-গোঁফে মুখ ভরতি। মাথায় বড় বড় চুল। গায়ে একটা চাদর। বাবু হয়ে বসে আছে। মাথায় একটা সিদুরের ফোঁটা শুধু। হাসি হাসি মুখ।
কী গান গাইব জাঁহাপনা, হুকুম করুন!
যে-গান খুশি!
রামপ্রসাদের গলা আবার গেয়ে উঠল
সেঁইয়া গেও পরদেশ
সখিরি, ক্যা করু ম্যয়
নবাব বাধা দিলে। বললে–না না, ও-গান নয়–যে-গান গাইছিলে, ওই গান।
কোন গান?
ওই যে মা মা করে গান করছিলে!
রামপ্রসাদের চোখ দুটো এবার বুজে এল আবার। গান গাইতে গাইতে চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়তে লাগল। একমনে গেয়ে চলেছে
মা গো, আমার এই ভাবনা।
আমি কোথায় ছিলাম, কোথায় এলাম,
কোথায় যাব নাই ঠিকানা।
আমার, দেহের মধ্যে ছ’জন রিপু
তারা দেয় মা কুমন্ত্রণা।
আমি মনকে বলি ভজ কালী
তারা কেউ কথা শোনে না
অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যপাদে এসে সেদিন বাংলার ইতিহাস যেন নতুন দিকে মোড় ফিরল। আর মাঝরাত্রের গঙ্গার বুকে নতুন করে আবার এক নতুন সর্বনাশ ঘনিয়ে উঠল।
*
তারপর?
মরালী বললে–তারপর সর্বনাশটা হয়েছিল পর দিন।
দমদমার বাগানবাড়িতে পুঁথি বগলে করে নিয়ে এসে উদ্ধব দাস গল্প শুনত আর লিখত। উদ্ধব দাস নিজেই লিখে গেছে সে-সব কাহিনী। তখন বড় দুর্দিন চলেছে কর্নেল ক্লাইভ সাহেবের। কোম্পানির সিলেক্ট কমিটির সঙ্গে ঝগড়া চলছে। মনমেজাজ খারাপ। বেগম মেরী বিশ্বাস এক এক করে সব কাহিনী বলে যায়, আর উদ্ধব দাস লিখে নেয় পুঁথির পাতায়। উদ্ধব দাস সোজা কথা সোজা করে লেখেনি। সমস্ত বাংলাদেশটা ঘুরে ঘুরে বেড়িয়ে তখন বুড়ো হয়ে পড়েছে। কান্তসাগরে ক্লাইভসাহেবের কাছ থেকে তালুক পেয়েছে। সেখান থেকে রোজ হেঁটে হেঁটে আসে আর বেগম মেরী বিশ্বাসের সামনে বসে থাকে।
এ একেবারে বেগম মেরী বিশ্বাসের শেষের দিকের কথা। বলতে গেলে শেষ সর্গ।
মরালীর তখন আর সে-চেহারা নেই। কোথায় গেছে সেই কাঁচা সোনার মতো গায়ের রং, সেই মেহেদিপাতার রঙে রাঙানো হাতের নখ। সেই ওড়নিও নেই, সেই জরির চুড়িদার সালোয়ার কামিজও নেই।
নবাব বড় ভক্ত হয়ে গিয়েছিল মরিয়ম বেগমের। যে-মানুষ মতিঝিল থেকে কখনও চেহেলসূতুনে আসত না, যে-মানুষ মতিঝিলের মধ্যেই দরবার বসাত রোজ, আর দরবারের নাম করে মতিঝিলের মধ্যেই রাত কাটিয়ে দিত, সেই মানুষকেই হঠাৎ সেদিন চেহেসতুনের মধ্যে আসতে দেখে সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিল।
নবাব বলেছিল–লোকে বলে মুর্শিদাবাদের মসনদ চালায় নাকি মরিয়ম বেগম
আলি জাঁহা কি বিশ্বাস করেন নাকি সেকথা?
