এতক্ষণে ঘরের চারপাশটা দেখে নেবার শক্তি হয়েছে মরালীর। দুটো পালঙ। দুটো হাতি দু’পাশ থেকে শুড় ঠেকিয়ে আছে মাথার দিকে। বিছানার ওপর দুটো মাথার বালিশ। পাশাপাশি রাখা। ছোটমশাই আর ছোটরানি পাশাপাশি শোয়। মাথার কাছে ফুল ছড়ানো। বাগান থেকে ফুল দিয়ে যায়। মালীরা। অনেকক্ষণ ধরে দেখতে লাগল মরালী। কী সুখই না বড়মানুষের বউদের। দেয়ালে দেয়ালে পট টাঙানো। নল-দময়ন্তী, রাম-সীতা, হর-পার্বতী, আর সাবিত্রী-সত্যবানের পট।
দুর্গা বললে–কী দেখছিস লা মেয়ে, তোরও হবে এমনি, বরের সঙ্গে এমনি পাশাপাশি শুবি, বরের সঙ্গে গপপো করে কোথা দিয়ে রাত পুইয়ে যাবে টের পাবিনে–
শুনতে শুনতে যেন গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল সমস্ত শরীরে। লজ্জায় মুখ রাঙা হয়ে উঠল মরালীর।
দুর্গা বলতে লাগল–বরকে আঁচলে গেরো দিয়ে রাখবি লা, নইলে ফসকে পালিয়ে যাবে, এই বলে রাখলাম মেয়ে, রাতের বেলায় সোহাগ করবি, দিনের বেলা শাসন করবি, তবে বেটাছেলে বশে থাকবে–
ছোটরানি ধমক দিলে–তুই চুপ কর দুগগা–
দুর্গা বললে–কেন চুপ করব ছোটরানি, বিয়ের আগে আমরা শিখিয়ে পড়িয়ে না দিলে কে দেবে বলল, মুখপুড়ি যে মাকেও খেয়েছে–
হঠাৎ এই পরিস্থিতিতে মার কথা মনে আসতেই যেন ছাত করে উঠল বুকটা। এমন করে কেউ তো তাকে শোনায়নি। নয়ানপিসি অনেক কথা বলেছিল। অনেক দিন অনেক উপদেশ দিয়েছে, অনেক ব্রতকথা মুখস্থ করিয়েছে, কিন্তু এসব কথা এমন করে তো কেউ বলেনি।
দুর্গা বলতে লাগল–আমাদের গাঁয়ে, জানো ছোটরানি, এক বেনের মেয়ের সতিনের ঘরে পড়ে কী হল। মা ছিল না তো, কেউ শিখিয়ে দেয়নি, সোয়ামি সতিনের ঘরে শুত, আর ছুঁড়িটা সোনাদানা পেয়ে খুশি থাকত। শেষে যখন ঘুড়ির বয়েস হল, জ্ঞানগম্যি হল, সতিনাটা বুঝতে শিখলে, তখন সোয়ামিকে বললে–সতিনের ঘরে তোমাকে এবার থেকে শুতে দেব না–
ছোটরানি বললে–রাখ তোর কেচ্ছা দুগগা, বড় বউরানির ঘরে নিয়ে যা একে—
বলে মরালীর দিকে হাত বাড়িয়ে বললে–এই নাও ভাই, পান খাও–
তারপর দুর্গাই মরালীর হাত ধরে ঘরের বাইরে নিয়ে এল। বললে–চল, বড় বউরানিকে গড় করে আসবি চল–
বড় বউরানি! বড় বউরানির নাম শুনে ঘাবড়ে গিয়েছিল মরালী! সে আবার কে!
সতিন লো সতিন, ছোট বউরানির সতিন!
