নবাবের সামনে তখন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে উমিচাঁদ আর নন্দকুমার।
দরজার দিকে চোখ পড়তেই হঠাৎ নবাব দেখলে আর-একজনকে ধরে নিয়ে আসছে নৌসের আলি।
একী?
উত্তরটা আর নৌসের আলিকে দিতে হল না। উত্তর দিলে মরালী।
মরালী বললে–আমিই একে বাঁধবার হুকুম দিয়েছি জাঁহাপনা, এ ফিরিঙ্গিদের চর
এখানে কী করতে এল?
নবকৃষ্ণ একবার উমিচাঁদের দিকে চাইলে, তারপর নন্দকুমারের দিকে। তারপরনবাবের দিকে চেয়ে কেঁদে ফেললে। বললে–আমি চর নই জাঁহাপনা, আমি ক্লাইভসাহেবের মুনশি।
এখানে কী করতে এসেছ?
আমাকে ক্লাইভসাহেব জাঁহাপনার বেগমসাহেবার কাছে মাফ চাইতে পাঠিয়েছিল।
কীসের মাফ? কী কসুর?
নবকৃষ্ণ বললে–বেগমসাহেবা মেহেরবানি করে সাহেবের দফতরে গিয়েছিলেন, কিন্তু আমার সাহেব নজরানা দিতে ভুলে গিয়েছিলেন।
মরালী বলে উঠল বাস খতম—
সমস্ত দরবারটা যেন হঠাৎ মরিয়ম বেগমের আবির্ভাবে দপ করে জ্বলে উঠেছিল।
মরালী বললে–চারদিকে সবাই একসঙ্গে জাল পেতেছে জাঁহাপনা, এ-মুনশিও আর এক জাল। ক্লাইভসাহেবের কাছে খবর গেছে যে জাঁহাপনা হুগলির ফৌজদার আর উমিচাঁদকে ডেকে পাঠিয়েছেন, তাই এখানে নিজের মুনশিকে পাঠিয়েছে সবকিছু দেখবার জন্যে।
নবাব কী করবে বুঝতে পারলে না।
মরালী বললে–নানিবেগমসাহেবা বলছেন এখানে এখন দরবার বন্ধ থাক, মুর্শিদাবাদে মতিঝিলে গিয়ে দরবার করবেন জাঁহাপনা। এদের তিনজনকে বনি করে মুর্শিদাবাদে নিয়ে যাওয়াই ঠিক হবে!
ক’দিন ধরে নবাবেরও বিশ্রাম হচ্ছিল না। অগ্রদ্বীপের ঠান্ডায় সমস্ত শরীর-মন যেন জমে গিয়েছিল। বাংলা বিহার ওড়িষ্যার নবাবের সমস্ত দায়িত্ব যেন পাথরের মতো মাথায় বোঝা হয়ে বসেছিল এত সহজে সবকিছুর সমাধান হবার কথা নয়। হয়তো সেই ভাল।
নবাব দরবার ছেড়ে উঠে পড়ল। মরালী আগেই চলে গিয়েছিল। নবাব তার পেছন পেছন পাশের তাঁবুর ভেতর গিয়ে দাঁড়াল।
মরালী তখন বোরখার মুখের ঢাকা খুলে ফেলেছে। একেবারে নবাবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললে–জাঁহাপনা, এখান থেকে তাড়াতাড়ি করে চলুন–নইলে আবার এক ষড়যন্ত্রের মধ্যে জড়িয়ে পড়ব আমরা
নানিবেগমসাহেবাও এতক্ষণ সব শুনেছে ভেতর থেকে।
বললে–চল মির্জা, এখান থেকে চলে যাই আমরা
কিন্তু কেন চলে যাব নানিজি! এ-ও তো আমার তালুক, এ-ও তো আমার মুলুক! আমিই তো এই মুলুকের নবাব!
মরালী বললে–এরা সবাই জাঁহাপনার দুশমন, এদের কাছে ফিরিঙ্গিদের আড্ডা। নন্দকুমার, উমিচাঁদ, নবকৃষ্ণ এই তিন শয়তানকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলে আর কোনও ভয় নেই জাঁহাপনার–
কিন্তু আমি আজই নন্দকুমারকে বরখাস্ত করে দিতে চাই!
