নবাব বললে–ছোটবেলা থেকে আমি বখে গিয়েছিলাম বেগমসাহেবা, আমি ভাল ভাল গজল শুনেছি, ঠুংরি শুনেছি, ভাল ভাল নাচ দেখেছি, ভাল ভাল ভোয়াইফ আনিয়েছি দিল্লি থেকে, তাদের সঙ্গে এক বিছানায় রাত কাটিয়েছি, আর কিছু জানবার সময় পাইনি, জিন্দগির যে আরও একটা অন্য দিক আছে তা কখনও ভাবিনি–
কিন্তু কোরান? কোরানও কখনও পড়েননি?
নবাব বললে–না
নানিবেগম শুনছিল। বললে–আমি কতবার পড়িয়ে শুনিয়েছি মির্জাকে, ও শুনতে চায়নি কেবল দুষ্টুমি করে বেড়িয়েছে রে–
আমার যে তখন কিছুই ভাল লাগত না নানিজি।
মরালী বললে–কিন্তু এখন কেন ভাল লাগছে আলি জাঁহা?
তা জানি না বেগমসাহেবা। ওই যে তুমি বললে, জীবনে ভাল সময় বলে কিছু নেই, কথাটা ভাল লাগল
মরালী বললে–সমুদ্রে যেমন ঢেউ থাকাটাই নিয়ম, জীবনেও তেমনই বিপদ থাকাটাই যে নিয়ম। ঢেউ থামলে তবে স্নান করব যারা বলে, তাদের স্নান করা যে আর হয় না এ-জীবনে!
সত্যি বলো না বেগমসাহেবা, এত কথা কে শেখালে তোমাকে? হাতিয়াগড়ের রাজা? তোমার খসম?
না।
তবে? মৌলবিসাহেব? তোমাদের পুরোহিত?
না আলি জাঁহা!
তবে কে?
মরালী বললে–আমার এক পিসি ছিল, তার নাম নয়ানপিসি, আমাকে রামায়ণ-মহাভারত পড়ে শোনাত, তার কাছেই সব শিখেছি
আমাকে একবার শোনাতে পারো বেগমসাহেৰা? তাকে একবার নিয়ে আসতে পারো আমার চেহেলসূতুনে?
মরালী হাসল। বললেনা আলি জাঁহা, আমি নাহয় জাত দিয়েছি, কিন্তু সবাই জাত দেবে কেন?
কিন্তু আমার চেহেল্-সুতুনে এলেই তার জাত যাবে?
যাবে। আমাদের হিন্দুদের জাত বড় ঠুনকো জিনিস আলি জাঁহা, বড় সহজে জাত চলে যায়।
তারপর একটু থেমে বললে–কিন্তু আর একজনের কাছে আমি অনেক শিখেছি আলি জাঁহা
কে সে?
সে একজন কবি, আলি জাঁহা। গান লেখে!
হাফিজ?
না।
তবে? কবীর? কবীরের দোঁহা?
মরালী বললে–না, এর তত নাম নেই। এ রাস্তায় রাস্তায় বাউন্ডুলের মতো ঘুরে বেড়ায়, এর ঘর নেই, বাড়ি নেই, জাত নেই, ধর্মও নেই।
কোথায় থাকে সে?
মরালী বললেতারও কোনও ঠিক নেই। সবাই তাকে পাগল বলে জানে। কিন্তু তার গান শুনে আমি অনেক শিখেছি আলি জাঁহা, আমি যা-কিছু বলছি সবই তার গান শুনে?
তা হলে তাকে ডেকে আনো একদিন।
মরালী বললে–যদি কোনওদিন সুযোগ হয় আলি জাঁহা তো ডাকব তাকে, ডেকে আপনাকেও তার গান শোনাব–শুনলে আপনিও শান্তি পাবেন আমার মতো!
তার নাম কী?