নবাব বহুদিন পরে প্রাণ খুলে সেদিন হেসেছিল। আশ্চর্য, আকবর বাদশা থেকে শুরু করে বাদশা সাজাহান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ খাঁ, এমনকী আলিবর্দি খাঁ পর্যন্ত কে মসনদ চালাতে পেরেছে বেগমদের সাহায্য ছাড়া! নানিবেগম না থাকলে নানানবাবই কি মসনদ চালাতে পারত!
পেশমন বেগম বলেছিল–তুই কী করে জাদু করলি ভাই নবাবকে?
ঘরের মধ্যে কেউ আসতে পারেনি। কারও আসার হুকুম ছিল না। বহুদিন পরে নবাব আরাম করে ঘুমিয়েছিল সেদিন। বোধহয় সেই রামপ্রসাদের গানের জন্যে। রামপ্রসাদের গানই বোধহয় সেদিন নবাবকে বুঝিয়েছিল যে, ঐশ্বর্য-বিলাস-আড়ম্বর ও-সব কিছুনয়। একদিন যেমন নবাব সুজাউদ্দিন গেছে তেমনই তুমিও যাবে। একদিন যেমন নবাব আলিবর্দি খাঁ চলে গেছে, তেমনই তুমিও চলে যাবে, আলি জাঁহা। মাঝখানের এই কটা দিনের কিছু যন্ত্রণা নিয়ে মানুষের যেমন জীবন, নবাবেরও তেমনই তাই। অহংকার করতে নেই, অত্যাচার করতে নেই, অনিয়ম করতে নেই। রিপুর কুমন্ত্রণা শুনো না। ও তোমায় অশান্তি দেবে, অনিদ্রা দেবে, অন্তরায় দেবে। এই যা দেখছ, এ সবকিছুই অনিত্য, এ সবকিছুই অসার। সার যদি কিছু থাকে তো সে ভালবাসা। ভালবাসতে শেখো আলি জাঁহা, এই দুনিয়ার সবকিছুকে সব মানুষকে ভালবাসতে শেখো। তাতেই তোমার নিদ্রা আসবে, তাতেই তোমার শান্তি আসবে।
কিন্তু ওদের আমি শাস্তি দেব না? ওই যারা আমার দুশমনি করেছে?
নিশ্চয় শাস্তি দেবে আলি জাঁহা! পালনও করতে হবে, আবার শাসনও করতে হবে। পালন না করলে শাসন করবার অধিকার তোমার নেই!
কিন্তু আমি কি প্রজাপালন করি না বলতে চাও?
না।
তা হলে আমি কী করেছি এতদিন?
তোমার পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ, বৃদ্ধ প্রপিতামহ যা করে এসেছে, তুমিও তাই করেছ। নারীকে তুমি ভোগ করেছ, ভূমিকে তুমি অপহরণ করেছ, যৌবনকে তুমি অপব্যয় করেছ। ঠিক যেমন করে তোমার পূর্বপুরুষ করেছে, তেমনি করেই অপব্যয় করেছ। কিন্তু এখন ইতিহাস বদলে গেছে, এখন ইতিহাস উজানে বইছে। এখন মানুষ আর-এক ধাপ এগিয়ে গেছে। এখন সভ্যতা এক জনপদ থেকে আর-এক জনপদে ছড়িয়ে পড়ছে। সে আজ তোমার কাছে তোমার পিতা-পিতামহ-প্রপিতামহের পাপের জবাবদিহি চাইছে। তোমাকে আজ সেই সমস্ত পূর্বপুরুষদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে?
কেন? তাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত আমি করতে যাব কেন? আইন-ই-আকবরিতে তো সেকানুন নেই
নেই, কিন্তু ইতিহাসের আইন-ই-আকবরির তাই-ই কানুন।
তা হলে আমি কী করব?