এবার দরজা পেরিয়ে পাশের বারান্দায় যেতে হল। এ কত বড় বাড়ি। এবারান্দা ওবারান্দা। দূরে বুড়োশিবের মন্দিরটা দেখা যায় জাফরির ফোকর দিয়ে। বড়মশাইয়ের বাবা বুড়ো শিবের মন্দিরের চুড়োটা সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন ছেলে হবে বলে। এই ছোটমশাই তখন হননি। যেবার বর্গিরা এসে ভাগীরথীর পশ্চিম পারে হানা দিয়েছিল তখন লাঠিয়ালরা পাহারা দিয়েছিল এই মন্দির। কাল যখন মরালী বিয়ের পর বরের সঙ্গে শ্বশুরবাড়ি যাবে তখন ওই বুড়োশিবের মন্দিরে গিয়ে প্রণাম করে যাবে। এই-ই রীতি। ছোটমশাইয়ের যখন বিয়ে হয়েছে তখনও বউ নিয়ে এসে ওই বুড়োশিবের মন্দিরে প্রণাম করে তবে বাড়িতে ঢুকেছে।
দুর্গা বলেছিল–খুব ভাল করে পায়ে মাথা ঠেকিয়ে গড় করবি বড় বউরানিকে, বড় কড়া মানুষ, বুঝলি?
মরালী জিজ্ঞেস করলে–আমার ওপর রাগ করবে না তো?
রাগ করবে কেন? তুই কি তার সতিন যে রাগ করবে তোর ওপর?
তবে? ছোটরানির ওপর খুব রাগ নাকি?
দুর্গা বললে–রাগ না পিন্ডি। পিরিত লো পিরিত। ছোটমশাইকে খোসামোদ করতে সতিন আনালে–বললে–দেখো আমি কত সতী। তোর যখন সোয়ামি হবে তখন তুইও বুঝবি, তাই তো তোকে অত শেখালুম পড়লুম। রোজ ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে বাসিমুখে বলবি ময়না ময়না ময়না, সতিন যেন হয় না–তা হলে আর সতিন হবে না তোর–
চলতে চলতে মরালী বললে–ছোট বউরানির বুঝি তাই খুব কষ্ট?
দূর পাগলি, দেখলিনে, বিছানার ওপর দুটো মাথার বালিশ, ফুলের তোড়া, রাত্তিরবেলা আবার আতর-গোলাপজল ছিটিয়ে দিই বিছানায়। তারপরে ছোট বউরানিকে যা এনে দিয়েছি তোকেও তাই এনে দেব, দরকার হলে আমাকে বলিস–
কী?
তোর ভাতার যদি তোকে অপগেরাহ্যি করে কি সতিন ঘরে আনে তো তোকেও দেব—
মরালী আবার জিজ্ঞেস করলে, কী, জিনিসটা কী?
ছোট বউমাকে তাই এনে দিয়েছি বলেই তো আর সোহাগের সীমে নেই ছোট বউরানির, ছোটমশাই এক-পা ঘরের বাইরে যায় না, মুখে মুখ দিয়ে পড়ে থাকে দিন রাত। বিছানায় তো দেখলি এক রাশ ফুল, ওই সব হয়েছে আমার জন্যে–
মরালী আবার জিজ্ঞেস করলে–কী করে হল? কী দিয়েছিলে তুমি?
সে বলব’খন তোকে, মন্তর আছে তার আর শুধু একটু করে আদা আর আকের গুড় লাগে যে-মেয়েমানুষ সোয়ামির কাছে শুতে ভয় পায়, কি যে-সোয়ামি মাগের কাছে শুতে আসে না–
তারপর হঠাৎ থেমে গম্ভীর হয়ে বললে–চুপ কর, বড় বউরানি আসছে–
সত্যি, বড় বউরানিকে দেখে কেমন যেন মনে হল মরালীর। একটু বয়েস হয়েছে। পুজো করে আসছিলেন বোধহয়। রেশমের শাড়ি। লাল পাড়। বাঁ হাতে পুজোর থালা।
দুর্গা বললে–এই তোমাকে গড় করতে এসেছে বউরানি, শোভারামের মেয়ে, কাল ওর বিয়ে—
শান্ত ঠান্ডা গলার স্বর। মাথায় হাত দিলেন মরালীর। বললেন–বেঁচে থাকো মা, স্বামীর সংসারে অচলা হয়ে থাকো–
কেমন যেন জুড়িয়ে গেল সমস্ত শরীরটা। বড় শান্ত সুখী মানুষটা। আবার বললেন–হ্যাঁ রে দুগগগা, ছোটমশাই উঠেছে রে? উঠলে আমার ঘরে একবার ডেকে দিস তো–