মরালী বললে–সে নিজে বলে সে হরির দাস–ভক্ত হরিদাস
কান্ত এতক্ষণ আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। উদ্ধব দাসের কথাটা উঠতেই শিউরে উঠল। মরালী উদ্ধব দাসের কথা তা হলে মনে রেখেছে! এত শ্রদ্ধা করে মরালী উদ্ধব দাসকে? মরালীকে যেন নতুন দৃষ্টি দিয়ে দেখতে পেলে কান্ত! এমন তো ভাবেনি সে।
ঘর ছেড়ে নবাব পাশের ঘরে যেতেই কান্ত সচেতন হয়ে সরে এসেছে। নৌসের আলি তখনও দরবারঘরে মুনশি নবকৃষ্ণকে ধরে রেখেছে। ভেতর থেকে নবাব হুকুম দিয়ে দিয়েছিল, উমিচাঁদ আর নন্দকুমারকেও বন্দি করে মুর্শিদাবাদে নিয়ে যেতে হবে। সেখানেই বিচার হবে তিনজনের।
উমিচাঁদের দাড়ির ভেতরেও দাতে দাঁত চাপার শব্দ হল। হুগলির ফৌজদার সাহেব নন্দকুমার অসহায়ের মতো চাইলে উমিচাঁদের দিকে।
চুপি চুপি বললে–কী হবে উমিচাঁদসাহেব? আপনার চিঠি মরিয়ম বেগমসাহেবার হাতে কী করে পড়ল?
মুনশি নবকৃষ্ণের কানে কথাটা গেল।
বললে–আমাদের কোতল করবে নাকি উমিচাঁদসাহেব? আমি কী করেছি?
উমিচাঁদের মুখে কোনও ভাষা নেই বটে, কিন্তু চোখ দেখে বোঝা গেল অপমানে সমস্ত বুকটা যেন পুড়ে যাচ্ছে। যেন মরিয়ম বেগমসাহেবাকে সামনে পেলে দাঁত দিয়ে কামড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে।
নবাব দরবারে ঢুকতেই সবাই স্থির হয়ে দাঁড়াল।
নবাব বললে–আমরা আজই মুর্শিদাবাদে রওনা দিচ্ছি উমিচাঁদসাহেব, আপনাদের তিনজনকেও হাতকড়া বাঁধা অবস্থায় যেতে হবে আমার সঙ্গে
বলেই নবাব আবার চলে যাচ্ছিল। উমিচাঁদসাহেব হঠাৎ পেছন থেকে বললে–তা হলে কি বুঝব আমরা জাঁহাপনার বন্দি?
আমার কথার সেই মানেই তো দাঁড়ায়।
বলে আর দাঁড়াল না সেখানে নবাব। তাড়াতাড়ি পাশের তাঁবুতে গিয়ে ঢুকল। আর তার একটু পরেই ছাউনির মধ্যে চারদিকে সাজ সাজ রব পড়ে গেল। আবার ছুটোছুটি, আবার হাঁকডাক, আবার নাকাড়া বাজিয়ে সকলকে হুঁশিয়ার করে দেওয়া হল। ওঠো ওঠো, তল্পি গুটোও। হাতি ঘোড়া সাজাও। মির্জা মহম্মদ হায়াৎ খাঁ সিরাজ-উ-দ্দৌলা আলমগির বাহাদুর কী ফতে! জিগিরে জিগিরে আকাশ ফেটে চৌচির হয়ে গেল।
একটু নিরিবিলি পেতেই উমিচাঁদ বললে–অনেকদিন সহ্য করা হয়েছে নন্দকুমার, এবার আর দেরি করা নয়, এবার ওকে খতম করতে হবে
নন্দকুমার চুপি চুপি জিজ্ঞেস করলে–কাকে উমিচাঁদসাহেব?
মরিয়ম বেগমসাহেবাকে!
মুনশি নবকৃষ্ণ চমকে উঠল নামটা শুনে। তার মাথার লম্বা টিকিটাও সঙ্গে সঙ্গে কেঁপে উঠেছে।
২.১১ গঙ্গার বুকে
গঙ্গার বুকে তখন অনেক রাত। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের বজরার ভেতরে বড় আসর বসেছে। অনেকদিন পরে রামপ্রসাদ সেনকে পাওয়া গিয়েছে। সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন কালীঘাটে। রামপ্রসাদ দরাজ গলায় গান ধরেছে
মা গো, আমার এই ভাবনা।
আমি কোথায় ছিলাম কোথায় এলাম
কোথায় যাব নাই ঠিকানা।
আমার দেহের মধ্যে ছ’জন রিপু
তারা দেয় মা কুমন্ত্রণা…