এখন বরখাস্ত করে দিলে ফল ভাল হবে না জাঁহাপনা। ও খোলাখুলি ক্লাইভের দলে গিয়ে জুটবে। তার চেয়ে ওদের সকলকে কোতোয়ালিতে জমা করে দিন। সব ঠান্ডা হয়ে যাবে!
কিন্তু এই মুনশিটি?
মরালী বললে–আমি ক্লাইভসাহেবের দফতর থেকে যে-চিঠি চুরি করে এনেছি সেইটে নিতে এসেছে ও
এতদূর সাহস হবে ক্লাইভের?
আপনি কি ক্লাইভকে এখনও চেনেননি জাঁহাপনা?
কিন্তু মিরজাফর যে অন্য কথা বলেছে! ওরা নাকি খুব ইমানদার জাত!
মিরজাফর আলি সাহেবকেও তো জাঁহাপনা ভাল করে চিনেছেন! ওদের তিনজনকেই হাতে হাতকড়া দিয়ে বেঁধে মুর্শিদাবাদে ধরে নিয়ে চলুন। ওদের ধরলে ক্লাইভসাহেব ভয় পেয়ে যাবে, চন্দননগরে হামলা করতে আর এগোবে না–আমি বলছি, আপনি নিয়ে চলুন জাঁহাপনা
কিন্তু এ-সময়ে ওদের চটানো কি ভাল হবে, তাই ভাবছি!
মরালী বললে–কিন্তু জীবনে কখনও কি ভাল সময় পেয়েছেন আপনি জাঁহাপনা? জীবনে ধীরে সুস্থে নিশ্চিন্তে কাজ করবার মতো সময়? আপনার দাদামশাই-ই কি পেয়েছেন তেমন সময়? জীবনে কেউ কি তা পায়? দিল্লির বাদশাও কি কখনও তা পেয়েছে?
নানিবেগম কথাগুলো চুপ করে শুনছিল।
নবাব মরিয়ম বেগমের কে অবাক হয়ে চেয়ে রইল।
বললে–জীবন সম্বন্ধে তুমি এত কথা জানলে কী করে বেগমসাহেবা? কে তোমাকে এত কথা শেখাল? কত বছর বয়সে তোমার বিয়ে হয়েছিল?
সে-সব কথা থাক আলি জাঁহা!
না, বলো তুমি, আমার অন্য বেগমরা তো এমন করে কখনও বলেনি! তারা তো এসব কথা জানে না, এসব কথা ভাবেও না!
মরালী বললে–এত নরম হবেন না আলি জাঁহা, এত নরম হলে মসনদ চালাতে পারবেন না
কেবল মসনদ আর মসনদ! আর মসনদের কথা ভাবতে ভাল লাগে না আমার। এখন শুধু বাঁচতে ইচ্ছে করে–
কিন্তু আপনার ওকথা বলা সাজে না জাঁহাপনা! হিন্দুস্থানের লাখ লাখ মানুষ যে আপনার মুখের দিকে চেয়ে আছে!
নবাব আরও অবাক হয়ে গেল। বললে–সত্যি বলো না, কোত্থেকে এসব কথা শিখলে তুমি? কে শেখালে তোমাকে?
মরালী বললে–আমার কথা থাক আলি জাঁহা, আমি সামান্য মেয়ে, আমি কিছুই নই—
না না, বলো তুমি। তোমাকে বলতেই হবে!
মরালী বললে–ওদিকে দরবারে ওরা সব আপনার হুকুমের জন্যে অপেক্ষা করছে যে—
করুক অপেক্ষা। ওদের অপেক্ষা করা অভ্যেস আছে! তুমি বলো!
আলি জাঁহা কি এসব কথা আগে কারও কাছে শোনেননি?
না, এমন করে কেউ বলেনি।
সেকী! আপনার কত মৌলবি রয়েছে, কত পণ্ডিত আছে, আপনার কাছ থেকে তখা পেয়ে কত লোক কোরান নকল করছে, গীতা নকল করছে…
নবাব বললে–সে তাদের পেশা বেগমসাহেবা, তাই করেই তারা রুজি-রোজগার করে—
আলি জাঁহা কি কখনও সে-সব পড়েও দেখেননি? মৌলবিদের ডেকে সে-সব কথাও শোনেননি?
