গানের মধ্যে হঠাৎ বাধা পড়ল। বজরার বুড়ো মাঝি হঠাৎ গানের মধ্যেই ভেতরে ঢুকে বললে–মহারাজ, নবাব আসছেন-বজরা থামাতে বলছেন
ছোটমশাই পাশে ছিলেন। বললেন–সেকী?
ভারতচন্দ্র বললেন–অ্যাঁ? কার কথা বললে?
গোপালবাবু বললে–মহারাজ, নিশ্চয় কেউ ভাঁড়ামি করতে চায় আমাদের সঙ্গে
বুড়ো মাঝি বললে–না মহারাজ, নবাব হুকুম পাঠিয়েছেন আমাদের বন্ধুরায় আসবেন। তিনি কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদে ফিরে যাচ্ছেন সেনমশাইয়ের গান শুনে জানতে পেরেছেন, মহারাজ এই বজরায় আছেন
মাঝরাত্রের গঙ্গা বড় সর্বনেশে গঙ্গা। বিশেষ করে অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝরাত্রির গঙ্গা। ওই মাঝরাত্রের গঙ্গায় কত সর্বনাশ যে ঘটে গেছে, তারিখ ইউসুফি বা মুতাক্ষরিনেও তা লেখা নেই। চল্লিশ দাঁড়ের নবাবি বজরা এসব জানত।
অত রাত্রেও মরালীর ঘুম ছিল না। নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলার ঘুম না এলে মরিয়ম বেগমের ঘুম আসে কী করে?
মরালী বলেছিল–ঘুম আসবে আলি জাঁহা, ঘুম আসবে–আর একটু চেষ্টা করুন।
কিন্তু বেগমসাহেবা, কী করে ঘুম আসবে? চেষ্টার তো কসুর নেই আমার
উমিচাঁদ, নন্দকুমার আর মুনশি নবকৃষ্ণ পেছনে আর একটা বজরায় রয়েছে। তারা কিন্তু অঘোরে ঘুমোচ্ছে তখন। যারা অনিদ্রার কারণ, তাদের বন্দি করেও বাংলা মুলুকের মালিকের চোখে ঘুম নেই। আর কাদের বন্দি করবে নবাব, আর ক’জনকে বন্দি করবে? আর ক’জনকে বন্দি করলে মূলকের মালিক নিরাপদ হবে, নির্ভয় হবে?
জানো বেগমসাহেবা!
মরালী কাছেই ছিল। বললে–বলুন আলি জাঁহা—
চেহেল্-সুতুনে একবার আমাকে আরক দিয়েছিল এক বেগমসাহেবা–
কোন বেগমসাহেবা?
নবাব বললে–তা আমার মনে নেই, সব বেগমদের নাম আমার মনে থাকেও না, কিন্তু বড় ম হয়েছিল আমার সেই আরক খেয়ে। আমার বড় ঘুম এসেছিল–
মরালী বললে–সে আরক আমি জানি আলি জাঁহা
তুমি জানো? তুমি সে আরক খেয়েছ?
না আলি জাঁহা, আমার তা খাবার দরকার হয়নি। আমি গরিব মেয়েমানুষ, ঘুমের জন্যে আমার অত কষ্ট করতে হয় না, ঘুম আমার এমনিতেই আসে!
নবাব বললে–আমার সেইরকম গরিব হতে ইচ্ছে করে। এককালে মসনদ চেয়েছিলুম, এখন আর তাই তা চাই না
না আলি জাঁহা, মসনদে বসেও গরিব হওয়া যায়!
কী করে তা সম্ভব বেগমসাহেবা? মসনদের জন্যেই তো আমার এত অশান্তি
তা ঠিক নয় আলি জাঁহা, মহাভারত পড়লে আপনি জানতে পারতেন, হাফিজ পড়লে আপনি তা জানতে পারতেন, কবীর পড়লেও আপনি তা জানতে পারতেন!
তুমি বুঝি সব পড়েছ?
মরালী বললে–না আলি জাঁহা, সব পড়তে হয় না। সব না পড়লেও জানা যায়। আমাদের মহাভারতে যা আছে, আপনাদের কোরানেও তাই-ই আছে–
কোরান পড়লেই আমার ঘুম আসবে বলতে চাও?
মরালী বলেছিল–নানিবেগমসাহেবা তো ওই জন্যেই কোরান পড়ে, আলি জাঁহা–
আমার দরবারে কত মৌলবিসাহেব কোরান নকল করবার জন্যে টাকা পায় বেগমসাহেবা, তারা কেতাব তৈরি করে, কিন্তু আমি তা কখনও পড়িনি–
এবার পড়ে দেখবেন আলি জাঁহা, দেখবেন ঘুম আসবে—
আর তোমার যে কে এক কবি আছে বলছিলে!
ভক্ত হরিদাস?
হ্যাঁ হ্যাঁ, ভক্ত হরিদাস, তার গান শোনাতে পারো না? তার গান শুনলে আমার ঘুম আসবে না?
ঠিক এই সময়েই দূর থেকে একটা সুর ভেসে এসেছিল। এই সর্বনেশে মাঝরাত্রের গঙ্গায় কে এন করে গান গায়?
অস্পষ্ট আওয়াজ, কিন্তু ভারী সুরেলা।
ওই শুনুন আলি জাঁহা—
গানটা তখন আরও কাছাকাছি এসেছে
মা গো, আমার এই ভাবনা।
আমি কোথায় ছিলাম কোথায় এলাম
কোথায় যাব নাই ঠিকানা
মরালী গানের মানেটা বুঝিয়ে দিলে। মহাজীবনের এপার-ওপার থেকে যেন অপার শান্তির ঠান্ডা হাওয়া এসে নবাবের মেজাজটা ঠান্ডা করে দিয়ে গেল।
নবাব নাওদারকে ডাকলে! কান্ত এসে কুর্নিশ করে দাঁড়াল।
ও কে গান গাইছে? কার বজরা ওটা?
কান্ত বাইরে গিয়ে খবর নিয়ে এল। বললে–জাঁহাপনা, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের বজরা যাচ্ছে কলকাতায়, গান গাইছে রামপ্রসাদ
নবাব জিজ্ঞেস করলে–রামপ্রসাদ? কৌন হ্যায় উও?
মরালী উত্তর দিলে–হালিশহরের কবি, আলি জাঁহা, সাধক কবি
তুমি এত জানলে কী করে বেগমসাহেবার কোথায় হালিশহর, কোথায় হাতিয়াগড়, কোথায় মুর্শিদাবাদ
মরালী বললে–আমরা যে সবাই ও-গান গেয়েছি আলি জাঁহা। আমাদের দেশের চাষারা চাষ করতে করতে ও-গান গায়, গেরস্ত ঘরের বউ-ঝি-ঠাকুমা-দিদিমা সবাই ওই গান গায় যে–
তামাম বাংলার নবাব মির্জা মহম্মদ সিরাজ-উ-দ্দৌলা অবাক হয়ে গেল। বাংলার মসনদের ওপর বসে যে মানুষ সারা দেশের মালিক হয়েছে, যাকে দেখলে সব মানুষ মাথা নিচু করে কুর্নিশ করে, মসনদ না পেয়েও তেমনই আর একজন মানুষকে সবাই আর এক মসনদে বসিয়ে দিয়েছে? এ কেমন করে হয়?
এ বাদশার খেলাত পেয়েছে?
না, আলি জাঁহা।
জায়গির?
তাও না, হুজুর!
তা হলে? তা হলে কীসের এত খাতির? কীসের এত তারিফ? তা হলে তো একে দেখতে হয়। হুকুম হয়ে গেল নবাবের। সেই মাঝরাত্রে গঙ্গার বুকেই মহারাজার বজরা থামাও। বাংলা মুলকের নবাব আর-এক মসনদহীন নবাবকে দেখবে।
নবাবের হুকুমনড়বার নয়। নবাব গিয়ে উঠল মহারাজার বজরায়। কান্তও সঙ্গে সঙ্গে গেছে। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র চার কামরাওয়ালা বজরা থেকে বেরিয়ে এসেছে। ভারতচন্দ্র, গোপালবাব, ছোটমশাই তারাও বেরিয়ে এসেছে। কোথাও কোনও গলদ হয়েছে নাকি? কোনও গাফিলতি? আবওয়াব দিতে দেরি হয়েছে? মাথট পিলখানা দিতে খেলাপি হয়েছে?
